Inqilab Logo

শনিবার, ২১ মে ২০২২, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যাবহার হ্রাস করবে

বাঁচবে কৃষকের জীবন ও কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা

নাছিম উল আলম | প্রকাশের সময় : ১৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ৪:১৭ পিএম

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কৃষকের মাঝে প্রচলন করতে পারলে দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার অর্ধেকেরও বেশী হ্রাস করা সম্ভব। পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে। এ দাবী ধান ‘বাংলাদেশ গবেষণা ইন্সটিটিউট-ব্রি’র বরিশাল আঞ্চলিক কেন্দ্রের কৃষি বিজ্ঞানীদের। বরিশালে ব্রি’র বিজ্ঞানীগন গত ৪ বছর ধরে তাদের নিজস্ব দুটি কৃষি খামারে কোন ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই অত্যন্ত সফলতার সাথে আমন, আউশ ও বোরো ধান উৎপাদন করে আসছেন।

ব্রি’র বিজ্ঞানীদের দেখান পথ ধরে ‘হাত জাল’ ও ‘পার্চিং পদ্ধতি’র মত দেশীয় প্রযুক্তিতে ক্ষতিকর কীট পতঙ্গ ধংশ করে কীটনাশকমুক্ত ধান চাষে ব্যাপক সফলতা অর্জন করছেন কৃষকরা। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন ব্যায় প্রায় দেড় হাজার টাকা হ্রাস পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠছে। এতদিনকার কীটনাশক ব্যবহার রোধ করে কৃষকদের প্রকৃতিকভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফিরিয়ে এনেছেন ‘ব্রি’ বরিশালের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলমগীর ও কীটতত্ত¡বিদ মনিরুজ্জামান কবির।
বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন এসোসিয়েশনের তথ্য মতে ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের সাথে দেশে ধান চাষে কীটনাশকের ব্যবহারও আশংকাজনহারে হারে বাড়তে থাকে। সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে ফসলের পোকামাকড় দমনে তিন টন কীটনাশক আমদানি হলেও ২০২০ সালে দেশে কীটনাশক আমদানির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৫৬৩ মেট্টিক টন ছিল বলে ব্রি’র দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে। কিন্তু এসব কীটনাশক সাময়িকভাবে কীটপতঙ্গ ধংশ করলেও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণেই দেশে আউশ মৌসুমে ২৪%, আমনে ১৮% এবং বোরোতে ১৩% ধানের ফলন কমে যায়। উপরন্তু এসব কীটনাশক পরিবেশের ওপরও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঝুকিতে ফেলছে কীটনাশক প্রয়োগকারী কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের জীবন। ত্বকের ক্ষত, জ¦ালাপোড়া, ক্যানসার সৃষ্টি সহ কিডনী বিনষ্ট এবং অন্যান্য জটিল রোগ তৈরি করছে। এমনকি কীটনাশক কৃষকদের অন্ধত্বেরও অন্যতম কারণ বলে জানিয়ে তা মানবদেহের জন্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুকি তৈরী করছে বলেও মনে করছেন ব্রি’র বিজ্ঞানীগন।
ব্রি’র বিজ্ঞানী ড. আলমগীরের মতে, ‘সাইফার মেট্রিন’ নামের এক ধরনের কীটনাশক জলজ প্রাণির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এরফলে মাছ সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি ধংশ হচ্ছে। উপরন্তু খালি গায়ে ও খালি চোখে কীটনাশক স্প্রে করায় কৃষকদের চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়ে ড. মুনিরুজ্জামানের মতে, কীটনাশক স্প্রে করার সময় কৃষকদের অব্যশই পুরাতন কাপড়ে শরিরে অঅবরন তৈরী, নাক-মুখে পুরাতন গামছা পেচিয়ে ও চোখে চশমা ব্যবহার করতে হবে।

বরিশালে ব্রি’র দুটি খামারের ৯৫ একর জমিতে ২০১৯ সালের বোরো মৌসুমে মাজরা পোকার প্রচন্ড আক্রমণ দেখা দিলে তিনবার কীটনাশক স্প্রে করেও পোকা দমন করা সম্ভব হয়নি। কীটত্ত¡বিদ মনিরুজ্জামান কবির, মাজরা পোকায় খাওয়া সাদা শীষ সংগ্রহ করে গাছের কান্ডের ভেতর কালো মাথার মাজরা পোকার উপস্থিতি দেখতে পান। পরবর্তীতে কারটাপ গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করে মাজরা পোকা দমন করা হয়।

কিন্তু একই বছরের আমন মৌসুমের ব্রি’র বরিশালের খামারের ধানের জমিতে চারা রোপন থেকে গাছে ফুল আসার আগ পর্যন্ত হাতজাল দিয়ে মাজরা পোকা ধরে মেড়ে ফেলা হয়। সেইসাথে হাতজালে কোন উপকারী পোকা আসলে তা পুনরায় ধানের জমিতে ছেড়ে দেয়া হয়। ক্ষতিকর পোকার সিংহভাগই বাদামি রঙের আর উপকারি পোকাগুলো রঙ্গিন হয়ে থাকে। হাতজাল দিয়ে হেঁটে হেঁটে মাজরা পোকা ধরার সময় ধান গাছের পাতা থেকে ডিমের গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্রি’র চরবদনা খামারে দুজন ও সাগরদী খামারে একজনকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন এ কীটতত্ববিদ।
এ পদ্ধতিতে ২০১৯ এর আমন, ২০২০ ও ’২১ সালের আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে কোন প্রকার কীটনাশক ছাড়াই ধান উৎপাদিত হয়েছে ব্রী’র দুটি খামারের প্রায় ১শ একর জমিতে।

ব্রি’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, ধানের জমিতে ২৬৬ প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা ও ৩৪৬ প্রজাতির উপকারী পোকা রয়েছে। চারা রোপনের শুরুতেই কীটনাশক প্রয়োগ করলে উপকারী ও ক্ষতিকর উভয় পোকাই মারা যায়। পরবর্তীতে ক্ষতিকর পোকা দমন করা যায়না। তাই চারা রোপনের পর থেকে ফুল আসা পর্যন্ত হাতজাল দিয়ে মাজরা পোকা ও তার ডিম সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেললে কীটনাশক প্রয়োগের দরকার হয়না। তার মতে, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত মাজরা পোকা গাছের পাতায় বসে থাকে। তখন হাতজাল দিয়ে হেঁটে হেঁটে পোকটি সহজেই ধরা যায়। সেইসাথে ধানের জমিতে চারা রোপনের পরপরই গাছের ডাল পুতে পোকাখেকো পাখি বসার ব্যবস্থা- ‘পার্চিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করলেও আশাতীত ফল পাওয়া যায় বলে প্রধান বৈজ্ঞাইনক কর্মকর্তা ড. আলমগীর জানিয়েছেন।
ব্রি বরিশালের প্রযুক্তিটি সফল হবার পর কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বরগুনার আমতলী উপজেলার রাওঘা ব্লকে ১০ একর জমিতে আমন মৌসুমে ধানের প্রদর্শনী প্লট করা হয়। প্রদর্শনীতে কৃষকদের ‘ব্রি ধান ৭৬’ এর বীজ দেয়ার পাশাপাশি হাতজাল বিতরন করা হয়। প্রদর্শনীতে কৃষকদের হাতজাল দিয়ে ক্ষতিকর পোকা ধরে ধ্বংশ করা ও উপকারী রঙিন পোকা আবার জমিতে ছেড়ে দেওয়ার পদ্ধতি হাতে কলমে শিখিয়ে দেয়া হয়। গত ২৫ নভেম্বর উক্ত প্রদর্শনীটির মাঠ দিবসে দেড় শতাধিক কৃষক বিষমুক্ত ধান চাষের উপস্থিত হন।

ব্রি’র কীটতত্ত¡ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শেখ শামিউল হক বলেন, চারা রোপনের পর মাজরা পোকা কিছু গাছের কান্ড কেটে দিলেও ফলনের কোন ক্ষতি হয়না। কারন হিসেবে তিনি বলেন, পরবর্তীতে যে কুশিগুলো জন্মে সেগুলো থেকে ভাল ফলন পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষকরা ১/২টি পোকা দেখলেই কীটনাশক প্রয়োগ শুরু করেন। তার মতে, ধানের জমি চারা রোপনের প্রথম ৩০ থেকে ৪০দিন কীটনাশক মুক্ত রাখতে হবে।
বিষমুক্ত ধান চাষের এসব প্রযুক্তির ব্যাপারে ব্রি বরিশালের প্রধান ও মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলমগীর হোসেন জানান, পর্যায়ক্রমে এ পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলার কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ