Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০৯ ভাদ্র ১৪২৬, ২২ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

চিকিৎসা সেবায় অনুদান নিয়ে এগিয়ে আসুন

প্রকাশের সময় : ২৭ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বিত্তবানের প্রতি প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ সংবাদদাতা : চিকিৎসকদের সেবার মনোভাব নিয়ে মানুষের পাশে থাকার তাগিদ দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বিত্তবানদের সংখ্যা বাড়ছে। এই অর্থ-সম্পদ নিজের কাছে না রেখে চিকিৎসা সেবায় যথেষ্ট অনুদান দিতে পারেন। নিজের নামে একটা ওয়ার্ড করে দিতে পারেন, অ্যাম্বুলেন্স দিতে পারেন। লাইব্রেরিটা উন্নত করে দিতে পারেন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কলেজ অফ ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস-এর ত্রয়োদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্যসেবাকে যুগোপযোগী করে জনগণের দোড়গোঁড়ায় নিয়ে যাবার জন্য ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে চিকিৎসকদের আরো আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য আমরা ১৫ বছর মেয়াদী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। এ লক্ষ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। বিসিপিএস এই মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন ডাক্তারের ওষুধের থেকে মুখের কথায় অর্ধেক অসুখ ভালো হয়ে যায়। আমরা তো রোগী হই মাঝে মাঝে, আমরা বুঝি। এই কথাটা মনে রেখে আপনাদের এই মহৎ পেশাটা সততার সাথে করবেন, মানুষকে সেবা করার মনোভাব নিয়ে কাজ করবেন।
এই অনুষ্ঠানে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের জীবনে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একটি মহৎ পেশায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে যাচ্ছেন। মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ হয়ে মানুষের কল্যাণে আপনারা কাজ করবেন।
আজকের নবীন চিকিৎসকদের সামনে বক্তব্য দিতে এসে ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর তখনকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃত করেন তার বড় মেয়ে হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা ডাক্তার। আপনাদের মন হতে হবে, অনেক উদার। আপনাদের মন হবে সেবার। আপনাদের কাছে বড়-ছোট থাকবে না। আপনাদের কাছে (বিবেচ্য) থাকবে রোগ। কার রোগ কত বেশি, কার রোগ কম। তাহলেই তো সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে এবং মানুষের মনে আপনাদের জন্য সহযোগিতা বাড়রব।’
জাতির পিতার সেই কথাগুলো ‘স্মরণ রাখার’ আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব থেকে মেধাবী যারা, তারাই তো মেডিকেলে পড়তে যায়। মেধাবীরা তাদের মেধা দিয়ে, আমরা দেশটাকে কীভাবে আরও এগিয়ে নিয়ে যাব, সেই সহযোগিতাটা করবেন। জনসংখ্যার তুলনায় দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা কম হওয়ায় যে জটিলতা তৈরি হয়, সে কথাও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
১৬ কোটি মানুষের দেশ। সে তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা অত্যন্ত কম, নার্সের সংখ্যা আরও কম। এ রকম একটা পরিবেশে মন-মানসিকতা ঠিক রেখে চিকিৎসা দেয়ায় প্রচ- একটা প্রেশার থাকে, সেটা আমরা বুঝতে পারি। তারপরও চিকিৎসকরা তাদের মানবিক গুণাবলী দিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ জয় করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
চিকিৎসা সেবার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজধানীতে নয়, বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। তারপর জেলায় চলে যেতে হবে। আমাদের জনসংখ্যাটা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।
তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ যাতে চিকিৎসা পায়, সে ব্যবস্থা আমরা করতে চাই। তাই এক কেন্দ্রীক না করে, এটাকে ডি-সেন্ট্রালাইজড করে দিতে চাই। যাতে মানুষ ঘরে বসে চিকিৎসা পেতে পারে।
নারীদের সুবিধার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কম বেশি প্রতি ছয় হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক করে দেয়া হয়েছে, যাতে ‘মেয়েরা হেঁটে গিয়ে’ চিকিৎসা নিতে পারে।
জাতির পিতার দর্শনকে ধারণ করেই তার সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর দেশে প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি। এখন আমরা প্রত্যেক ডিভিশনে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
তার সরকারের আমলে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে গৃহিত পদক্ষেপ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ এবং জনসংখ্যা নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করেছি এবং এ পর্যন্ত সারাদেশে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছি।
’৯৬ সালেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে এই কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর উদ্যোগ নিলেও দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তীতে সরকার গঠন করতে না পারায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকা-ের মত এটাকেও বন্ধ করে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন মেডিকেল হাসপাতালে সরকারের চালু করা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির জন্য সৃষ্ট রেফারেল সিস্টেমটাও বিএনপি জোট বন্ধ রাখে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার স্থানীয় পর্যায় থেকে-গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা ভিত্তিক তিনস্তর বিশিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে প্রায় ৩০ ধরনের ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের ফলে মোবাইল ফোনকে জনগণের হাতের নাগালে এনে দেয়ার মাধ্যমে তাঁর সরকার সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মোবাইল ফোনে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং বিভিন্ন হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা প্রবর্তন করেছে।
চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রসারে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩শ’ ৪৫টি নতুন চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মোট ১২ হাজার ৮শ’ ৪টি আসন বাড়ানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারের সাত বছরে ১২ হাজার ৭শ’ ২৮ জন সহকারী সার্জন এবং ১শ’ ১৮ জন ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার নতুন নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ৩ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট নিরসনে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের ৩৩তম ব্যাচে ৬ হাজার ২৩৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়, উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করেছে এবং মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার এবং লেকটেটিং মাদার ভাতা চালু করেছে। ২৭ মার্চ ২০১৪-তে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিওমুক্তি সনদ লাভ করেছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শয্যা সংখ্যা ৭শ’ থেকে ১৫শ’ করেছি। ৫০-শয্যা বিশিষ্ট জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল স্থাপন করেছি। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটকে ৩শ’ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ৫শ’ শয্যার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারিদের জন্য ১শ’ ৫০-শয্যার আধুনিক হাসপাতাল এবং জাতীয় ইএনটি ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ক্যান্সার এবং থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকার কুর্মিটোলায় ৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট এবং খিলগাঁওয়ে ১৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চালু করেছি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক অত্যাধুনিক বার্ন ইউনিটসহ দেশের সরকারী বৃহৎ হাসপাতালগুলোতে বার্ণ ইউনিট খোলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথক বার্ণ এবং প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের কাজও এখন চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার পরিবারের অপর জীবিত সদস্য ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ট্রাস্ট করে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে ২৫০-শয্যাবিশিষ্ট শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ খুলনায় শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেষ্টিভ ডিজিজ রিসার্চ ও হাসপাতাল নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী অটিজম আন্দোলনে তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, সায়মা ওয়াজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই অটিজম শিশুদের লুকিয়ে রাখা বা তাকে নিয়ে অভিভাবকদের মুখ লুকানো ভাব অনেকাংশেই বন্ধ হয়েছে। বরং স্পেশাল চাইল্ড হিসেবে তাদের বিশেষ যতেœ সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য দেশে বিদেশে সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাধ্যমে অটিজম ও অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্ট সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ স্থাস্থ্যসেবাকে জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারাতেই বর্তমানে দেশে মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছরে উন্নীত হয়েছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী মহান জাতি, কারো কাছে মাথা নত করে আমরা চলব না। হাত পেতে চলব না। মর্যাদা নিয়ে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলব।
তিনি বলেন, এটাই আমার একমাত্র কামনা-সর্বক্ষেত্রে নিজেদেরকে আমরা একটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করব এবং বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার কাক্সিক্ষত ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ