Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

হালাল রিযিক গ্রহণ এবং নেক আমল করো খুৎবা পূর্ব বয়ান

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ৩:৫১ পিএম

পবিত্র কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন "আমি মানবজাতি ও জ্বীন জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি "(সূরা যারিয়াত-৫৬)। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন "হে রাসূলগণ হালাল রিযিক গ্রহণ করো এবং নেক আমল করো। নিশ্চয় আমি তোমরা যা করো সবকিছু সম্পর্কে অবগত "(সূরা মু'মিনুন ৫১)। আজ জুমার বয়ানে পেশ ইমাম এসব কথা বলেন। রাজধানীর মসজিদগুলোতে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় রাস্তার ওপর মুসল্লিদের জুমার নামাজ আদায় করতে দেখা যায়।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি এহসানুল হক জিলানী আজ জুমার বয়ানে বলেছেন, পবিত্র কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন "আমি মানবজাতি ও জ্বীন জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি "(সূরা যারিয়াত-৫৬)। আর এই ইবাদত ইচ্ছামত করলে হবে না বরং আল্লাহর কাছে তা গ্রহণযোগ্য বা কবুল হওয়ার জন্যে অনেকগুলো শর্ত রয়েছে। তন্মধ্যে প্রথমত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে ইখলাস। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্যই ইবাদত করা। কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন "তাদেরকে ইখলাসের সাথে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার ব্যাপারে আদেশ করা হয়েছে " (সূরা বাইয়্যিনাহ-৫)। হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন "নিশ্চয়ই সমস্ত আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল"।
দ্বিতীয়ত হালাল রিযিক গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন "হে রাসূলগণ হালাল রিযিক গ্রহণ করো এবং নেক আমল করো নিশ্চয় আমি তোমরা যা করো সবকিছু সম্পর্কে অবগত "(সূরা মু'মিনুন ৫১)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দুটো বিষয়ে আলোচনা করেছেন প্রথমত: হালাল রিযিক দ্বিতীয়ত: নেক আমল। আর নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য হালাল রিযিক শর্ত, এইজন্যেই হালাল রিযিকের কথা প্রথমে এনেছেন। হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন "হারাম রিযিক দ্বারা লালিত-পালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না "। সুতরাং আমাদের উচিত হালাল উপায়ে উপার্জন করা আর হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করা। কারণ হারাম রিযিকের মাধ্যমে ইবাদতের জযবা নষ্ট হয়ে যায়।

তৃতীয়ত: ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হলো সহীহ তরিকায় ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারীমের প্রায় ৮২ জায়গায় নামাজ কায়েম করার কথা বলেছেন আর বাস্তবে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে নবীজী (সা.) বলেছেন "তোমরা নামাজ আদায় করো যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখতেছো"। অন্য হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন "তোমরা আমার থেকে হজের নিয়ম নীতি গ্রহণ করো "অর্থাৎ আমি যেভাবে হজের আমলগুলো করেছি সেভাবে তোমরা হজের প্রত্যেকটা আমল করবে। এইভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম প্র্যাকটিকেল প্রশিক্ষক হিসেবে আমাদেরকে সবকিছু শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সহীহ শুদ্ধভাবে মাকবূল ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী বাইতুল মামুর জামে মসজিদ এর খতিব মুফতি আব্দুর রহিম কাসেমী আজ জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা, গান বাজনা, বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গোনাহ। গান বাজনার দ্বারা মানুষের চরিত্র ধ্বংস হয়। সমাজে বিশৃঙ্খলতা আসে। অশ্লীলতার সয়লাব হয়। অধিকাংশ গান বাজনার আসরে মদ, জুয়া, গাঁজা, হিরোইন পানের বিস্তার ঘটে। মানুষের হিতাহিত জ্ঞান তিরোহিত হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসে। পরস্পরের মধ্যে কলহ বিবাদ সৃষ্টি হয়। সমাজে নেমে আসে অশান্তি আর অস্থিরতা। গান বাজনায় আসক্ত ব্যক্তিবর্গ তাদের কর্ম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলশ্রæতিতে তারা অনেকেই বেকারগ্রস্থ ও মাদকাশক্ত হয়ে ধ্বংসের পথ বেছে নেয়। এ জন্যে আল্লাহ তায়ালা গান বাজনা (লাহওয়াল হাদিস) কে শয়তানের কর্ম বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, নিশ্চয় ইহা ( মদ, জুয়া, গান বাজনা ) শয়তানের কাজ। তোমরা তাকে পরিহার কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। ( সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৯০)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করনা। নিশ্চয় শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রæ। ( সূরা বাকারা, আয়াত নং ২০৮)। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা গান বাজনাকে শয়তানের কন্ঠ বলে তিরষ্কার করেছেন। আর তিনি শয়তানকে সম্বোধন করে বলেছেন, তোমার কন্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত করো। (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত নং ৬৪)। গান বাজনা করা ও তা শ্রবণ করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ ও যন্ত্রনাদায়ক। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক অজ্ঞতার কারণে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (খেলা ধূলা, গান বাজনার বিষয় ) ক্রয় করে। তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। ( সূরা লুকমান, আয়াত নং ৬)। হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যারা দুনিয়ার মধ্যে গান বাজনা শ্রবণ করবে (ইচ্ছাকৃত, আনন্দ ভরে) তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হবে না। (কানজুল উম্মাল খন্ড নং ১৫)। তিনি ইরশাদ করেন, গান বাজনা মানুষের অন্তরে কপটতার সৃষ্টি করে যেমন পানিতে ঘাস জন্মায়। (আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯২৭ )। তিনি আরো বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতে দুইটি অভীশপ্ত আওয়াজ রয়েছে তাহল, উৎসবের সময় গান বাজনার আওয়াজ ও বিপদে মছিবতের সময় অধৈর্য হয়ে চিৎকার করা। (আল হাদিস)। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়ক গায়িকার উপার্জনকে হারাম ঘোষনা করে বলেন, গায়ক গায়িকার জীবিকা (গানের মাধ্যমে) হারাম এবং ব্যাভিচারের জীবিকা হারাম। যে শরীর হারাম দ্বারা গঠিত তাকে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। (কানজুল উম্মাল ১৫তম খন্ড পৃষ্ঠা ২২৬)। তিনি আরও বলেন, তোমরা বাদ্যযন্ত্র ক্রয় বিক্রয় কর না এবং কাউকে তার মাধ্যমে শিক্ষা দিও না। গান বাজনার যন্ত্র ব্যবসার মধ্যে কোন ধরণের কল্যাণ নেই এবং এগুলোর মূল্যও হারাম। (তিরমিজি পৃষ্টা নং ২০৫)। আল্লাহ আমাদের সকলকে হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করেন। আমিন।
মিরপুরের বাইতুল আমান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল্লাহ ফিরোজী আজ জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইসলামের প্রতিটি বিধান মানবজাতির জন্য কল্যাণকর ও যুগোপযোগী। প্রতিটি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষায় ইসলাম দিয়েছে বাস্তবধর্মী নির্দেশনা। মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ সড়ক বা চলাচলের রাস্তা ব্যবহারেও ইসলাম যুগান্তকারী বিধান দিয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত রাখার জন্য সওয়াব ও আকর্ষণীয় প্রতিদানের ঘোষণার পাশাপাশি রাস্তায় জনগণের চলাচলে বিঘœ ঘটানো কিংবা অপ্রয়োজনে রাস্তা বন্ধ রাখলে কঠিন শাস্তির কথাও কোরআন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। একজন মুসলমান রাস্তায় নিজের নিরাপদ চলাচলের অধিকারের ব্যাপারে যেমন সচেতন থাকবে, তেমনি অন্যের অধিকারের ব্যাপারেও সচেতন থাকবে। রাস্তাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবে না, যেটা অন্যের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির কারণ হবে। রাস্তায় এমন কিছু ফেলে রাখা যাবে না, যার কারণে কেউ ক্ষতি ও কষ্টের সম্মুখীন হয়। ইসলামের অনন্য সৌন্দর্য হচ্ছে, নিজে তো ফেলবেই না, বরং কষ্টদায়ক কোনো বস্তু রাস্তায় পড়ে থাকলে তা সরিয়ে রাস্তা নিরাপদ করবে। রাস্তা নিরাপদ ও পরিচ্ছন্নকরণের এ বিষয়টি সরাসরি ঈমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ঈমানের পরিচায়ক। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) বলেন, ‘ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শাখা হলো, এ কথার স্বীকৃতি দেয়া যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আর সর্বনি¤œ শাখা হল রাস্তায় কোনো কষ্টদায়ক বস্তু থাকলে তা সরিয়ে দেয়া।’ (বুখারি-৯)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহর (সা.) বলেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়াও একটি সদকাহ।’ (মুসলিম-১১৮১)।

খতিব আরও বলেন, বাড়িঘর নির্মাণ, আবাসিক প্রজেক্ট ও প্লট নির্মাণের ক্ষেত্রে রাস্তার প্রশস্ততার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। মুসলিম অমুসলিম সবারই রাস্তার অধিকার রয়েছে। এমনকি প্রাণীকুলেরও হক রয়েছে। রাস্তায় ইট, পাথর, বালুসহ নির্মাণ সামগ্রী না রাখা। বিশেষ পরিস্থিতে রাখলেও খুব দ্রæত সরিয়ে ফেলা। রাস্তায় কোনো অবস্থাতেই মলমূত্র ত্যাগ, ময়লা আবর্জনা ও নাপাক পানি না ফেলা। যত্রতত্র রাস্তার পাশে বা ফুটপাথে গাড়ি পার্কিং না করা। রাস্তা বন্ধ করে কোনো ধরণের প্রোগ্রাম, সভা, সেমিনার, বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠান না করা। যদি করতেই হয় তাহলে অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে তারপর করা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আতশবাজি, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন উৎসব কেন্দ্রিক রং মাখামাখি গুনাহের কাজ। হযরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাস্তার ওপর বসো না। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাস্তায় বসা ছাড়া আমাদের তো অন্য উপায় নেই। আমরা রাস্তায় (দাঁড়িয়ে বা বসে) পরস্পর কথাবার্তা বলি। রাসূল (সা.) বললেন, যদি তোমাদের কথাবার্তা বলতেই হয় তাহলে রাস্তার হক ও অধিকার আদায় কর (তারপর কথাবার্তা বল)। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাস্তার অধিকার কী? রাসূল (সা.) বললেন, রাস্তার অধিকার হলো চক্ষু অবনত রাখা, কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা, সালামের জবাব দেয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করা।’ (বুখারি-৬২২৯)। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করেন। আমিন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পেশ ইমাম


আরও
আরও পড়ুন