Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

ফুটপাতকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে

প্রকাশের সময় : ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় ফুটপাত দখল উচ্ছেদ এবং পুনরায় দখল হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। এ নিয়ে এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে। এর স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও তা কার্যকরে কোনো উদ্যোগ নেই। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বরাবরের মতোই গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করতে গেলে ডিএসসিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একদল যুবকের সঙ্গে হকার এবং গুলিস্তান পাতাল মার্কেটের দোকানিদের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত ডিএসসিসি’র এই উচ্ছেদ অভিযানে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল মার্কেট, ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর ও দক্ষিণ, গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্স ও ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের চারপাশ থেকে পাঁচ শতাধিক অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর দুটি অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা ডিএসসিসিকে সহযোগিতা করে। এ সময় মহানগর ছাত্রলীগের দুই নেতাকে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন এবং পুলিশ-র‌্যাবের সামনে হকারদের ধাওয়া করে ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা যায়। বলা বাহুল্য, বরাবরের মতো উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পরদিনই ফুটপাতে আবার অবৈধ দোকানপাট বসেছে। কয়েক মাস আগেও ডিএসসিসি গুলিস্তান ও অন্যান্য এলাকায় ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযান চালায়। দেখা গেছে, উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই পুনরায় ফুটপাতগুলো দখল হয়ে গেছে।  
রাজধানীর তীব্র যানজটের অন্যতম কারণ রাস্তার দু’পাশের ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়া। যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য নগরবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করার তাকিদ দিয়ে আসছেন। তাদের এসব আহ্বান কোনো কাজে আসেনি। বরং দিন দিন ফুটপাত দখল বেড়ে চলেছে। ফুটপাতে এসব অবৈধ দোকানপাট বসার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যর মদদের অভিযোগ রয়েছে। ফুটপাতে দোকান বসতে দেয়া এবং এসব দোকান থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে এ চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জীবন ও জীবিকার তাকিদে হকারদেরও বাধ্য হয়েই ফুটপাতে বসতে হচ্ছে। বলা যায়, তাদের জীবিকাকে পুঁজি করেই কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। গুলিস্তানে ফুটপাত দখল করে বসা এক হকার জানিয়েছেন, পুরো গুলিস্তানে ফুটপাত ও রাস্তার উপর প্রায় দেড় হাজার হকার বসে। তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ টাকা করে মাসে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এসব চাঁদা তোলে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য। এ চিত্র যে শুধু গুলিস্তান এলাকার তা নয়, রাজধানীজুড়ে ফুটপাত দখল করা সব এলাকার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ এলাকাভেদে ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যর যৌথ সহযোগিতায় ফুটপাত দখল হওয়া বজায় রয়েছে এবং মাসে শত শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য হচ্ছে। সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা অসংখ্যবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও এই দখল বাণিজ্য ঠেকাতে পারছে না। অনেকে উচ্চ আদালতের দ্বারস্ত হয়েও এর প্রতিকার পায়নি। বছর দুয়েক আগে উচ্চ আদালত এই গুলিস্তান এলাকা থেকেই সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেখা গেছে, কয়েক দিন মুক্ত থাকার পর, তা পুনরায় দখলে চলে যায়। মোদ্দা কথা, যাদের উচ্ছেদ করার দায়িত্ব তাদের মধ্যে যদি গলদ থাকে বা সর্ষের ভেতর ভূত বসবাস করে, তবে এ সমস্যার সমাধান কোনো কালেই হবে না। এতে রাজধানীর যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হবে, কর্মমুখী মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হতেই থাকবে। বিভিন্ন সময়ে পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, যানজটে প্রতিদিন ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এ ক্ষতির মধ্যে অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে, অবৈধভাবে ফুটপাত দখল। বলার অপেক্ষা রাখে না, ফুটপাতগুলো যদি দখলমুক্ত করে পথচারিদের চলাচলের উপযোগী করা হতো, তবে তাদের মূল সড়ক ধরে এলোমেলোভাবে পথ চলা এবং দুর্ঘটনার শিকার হতে হতো না। মূলসড়ক যেমন অনেকটাই প্রসারিত হতো, তেমনি যানজটও সহনীয় পর্যায়ে চলে আসতো।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক যথার্থ বলেছেন, হকারদেরও জীবন আছে। এই আয়ে তাদের সংসার চলে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকারদের উচ্ছেদ করা যাবে না। তবে এ বিষয়টিও ভাবতে হবে, আধুনিক রাজধানী গড়ে তুলতে, যানজট নিরসনে এবং পথচারীদের চলাচল নির্বিঘœ ও অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে হলে ফুটপাত দখলমুক্ত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার বিকল্প নেই। বছরের পর বছর ধরে ফুটপাত একশ্রেণীর ক্ষমতাধর ব্যক্তির অবৈধ বাণিজ্যের ক্ষেত্র হিসেবে থেকে যাবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই শ্রেণীটি যদি প্রশ্রয় না দিত, তবে ফুটপাতে কোনোভাবেই হকার বসতে পারতো না এবং উচ্ছেদ করতে গিয়ে সংঘর্ষ ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না। সরকার নাগরিকদের সুবিধার্থে এবং যানজট নিরসনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলসহ বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আমরা মনে করি, এসব বড় প্রকল্পে পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টিও অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। শুধু প্রয়োজন সৎ উদ্যোগ, কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ। হলি ডে মার্কেটের মতো সপ্তাহে এক বা দুই দিন অস্থায়ী পদ্ধতির মাধ্যমে নয়, হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পিতভাবে জায়গা বরাদ্দ জরুরী। সবচেয়ে বড় কথা, যে কোনো উপায়েই হোক ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ দেখাতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ