Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৮ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক : আইন আছে প্রয়োগ নেই

প্রকাশের সময় : ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১০:৪২ পিএম, ২৯ অক্টোবর, ২০১৬

মালেক মল্লিক : দেশে শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। বাসা-বাড়ী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে যানবাহন, কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। প্রতিদিনই কম-বেশি শিশু নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। গতানুগতিক নির্যাতনের সাথে যোগ হয়েছে ধর্ষণ, খুন এবং অপহরণ। বিশেষ করে, ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যানেই শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্র ফুটে উঠেছে। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ৯ মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ৩৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গত বছর অপহরণ করা হয় ২৪৩ জনকে। তাদের মধ্যে উদ্ধার করা হয় ১৬৭ জনকে। আর ২০১৪ সালে অপহরণের শিকার ২০৯ জনের মধ্যে ৯২ জনকে উদ্ধার করা হয়। আইনজ্ঞরা বলেছেন, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, প্রশাসনের ব্যর্থতা, তদন্তের ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া এবং তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন। এছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপসংস্কৃতির প্রসারের নির্যাতনের বাড়ছে বলে তারা জানিয়েছেন। আইনের যথার্থ প্রয়োগ এবং প্রতিটি জেলায় কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ নেকওয়ার্ক স্থাপন করার মতামতও দেন তারা।
বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী এসব অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদ-ও হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে অর্থদ-ের বিধান। আইন আছে কিন্তু সেটা যেন কাজীর কেতাবের মতোই। কাজীর গরু ‘কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’। শিশু নির্যাতন বন্ধে নানান আইন রয়েছে। সে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ৩২৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৪৮টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৩১টি প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিশু, পাঁচটি শিশু গৃহকর্মী কর্মস্থলে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১৫টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। চলতি বছরের ৯ মাসে ধর্ষণের শিকার শিশুদের অধিকাংশের বয়সই পাঁচ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। পাঁচ থেকে ১২ বছরের শিশুদের ধর্ষণ করা হয়েছে চকলেট, খেলনা বা কোন শৌখিন জিনিস দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এবং কোন নির্জন স্থানে বা বাড়িতে একা পেয়ে। ১৩ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের ধর্ষণ করা হয়েছে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে, জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে এবং কোন নির্জন স্থানে বা বাড়িতে একা পেয়ে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ৫২১টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৯৯ এবং ২০১৩ সালে ১৭০টি এবং ২০১২ সালে ৮৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।  
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিশুদের ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি, বলাৎকার, উত্ত্যক্তকরণ, শিক্ষকের মাধ্যমে যৌন নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৭৫৪টি। এর মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ১৮৪টি। আটটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর এবং আসকের নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা প্রতিবেদন মতে, বছরের নয় মাসে ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টা ঘটেছে ১৯০টি। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ১১৭টি।
চলতি বছর গত ২৪ অক্টোবর রাজশাহীর পবা উপজেলায় চার বছর বয়সী এক কন্যা শিশুকে ধর্ষণ করে রুহুল আমিন। ঘটনার দিন সন্ধ্যার একটু আগে ফাঁকা মাঠে একা পেয়ে ওই শিশুকে ধর্ষণ করে।  এর আগে ১৬ মে মৌলভীবাজারে চকলেট খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে এক যুবক। ২৭ এপ্রিল লালমনিরহাট শহরে আপেল খাওয়ার লোভ দেখিয়ে বাসায় নিয়ে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে মকবুল হোসেন। ঘটনার দিন রাতে শিশুটির বাসায় আর কেউ না থাকার সুযোগে তাকে আপেল দেয়ার কথা বলে নিজের বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করে। সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর দিনাজপুরের পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু নিখোঁজ হয়। পরদিন ভোরে শিশুটিকে তার বাড়ির কাছে হলুদ ক্ষেতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। জ্ঞান ফেরার পর শিশুটি জানায়, তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের পরিচিত একজন ব্যক্তি তাকে ব্যথা (ধর্ষণ) দিয়েছে। শিশুটি এখন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। ধর্ষিতা শিশুর বাবা সুবল চন্দ্র দাস ধর্ষণকারীর শাস্তি দাবি করেছেন।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন আইন আছে। এই আইনের মাধ্যমে বিচার করলেও শিশু নির্যাতন কমানো সম্ভব। তিনি আরো বলেন, অপরাধীকে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মামলা আরো নিষ্পত্তিতে আরো উদ্যোগী হতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত সংস্থা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আমি আইনমন্ত্রী থাকাকালে তদন্ত কারীকে মামলার সাক্ষী হাজির করার জন্য বাধ্যবাধকতা করে দিয়েছিলাম। যদি কেউ যদি যথা সময়ে হাজির না করতে পারে তাহলে উপযুক্ত কারণ দর্শানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। জানি না এখন কি অবস্থা। তিনি আরো বলেন, শিশু নির্যাতন কমাতে সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে কি কারণে শিশুটিকে ধর্ষণ করছে তার কারণ নির্ণয় করতে হবে। দ্রুত বিচার তো মাত্র সময়ের জন্য। এসব না করতে পারলে কমানো সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, শিশু নিযার্তনসহ নারী নির্যাতন, জঙ্গী দমন সবকিছুই জন্য আইন রয়েছে। মুখ্য উদ্দেশ্য হল এসব অপরাধ প্রতিরোধ করা। আইনের সঠিক প্রয়োগ যে ধরনের তদন্ত করা অর্থাৎ যারা তদন্ত করবেন তাদেরকে সঠিকভাবে তদন্ত করতে হবে। যদি আসামীর বিরুদ্ধে দ্রুত গতিতে চার্জশীট করে জমা দেন তাহলে দ্রুত সাজা দেয়া সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশের গোড়ায় গলদ তদন্ত পর্যায়ে চলে নানা নাটক। যেমন তনু হত্যাসহ সম্প্রতি আরো কতগুলো ঘটনা। ফলে মামলার আসামী সাজা হয় না। তিনি আরো বলেন, এজন্য সরকারের ইচ্ছার প্রয়োজন। অন্যথায় যত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার হোক না কেন অপরাধীর সাজা হবে না।
চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম বলেন, শিশু নির্যাতন আইন আছে, সঠিক প্রয়োগ নেই। ফলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। প্রথমে অপরাধীকে চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিভিন্ন আইন থাকলেও তা উপেক্ষিত। তিনি আরো বলেন, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে যে আইনটি  করা হয়েছে সেটাও আবার দুর্বল আইন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের পাশাপাশি সরকারকে এ বিষয়ে প্রচারণা, কাউন্সিল করতে হবে। তিনি আরো বলেন, এছাড়াও প্রতিটি জেলায় কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ নেকওয়ার্ক স্থাপন করতে। এতে করে সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও মাকদসেবী এবং ধর্ষণকারীর বিষয়ে সরকার নজর রাখতে পারবে। যা উন্নত দেশের রয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া।



 

Show all comments
  • রিমন ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:২২ পিএম says : 0
    এর দায়ভার কার ?
    Total Reply(0) Reply
  • সানজিদা ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:৩৪ পিএম says : 0
    আদৌ কি কোনো শাস্তি হবে তাদের?
    Total Reply(0) Reply
  • রবিউল ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১:৫৪ পিএম says : 0
    এসব বিষয় নিয়ে সরকার ও প্রশাসনকে গভীরভাবে ভাবা উচিত।
    Total Reply(0) Reply
  • তারেক মাহমুদ ৩০ অক্টোবর, ২০১৬, ১:৫৬ পিএম says : 0
    আইন আছে প্রয়োগ নেই। তাহলে সেই আইন থাকা আর না থাকা সমান।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ