Inqilab Logo

শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু বিবাহ : কারণ, যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তা

মুফতী পিয়ার মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ২ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:০৪ এএম

ইসলাম ও ইসলামের নবীর শত্রুরা সর্বকালেই বহু বিবাহ বিশেষত চারিত্রিক পবিত্রতার বিশ্ব আইডল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু বিবাহকে সমালোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত করে ইসলাম ও ইসলামের নবীর চরম বিরোধিতা ও ছিদ্রান্বেষণের প্রয়াস পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে [আল ইয়াযূ বিল্লাহ] কামুক ও সেক্সি বলার চরম দুঃসাহসিকতাও দেখিয়েছে অবলীলায়। যদিও বহুগামিতা ও অবৈধ যৌনাচার তাদের সামাজিক কালচার ও মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত। যা দুনিয়ার সামনে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমগ্র জীবনালেখ্য সামনে রাখা হলে কোনো মানব তো দূরের কথা শয়তানও তাঁর মতো মহা মানবের কালিমামুক্ত চরিত্রে কালিমা লেপনের অবকাশ পাবে না এবং তাঁর রিসালাত ও নবুওয়াতের বিপক্ষে কথা বলার কোনো সুযোগ পাবে না। কারণ এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, তিনি সর্বপ্রথম বিয়ে করেন ২৫ বছর বয়সে হযরত খাদীজা রা.কে, যিনি ছিলেন বিধবা, ইতিপূর্বে যার আরও ২জন স্বামী মারা গিয়েছিল, ৪০ বছর বয়স্কা এবং কয়েক সন্তানের জননী। নিজের চেয়ে ১৫ বছরের বড় এই বয়স্কা নারীর সাথেই ৫০ বছর পর্যন্ত পূর্ণ যৌবনকাল অতিবাহিত করেন। আম্মাজান খাদীজা রা এর সাথে ২৫ বছরের এই দীঘল সংসার জীবনে অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করার কথা কল্পনাও করেননি আত্মসংযম ও নিষ্কলুষ চরিত্রের বিশ্ব আইডল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইতিহাস সাক্ষি, তাঁর জীবনের সুদীর্ঘ ৬৩ বছর তাঁর জানের শত্রুদের সামনেই কেটেছে। তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর মক্কা নগরীতে তাঁর চরম বিরোধিতার সূত্রপাত হয়। মদীনায় আগমনের পর ইয়াহুদীরা আদা-জল খেয়ে মাঠে নামে তাঁকে ও তাঁর মিশনকে থামিয়ে দিতে। বিরোধীপক্ষ তাঁর উপর নির্যাতন ও ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। তাঁকে যাদুকর বলেছে। বলেছে উন্মাদ। আরও কতকিছ্। কিন্তু পরম শত্রুর মুখ থেকেও তাঁর ব্যাপারে কোনো সময় এমন কথা বের হয়নি, যা তাঁর চারিত্রিক পবিত্রতাকে সন্দেহযুক্ত করতে পারে বা নিষ্কলুষ চরিত্রে কোনো ক্ষুদ্রতম কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে পারে। তাঁর জীবন বসন্তের ৫০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত খদীজা রা. ইন্তিকাল করলে হযরত সাওদা রা. এর সাথে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হোন- তিনিও ছিলেন বিধবা। এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। মদীনায় হিজরত ও বয়স ৫৪ বছর হওয়ার পর দ্বিতীয় হিজরীতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার ইশারায় আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. নববধূ বেশে সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের গৃহে আগমন করেন। চুয়ান্ন বছর বয়সে এসে তাঁর দু’জন স্ত্রী একত্রিত হয়। আর এখান থেকেই তাঁর বহু বিবাহের সূত্রপাত হয়। এর এক বছর পর হাফসা রা.কে বিয়ে করেন। তাঁর কয়েক মাস পর বিয়ে করেন যয়নব বিনতে খুযায়মা রা.কে। বিয়ের ১৮ মাস মতান্তরে ৩ মাস পর তিনি ইন্তিকাল করেন। এরপর ৪র্থ হিজরীতে বিয়ে করেন সন্তানের জননী ও বিধবা হযরত উম্মে সালমা রা.কে। পঞ্চম হিজরীতে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশে হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ রা.কে অন্তঃপুরে আনেন। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। অবশিষ্ট ৫ বছরে অন্যান্য স্ত্রীগণ তাঁর হেরেমে প্রবেশ করেন। [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন:৭/১৮৭-১৮৮; ২/২৭২-২৭৩; সীরাতে মুস্তফা:৩/২৭৮-৩৩০] এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, এ সকল স্ত্রীগণের মধ্যে কেবলমাত্র আয়েশা রা.ই ছিলেন কুমারী। তাও আবার অপ্রাপ্ত বয়স্কা। বিয়ের সময় বয়স ছিল ৬ বছর আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ঘরে উঠিয়ে আনার সময় বয়স হয়েছিল ৯ বছর। এ ছাড়া বাকী সাবই ছিলেন বিধবা, যাদের কারো কারো পূর্বে দু’জন স্বামীও অতিবাহিত হয়েছিল। এ কথা কে না জনে যে, সাহাবয়ে কিরাম পুরুষ-মাহিলা নির্বিশেষে সবাই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর ইশারায় জান কুরবান করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি কোনো সাহাবীই। সকল নারী সাহাবীই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী হওয়াকে যে নিজের জীবনের পরম প্রাপ্তি, গৌরব ও মহাসৌভাগ্যের বিষয় মনে করতেন তা তো বলাই বাহুল্য। এমতাবস্থায় তিনি চাইলে উল্লেখিত সংখ্যক বা তার চেয়েও বেশি কুমারী মেয়েকেই স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারতেন। এমনকি তিনি ইচ্ছা করলে যখন-তখন যাকে ইচ্ছা তাকে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করতে পারতেন। আবার ইচ্ছা করলে তালাকও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তাঁর বহু বিবাহ কামক্ষুধা নিবারণ বা যৌনাচারের জন্য ছিলনা; বরং তা ছিল ¯্রফে ইসলামের স্বার্থে। [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন:২/ ২৭১] যে শ্রেণীটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান চরিত্রে কালিমা লেপনের অপ্রয়াসে লিপ্ত তারা কি এমন সুযোগ পেয়ে হাত ছাড়া করবেন কখনো? হলফ করেই বলা যায়, না, করবে না। কারণ ইউরোপ-আমেরিকা ও পাশ্চত্য সমাজের বিকৃত যৌন জীবনের বিচিত্র অবস্থার কথা সচেতন পাঠক মাত্রই অবগত থাকার কথা। একাধিক ও অবৈধ নারী সঙ্গ তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছদ্য অনুুসঙ্গ।

দুই
আমরা জানি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন ছিল পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের জন্য আর্শীবাদ স্বরুপ। তাঁর আগমনের মূল লক্ষ্যই ছিল আল্লাহর দীনের প্রচার-প্রসার এবং মানুষকে কলুষমুক্ত করে তার মুক্তি সাধন ও আল্লাহর অবতীর্ণ কালামের বাণীকে বিশ্ব মানবের দ্বারে পৌছে দেওয়া। তিনি ইসলামের মহান শিক্ষাকে কথা ও কাজে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। মানব জীবনের এমন কোনো একটি অধ্যায় বা বিভাগ নেই, যেখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐশি আলোয় প্রজ্বোল হেদায়ত ও শিক্ষার প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল থেকে রান্না ঘর পর্যন্ত, জামাতবদ্ধভাবে নামায আদায় করা থেকে শুরু করে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পারিক সম্পর্ক, পরিবার-পরিজনের লালন-পালন, এমনকি পেশাব-পায়খানা ও পবিত্রতা অর্জনের যাবতীয় বিষয়ও তাঁর আলোকিত শিক্ষা ও দিক নির্দেশনায় পরিপূর্ণভাবে বিদ্যামান রয়েছে। তাঁর এ শিক্ষা ও হেদায়াত তো কেবল পুরুষদের জন্য ছিল এমন নয়। নারী জাতির জন্যও ছিল আলাদা ও বিশেষ হিদায়াত ও শিক্ষা। নারী জাতির সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট বিধান বা মাসআলাগুলো সাধারণত নারীরা নারীদের কাছ থেকে জানতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। পুরুষদের কাছে জানতে লজ্বাবোধ করেন। দ্বিধাগ্রস্ত হোন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবন ও আচার-আচরণের সাথে শরীআতের অনেক বিধি-বিধান সম্পৃক্ত ছিল। যেগুলো কেবল তাঁর জীবন সঙ্গিনীগণের জন্যই জানা সম্ভব। অন্য কোনো নারী বা পুরুষের পক্ষে সেগুলো জানা সম্ভব নয়। এত বিস্তৃত ও বিশাল বিষয়াবলির প্রচার-প্রসার কেবল একজন স্ত্রীর পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। এ জন্য প্রয়োজন ছিল একাধিক স্ত্রীর। প্রয়োজন ছিল তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনাচার সম্পর্কে পূূর্ণ ওয়াকেফহাল নারীদের একটি বড় জামাত। যাতে করে তাঁর পারিবারিক জীবনের সমস্ত বিষয়াবলি ও সকল দিক অত্যন্ত নির্ভরশীলতার সাথে ও সন্দেহমুক্ত অবস্থায় পৃথিবীবাসীর সামনে উত্থাপিত হয়। এ জন্যই তিনি বহু বিবাহ করেছিলেন। তাঁর পত্নীগণের মাধ্যমে কি পরিমাণ ইসলামের প্রচার-প্রসার ও খেদমত হয়েছে, তা অনুমান করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, কেবল মাত্র আয়েশা সিদ্দীকা রা. থেকেই ২২১০ এবং উম্মে সালমা রা. থেকে ৩৭৮টি হাদীস উম্মাহ লাভ করেছে। যা হাদীসের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সমূহে লিপিবদ্ধ আছে। দু’শরও অধিক আয়েশা রা. এর ছাত্র ছিলেন। যারা তাঁর কাছ থেকে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ও ফাতওয়া শিক্ষা করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ইন্তিকালের পর ৪৮ বছর পর্যন্ত তিনি ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের কাজে মশগুল ছিলেন। আম্মাজান হযরত উম্মে সালমা রা. এর ইলমী খেদমত সম্পর্কে হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ইলামুল মআক্কিয়ীন গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যদি হযরত উম্মে সালমা রা. এর বর্ণিত ফাতওয়া ও মাসআলাগুলো একত্রিত করা হয়, তাহলে একটি বিরাট গ্রন্থের রুপ ধারণ করবে। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের এর বিভিন্ন লোকের প্রশ্নের জবাবে এ সব ফাতওয়া দিয়েছিলেন।’ এখানে দৃষ্টান্ত হিসাবে শুধু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ করা হলো। নতুবা তাঁর অন্যান্য স্ত্রীরগণের বর্ণিত হাদীস, বিধান ও ফাতওয়ার সংখ্যাও কম নয়। অনেক পত্নীকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহের পশ্চাতে তাদের পরিবারবর্গকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার রহস্যও নিহিত ছিল। (চলবে)।

লেখক : প্রধান মুফতী ও সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিয়া মিফতাহুল উলূম, নেত্রকোনা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন