Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

খুলনায় ওএমএস’র চাল কালোবাজারীদের পকেটে

প্রকাশের সময় : ২২ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আশরাফুল ইসলাম নূর, খুলনা থেকে : গরীবের ওএমএস’র চাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রির অর্থ এখন কালোবাজারী ও অসাধু ডিলারদের পকেটে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে সরকার চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস), ফেয়ার প্রাইস কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। অভিযোগ রয়েছে- তদারকি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্বল্পমূল্যের চাল দ্বিগুণ দামে কালোবাজারী মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে ডিলাররা। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি ওএমএস’র চালের বস্তা পরিবর্তন করে কালোবাজারে বিক্রি করছে। সূত্রমতে, রাজনৈতিক ও সাংবাদিক পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে কতিপয় ডিলাররা দু/তিনটি লাইসেন্সেরও চাল তুলে বিক্রি করছেন কালোবাজারে। অল্পদিনেই ধনপতি হয়েছেন তারা। আর ওএমএস’র চাল বঞ্চিত হচ্ছেন অসহায় গরীবরা।
কালোবাজারীদের সাথে সম্পৃক্ত এমন সূত্রে জানা গেছে, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রির ওএমএস’র চাল কালোবাজারে ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন অসাধু ডিলাররা। খাদ্য গুদাম থেকে চাল ডেলিভারি নিয়ে খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকার কতিপয় ব্যবসায়ীর কাছে এ চাল বিক্রি হয়। দৌলতপুরের বাসারাত কাজী, খালিশপুরের সেলিম, বড় বাজারের জাহাঙ্গীর ও মহেশ্বরপাশার আব্দুল কাদেরসহ কয়েকজন ডিলারদের কাছ থেকে পাইকারী দরে ওএমএস’র চাল কিনে থাকেন। পরে ওই অসাধু ব্যবসায়ীরা তিনভাবে ওএমএস’র চাল বিক্রি করেন। চালের বস্তা পরিবর্তন করে সরাসরি খোলা বাজারে বিক্রি, পুনরায় মিলে নিয়ে চাল চিকন করে বিক্রি অথবা ফের খাদ্য সংগ্রহের সময়ে সুযোগ বুঝে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছেই বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স¤প্রতি চালের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। মহানগীরর নিম্নœ আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার সুবিধার্থে ওএমএস’র কর্মসূচিতে ১৫ টাকা দরে প্রতি কেজি চাল বিক্রির উদ্যোগ নেয় সরকার। বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও দুর্যোগকালীন সময়ে পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (পিএফডিএস) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। পরিবার প্রতি ৫ কেজি করে চাল কেনার সুযোগ পায় দরিদ্র জনগোষ্ঠি। জেলার ৮টি গুদামে ২৫ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহকৃত চটের বস্তায় ‘খাদ্য অধিদফতর’ লেখা রয়েছে। সরকারের এ কর্মসূচির আওতায় খুলনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৭০ জন ডিলারের অধিকাংশই সরকারি দলের নেতাকর্মী ও সমর্থক। পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক ডিলার সপ্তাহের তিনদিনে প্রতিবারে দুই টন (২০০০ কেজি) চাল উত্তোলন করেন। প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে ৪০ জন ডিলারকে ৮০ টন চাল দেয়া হয়।
সংশিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুলনার একজন সাংবাদিক ও জেলা ছাত্রলীগ নেতা নিজের লাইসেন্স ছাড়া আরও দু’টি লাইসেন্স মিলে মোট তিনটি লাইসেন্সের চাল তোলেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম না মেনে অধিক মুনাফার আশায় গরীব মানুষের প্রাপ্য ওএমএস’র চাল দীর্ঘদিন কালোবাজারে বিক্রি করছেন তিনি। ক্ষমতাসীন হওয়ায় তিনি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কোন তোয়াক্কা করেন না। আর কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথেও রয়েছে তার সখ্যতা। তদারকি কর্মকর্তাদের নিয়মিত ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা মাসোয়ারা দিয়ে নিজের বশেই রাখেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ডিলার বা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে ওই বহুল প্রচারিত দৈনিকে নিউজ করার ভয় দেখান তিনি। শুধু তাই নয়; কালোবাজারে চাল বিক্রিতে অন্য ডিলারদেরও দফারফা করেন তিনিই। সেখান থেকেও তিনি কমিশন পান। এভাবে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভিতরে-বাইরে পুরো সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করেন ওই সাংবাদিক। তিনি ছাড়াও মহিলা আওয়ামী লীগের খালিশপুর থানার সভানেত্রী শারমীন রহমান শিখার রওশন ট্রেডার্স, আনিস এন্ড কোং এবং মেরাজ এন্টারপ্রাইজ নামে তিনটি ডিলারশীপ রয়েছে। রায়পাড়া ক্রস রোডের কসমস ক্লাবের পাশে ওএমএস’র চাল বিক্রির মেসার্স সেলিনা কন্সট্রাকশনের প্রোপাইটার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরাফাত হোসেন পল্টু। মিডিয়া ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবের বলে সবসময়েই কালোবাজারীতে থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে; এসব অভিযোগ জানতে সর্বোপ্রথম গত ১৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গেলে সেখানেই দেখা যায় ওই সাংবাদিককে। ওইদিন তার তিনটি ইকবালনগরে সুলতানা এন্টারপ্রাইজ, বানরগাতীতে এসএম এন্টারপ্রাইজ এবং খালিশপুরের কদমতলা এলাকায় মেসার্স আসাদ স্টোরের চাল বিক্রি হবার কথা। সরজমিনে গিয়ে ওইদিন দুপুরে উপরোক্ত স্থানে ওএমএস’র চাল বিক্রি করতে দেয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে ইকবালনগর ও বানরগাতী এলাকার ডিলার তদারকি কর্মকর্তা চসনি দপ্তর খুলনার খাদ্য পরিদর্শক এসএম মোহেববুল্লাহ (০১৭১১৯৭১০০২) এবং কদমতলা এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত খুলনা সিএসডি’র সহকারী উপ-খাদ্য পরিদর্শক মোঃ হারিসুল হোসেনের (০১৭৬৪৮১৫৭৭৪) ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া গেছে।
টুটপাড়া নূর মসজিদ রোডের (ইকবাল এন্টারপ্রাইজ) ডিলার এবং খুলনা মহানগর ওএমএস ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেন বললেন, দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ আমার জানা নেই। যদি কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে; তবে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হোক। তবে যেন হয়রানি না করা হয়।
নগরীর সঙ্গীতার মোড়ে বিক্রয়স্থলের সালাম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোনাডাঙ্গা থানা যুবলীগের সভাপতি ও খুলনা মহানগর ওএমএস ডিলার সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম ঢালী। তিনি বলেন, কালোবাজারে চাল বিক্রি হচ্ছে, শোন যায়। প্রমাণ তো পাওয়া যায় না। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন।
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহবুবুর রহমান খান বলেন, শুনেছি। কিন্তু কেউ তো নির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে পারে না। গ্রæপিংয়ের কারণে কেউ কেউ অপপ্রচার দিতে পারে। আমি নিজে সম্রাটের তিনটি দোকান দেখেছি। ওর দোকান নেই অভিযোগ সঠিক নয়। তার আত্মীয়-স্বজনের নামে লাইসেন্স থাকতে পারে। বয়স্কের কারণে কেউ যদি কাজ করতে না পেরে বলে তার ভাইপো আছে, সে পরিচালনা করুক; লভ্যাংশ সে খাক। তাহলে আমাদের কি করার থাকে? কালোবাজারে কেউ ওএমএস’র চাল বিক্রি করছে এমন প্রমাণ দেখান। চলেন আগামী সোমবার গিয়ে দেখি। অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: খুলনায় ওএমএস’র চাল কালোবাজারীদের পকেটে
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ