Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

পরিবহন সঙ্কটে কর্মজীবী নারীরা

প্রকাশের সময় : ২৫ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আলম শামস

জোসনে আরা বেগম, একজন গণমাধ্যমকর্মী। থাকেন রায়েরবাগ। অফিস মতিঝিলে। প্রতিদিন বাসেই যাতায়াত করেন। তিনি জানান, প্রায় প্রতিদিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিবহণের জন্য সীমাহীন বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে চাকরি করছেন। তিনি কর্মজীবী নারীদের এই পরিবহণ সঙ্কটের প্রতিকার চান। কী ধরনের ভোগান্তি জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে যাত্রীর ভিড়ে ওঠা যায় না। উঠতে গেলে অনেক সময় হেলপার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। সব সময় নারী যাত্রী নিতে চায় না হেলপাররা। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীর জন্য যে কয়টা আসন বরাদ্দ থাকে, তাতে অনেক সময় পুরুষ যাত্রীরা বসে থাকে, নারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও তারা সিট ছাড়তে চায় না, তখন দাঁড়িয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে পুরুষ যাত্রীদের সাথে ঠেলাঠেলি ও ঠাসাঠাসি করে আমাদের যাওয়াটা বিব্রতকর ও অপমানজনকও। সকাল ৮টা। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও বাস মিলছে না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন নাজনীন পায়েল। অফিস গুলিস্তান। থাকেন কল্যাণপুরে। প্রতিদিন তাকে পাবলিক বাসে যাতায়াত করতে হয়। পায়েল বলেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও ভিড়ের জন্য বাসে উঠতে পারছি না। অনেকক্ষণ পর ধাক্কাধাক্কি করে ভিড় ঠেলে বাসের কাছে এগিয়ে যেতেই বাসের ভেতর থেকে হেলপারকে উদ্দেশ করে কন্ডাক্টর চিৎকার করে বলে ওঠল, মহিলা তুলিস না। মহিলা সিট খালি নাই। সঙ্গে-সঙ্গে হেলপার আমাকে বাসে উঠতে বাধা দিলো। আরো অপেক্ষার পর এক বাসে উঠে দেখি নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসে আছে। এভাবে নিয়মিত সীমাহীন বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি ঠেলে দেরিতে অফিসে গিয়ে শুনতে হয় বসদের তিরস্কার।
এই সমস্যা শুধু জোসনা কিংবা পায়েলের নয়, কর্মজীবী নারীদের নিত্যদিনের ঘটনা। বর্তমানে শিক্ষাসহ কর্মক্ষেত্রে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মহিলা বাসযাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ মহিলা বাসের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। সরকারি চাকরিজীবীদের কেউ-কেউ অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ খুব কম। ফলে অফিসে যাওয়ার সময় বাসে উঠতে না পারায় নারীদের পক্ষে ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছানো যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি অফিস ছুটির পর ক্লান্ত শরীরে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একটি মহিলা বাস কিংবা সাধারণ বাসে ওঠার অপেক্ষায়। দেশে নারী শিক্ষা দিন-দিন বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যাও।
রাজধানীতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু অফিস-আদালতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা সীমাহীন বিড়ম্বনা ও ভোগান্তিতে পড়েন। চাকরি ছাড়াও নানা সময় নানা প্রয়োজনেও ঘরের বাইরে নারীর দীপ্ত পদচারণা বাড়ছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে তারা নব-নব বাস্তবতা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন না। এর অন্যতম কারণ পরিবহন সঙ্কট। এই সঙ্কটেরও আছে নানা মাত্রা। প্রথমত, মহিলা বাসের সংখ্যা অপ্রতুল। আবার তা সব সময় পাওয়াও যায় না। দ্বিতীয়ত, নারীদের সাধারণ বাসে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেক সময় তা হয়ে পড়ে বেদখল। তাছাড়া অফিস টাইমে ও ব্যস্ত সময়ে অনেক সাধারণ বাসেও নারীদের ঠাই হয় না। বাসে তুলতেই হেলপার-ড্রাইভাররা অনীহা প্রকাশ করে। তাদের যুক্তিÑ নারীরা পুুরুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেতে পারেন না। তারা উঠতে-নামতে সময় নেন বেশি, ইত্যাদি। তৃতীয়ত, পৃথক মহিলা বাস সার্ভিস বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক দাবি করা হচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, চাহিদা নেই। এ ক্ষেত্রে নারীদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।
২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশে লেবারফোর্স সার্ভে করে। তাতে দেখা যায়, ২০০২-০৩ সালে শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি যেখানে ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, এক বছরের মাথায় তা এসে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। পাঁচ বছরের মাথায় বর্তমানে তা আরো অনেক অনেক বেড়ে যাওয়ারই কথা। বিশেষত শহরে-নগরে এই কর্মজীবী নারীদের বহুমাত্রিক বিড়ম্বনা ও সমস্যার কথা এখন অনেকেরই অজানা নয়। তন্মধ্যে আবাসন ও উপরোক্ত পরিবহন সঙ্কটই তাদের পথচলায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটির (ঢাকা মেট্রো আরটিসি) শর্তানুযায়ী, ঢাকার বড় বাসে নয়টি এবং মিনিবাসে ছয়টি আসন শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত। তবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের এ শর্ত অনেক বাসেই মানা হয় না। আবার মানলেও সেসব আসন বেশির ভাগ সময় পুরুষ যাত্রীরা দখল করে রাখে। আসন ছেড়ে দেয়ার কথা বললে নানারকম কটূক্তি করতে থাকে। পাশাপাশি নির্ধারিত আসনের বাইরে বসতে গেলেও নারীদের শুনতে হয় নানা আপত্তির কথা।
ঢাকার সড়কে ১৯টি বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৯টা ৫ মিনিট ও ১০টা ১০ মিনিট রাজধানীর তালতলা থেকে মতিঝিল এবং সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিট ও ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে তালতলা, সকাল সাড়ে ৮টায় নতুনবাজার থেকে মতিঝিল এবং বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে নতুন বাজার, সকাল সোয়া ৭টায় ও সোয়া ৮টায় আবদুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় ও সোয়া ৬টায় মতিঝিল থেকে আবদুল্লাহপুর, সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর-১২, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল বাস ডিপো এবং সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মতিঝিল দ্বিতল বাস ডিপো থেকে মিরপুর-১২ ও মিপুর-১০, সকাল ৮টায় মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মিরপুর-১০, সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর, সকাল পৌনে ৮টায় ও সোয়া ৮টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় ও ৬টায় মতিঝিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত মহিলা স্কুল বাস সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেট আলেয়া পারভীন বলেন, ঢাকা শহরের সিটি বাসগুলোতে তিন সারিতে ৬টি বা ৯টি সিট নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা আছে, যা নিত্যদিনের ঢাকা শহরের নারী যাত্রীদের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। বিশেষ করে, কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের যে পরিবহন সঙ্কট তা সত্যিই বলা বাহুল্য। বাসে ওঠা-নামার সময় হেল্পার, কন্ডাকটররা প্রায় নারী যাত্রীর সাথে অশ্লীল আচরণ করেন। কখনো-কখনো মহিলা হওয়ার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়ি ফেরার পথে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বাসের হেল্পার, ড্রাইভার, কন্ডাকটর এমনকি অনেক সময় পুরুষ যাত্রীদের মুখেও শোনা যায় ‘মহিলা তুলিস না’। এই কর্মজীবী নারীরা কিভাবে বাড়ি ফিরবে এ বিষয় একবারও ভেবেছেন কী? বিআরটিসি মহিলা বাস থাকলেও সব রুটে নেই, সংখ্যাও নগণ্য। কর্মজীবী নারীদের জন্য ভিন্ন ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার পাশাপাশি সিটি বাসগুলোতে সিটের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। বাস মালিক সমিতি এবং সরকারের এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা জরুরি।
স্টেপ ফর সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিনা মোর্শেদ কাকলী বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে পুরুষের পাশাপশি নারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কর্মজীবী নারীদের চলাচলে ও যাতায়াতে নারীবান্ধব আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। দিন-দিন যেমনিভাবে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ছে ঠিক তেমনিভাবে টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে নারীদের আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে নারীদের চলমান বাসের সংখ্যা। রাজধানীর সব রুটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মহিলা বাস খুবই জরুরি। বর্তমান সরকারকে বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। এ জন্য বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিসের রুট ও শিফট বাড়ানোসহ সার্ভিসের মানোন্নয়নও জরুরি। দরকার বেসরকারি খাতে মহিলা বাস সার্ভিস চালু উৎসাহিত করা। কর্মজীবী নারীদেরও উচিত নিজেরা সংগঠিত হয়ে তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা এবং তাদের জন্য পরিচালিত বাস কিভাবে লাভজনক করা যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। বিআরটিসির কাছ থেকে বাস লিজ নিয়েও তারা নিজেরা তা পরিচালনা করতে পারেন। বস্তুত চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যতা প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো সার্ভিস যথার্থভাবে টিকে থাকতে পারে না। পরিবহন খাতে বিদ্যমান অরাজকতা রোধে যোগাযোগমন্ত্রীকে প্রায়ই তৎপর দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজে অনিয়ম পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার দিকেও দৃষ্টি দেয়া উচিত। নারীর পরিবহন সমস্যা নিরসনে বিআরটিসির মহিলা বাসের সংখ্যা জরুরিভাবে বাড়ানো দরকার। এটা সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে লোকসানের চেয়ে জনস্বার্থের বিষয়টিই গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বাসস-ইউনিসেফ ফিচার



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।