Inqilab Logo

বৃহস্পিতবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ০৩ ভাদ্র ১৪২৯, ১৯ মুহাররম ১৪৪৪

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১৪ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০৪ এএম

এমন কোনো দিন নেই, যেদিন দেশের কোনো না কোনো এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা না ঘটছে। প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। মানুষ আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। নিহত ও আহত হওয়া এসব মানুষের কী দুর্দশা, তা কেউ জানে না। ‘একটি দুর্ঘটনা, সারাজীবনের কান্না’ বলে যে কথাটি রয়েছে, তা এসব পরিবারের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে। স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বা সংঘটিত দুর্ঘটনায় চালকের তেমন কোনো ত্রুটি ছিল না বলে একটি কথা আছে। তবে আমাদের দেশে প্রতিদিন যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে এ কথাগুলো খাটে না। এসব দুর্ঘটনার সিংহভাগই অদক্ষ চালক, বেপরোয়া যান চালনা এবং সড়কের নিয়ম-নীতি না মানার কারণে ঘটে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনার এসব কারণ নতুন কিছু নয়। বহু আগেই কারণগুলো চিহ্নিত হয়ে আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এগুলোর প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয় না বা হচ্ছে না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ প্রতিকারে দিনের পর দিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। সড়ক অবরোধ করে তাদের সহপাঠীদের হত্যার বিচার চেয়েছে। সরকারের তরফ থেকে সড়ক নিরাপদ ও দুর্ঘটনার কারণ প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হবে বলা হলেও তার বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেই। উল্টো দুর্ঘটনার হার বেড়ে চলেছে। চালকদের বেপরোয়া আচরণও থামছে না। গত মাসের শেষের দিকে এয়ারপোর্ট রোডে এনা পরিবহনের একটি বাস সড়কের উঁচু ডিভাইডারের উপর দিয়ে পাশের সড়কে একটি মাইক্রোবাসের উপর গিয়ে পড়ে। এতেই বোঝা যায়, চালকরা কতটা বেপরোয়া। এর আগে অদক্ষ চালকের কারণে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের বেপরোয়া আচরণ দায়ী। এ নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি এবং গবেষণা সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো হুশ হচ্ছে না। মেট্রোরেলসহ নানা উন্নয়ন কাজ চলায় এমনিতেই রাজধানীর সড়কগুলো বেহাল হয়ে পড়েছে। প্রশস্ত সড়ক গলির আকার ধারণ করেছে। এই সরু সড়কের মধ্যে মোড়ে মোড়ে ট্র্যাফিক পুলিশও রয়েছে। এর মধ্যেই চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। একটি পরিবারের কর্মজীবীর মৃত্যু ঘটিয়ে শুধু সেই পরিবারকে রাস্তায় বসিয়ে দেয়া নয়, দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে তার যে মেধা ও দক্ষতা, তারও পরিসমাপ্তি ঘটে। অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক হিসেবে দেখানো হয়েছে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৪৫৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। যেসব পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, সেসব পরিবারের ক্ষতি নিরূপণ করা সহজ কাজ নয়। দুর্ঘটনার জন্য তারা যেমন দায়ীদের দায়ী করতে পারছে না, তেমনি তাদের ক্ষতিপূরণও হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেপরোয়া ও অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এবং তাদের গ্রেফতার করা হলেও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না। এক্ষেত্রে পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়ে উঠে। সরকারও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শন করে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে যে আইন করা হয়, তা আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

দুই.
এখন সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ক্রান্তিকাল চলছে। একের পর এক অনৈতিক ঘটনা ঘটছে, খুন-খারাবি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আপন মানুষ খুনি হয়ে উঠছে। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে, তাদের একটা শ্রেণীও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মনুষ্যসৃষ্ট এক ধরনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সমাজ ও পরিবার চলছে। যেসব ঘটনা ঘটছে, এগুলো কোনভাবেই দুর্ঘটনা নয়। জেনেবুঝেই করা হচ্ছে। খুনি কিভাবে খুন করেছে, তা যেভাবে অবলীলায় বর্ণনা করে, তাকে দুর্ঘটনা বলা যায় না। একইভাবে সড়ক ও নৌপথে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকেও এখন আর শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না। যাত্রাপথ এখন মৃত্যুপথে পরিণত হয়েছে। ঘর থেকে বের হয়ে কেউ যে আবার ফিরতে পারবে, তার নিশ্চয়তা নেই। গত ৮ জানুয়ারি গুলিস্তানে সকালে ঘর থেকে বের হয়ে দুই পথচারি বেপরোয়া বাসের চাপায় পড়ে নিহত হয়। সাতসকালে বাসা থেকে বের হয়েই বেপরোয়া চালকের কারণে তাদের প্রাণ দিতে হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে এক অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করে, এ যাত্রা থেকে ফিরতে পারবে কিনা, তা জানে না। সড়ক দুর্ঘটনা এখন এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তার চিত্র দেখলে আঁৎকে উঠতে হয়। গত ৮ জানুয়ারি রোড অ্যান্ড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১৭ শতাংশ। এ হিসেবে, দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি এবং নিহত হয়েছে ৬ হাজার ২৮৪ জন। গড়ে প্রতিদিন মারা গেছে ১৭ জনের বেশি। পত্র-পত্রিকার প্রকাশিত দুর্ঘটনা থেকে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবে এ সংখ্যা চার-পাঁচ গুণ বেশি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, গত বছর দুর্ঘটনায় নিহতদের ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৮০৩ জন শিক্ষার্থী মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থাৎ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রতিদিনই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘গণবিধ্বংসী’ এবং ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসকারী’ বলছেন। তারা বলছেন, এর জন্য এখন চালক বা অন্য কারণের চেয়ে বেশি দায়ী নীতিনির্ধারকরা। এটি এখন রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। যারা সড়কে বিশৃঙ্খলার সুবিধাভোগী, তারাই নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন কমিটিতে বসে আছেন। ফলে কারিগরিভাবে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠার কারণ রাজনৈতিক। শ্রমিক সংগঠন থেকে শুরু করে পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে সরকারি দলের লোকজন। ফলে তাদের বলে বলিয়ান হয়ে চালকরা বেপরোয়া আচরণ করছে। সর্ষের মধ্যে যখন ভূত থাকলে সে ভূত তাড়ানো যায় না। এ নিয়ে যতই আইন ও নিয়মকানুন করা হোক না কেন, তা কখনো আলোর মুখ দেখবে না। সড়ক দুর্ঘটনাকে বিশেষজ্ঞরা বহু আগে থেকেই ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ হত্যাকাণ্ডের দায় নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রোড অ্যান্ড সেফটি বলেছে, গত বছর যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি। এছাড়া চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহন, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, দুর্বল ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং সড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসচেতনতা। নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের একাধিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানোর চারটি বড় কারণ হচ্ছে, চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, স্থায়ী নিয়োগের বদলে যাত্রার ওপর বেতন নির্ধারণ, শাস্তির অপ্রতুলতা এবং হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা। এসব কারণ থেকে না বোঝার কারণ নেই, দুর্ঘটনার পেছনে মানুষের হাত কতটা। এগুলো কোনো প্রাকৃতিক বা দৈব দুর্ঘটনা নয়। এসব কারণ দূর করা যায়, ঠেকানো যায়, যদি সংশ্লিষ্টরা সচেতন হন, দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে দায় না সারেন এবং দুর্ঘটনার কারণগুলো দূর করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বড় ধরনের কোন ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটলেই আমরা কেবল তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে কারণ ও প্রতিকার নিয়ে মেতে উঠি। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পথও বাতলে দেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসে। কিছুদিন গেলেই তা ভুলে যায় আরেকটি বড় দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত।

তিন.
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম কোন সদস্য মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের শিকার হলে সে পরিবারটি কি শোচনীয় ও অশেষ দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে, তা তারা ছাড়া আর কারো পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আমরা দূর থেকে দুঃখ ও শোক প্রকাশ করা ছাড়া কিছু করতে পারি না। পুরো পরিবারটিই যে ছারখার হয়ে গেল, তা গভীরভাবে চিন্তা করি না। বিগত দুই দশকে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মানুষের পরিবারগুলো কি অবস্থায় আছে, তা কি আমরা কেউ জানি? দূর অতীতের পরিসংখ্যানে না গিয়ে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে তাদের পরিবারগুলো কি অবস্থায় রয়েছে, তাও তো আমরা জানি না। পরিবারের খোঁজও কেউ নিচ্ছে না। অথচ রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব এসব পরিবারগুলোর খোঁজ নেয়া এবং তারা যে নির্মম পরিণতি ভোগ করছে, তা উপলব্ধি করে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। সড়কে মৃত্যুর যে মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে, এর রাস টেনে ধরা। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষের মৃত্যু হয় না, তার পরিবারটিও নিঃস্ব হয়ে যায়। এভাবে অভিভাবকহীন কত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তার খবর কখনোই পাওয়া যায় না। এ নিয়ে কোন পরিসংখ্যানও করতে দেখা যায় না। দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলো সমাজে বা রাষ্ট্রের কি প্রভাব ফেলছে তারও হিসাব করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের শতকরা ৭৩ ভাগ উৎপাদনশীল খাতের সাথে জড়িত। সরকারি হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। রোড অ্যান্ড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। দুর্ঘটনার শিকার যানবাহনের ক্ষতি কত হয়, তা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, এ বিষয়টি সরকার আমলে নিচ্ছে না, শুধু তার লোকজন নীতিনির্ধারণী জায়গায় বসে থাকার কারণে। তা নাহলে, আইন করেও কেন তা কার্যকর হবে না? এখানেই সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের নিশ্চয়ই দায় রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি চালকদের ডাটাবেজ তৈরি করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করত, তাহলে অধিকাংশ চালককে ঘুষ দিয়ে জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হতো না। হাইওয়ে পুলিশ যদি¡ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করত তবে, গাড়ি চালকরাও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে পারত না। মোটরযান আইনে জাতীয় মহাসড়ক এবং শহর ও লোকালয়ের জন্য আলাদা গতিসীমা রয়েছে। মহাসড়কে বাস, কোচ ও পিকআপের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘন্টায় ৫৫ কিলোমিটার, ভারী ট্রাক ও লরির গতিবেগ ৫০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার। ব্যক্তিগত গাড়ির সার্বোচ্চ গতি ১১০ কিলোমিটার। অন্যদিকে শহর ও লোকালয়ে বাস, কোচ, পিকআপ, ভারী ট্রাক, লরির সর্বোচ্চ গতিসীমা ৪০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহন ২০ কিলোমিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ৫০ কিলোমিটার। মহাসড়ক ও শহরের যানবাহনের গতির দিকে তাকালে গতিসীমার এ আইন যে কেউ মানছে না বা কর্তব্যরত ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ মানানোর যে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বাস-ট্রাকের অনেক চালক বলেছেন, তাদের প্রায় সব চালকই ট্রিপ অনুযায়ী মালিকের কাছ থেকে টাকা পান। তারা মাসিক বেতনভুক্ত নন। এজন্য ট্রিপ বাড়ানোর জন্য পথে গতি বৃদ্ধি করে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। এতেই দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ ট্রিপ বাড়িয়ে বাড়তি রোজগারের জন্য তারা শুধু নিজের জীবনের ঝুঁকিই নিচ্ছে না, যাত্রীদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

চার.
চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা, প্রশিক্ষণের অভাব, মাদকাসক্তি, মোবাইলে কথা বলা, জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, সড়কের ত্রুটি ও যথাযথ সংস্কারের অভাব, আইনের কার্যকর প্রয়োগ না হওয়াÑএসব কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব কারণ দূর করতে পারলেই কেবল দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে। কাজেই শনাক্তকৃত কারণ দূর করতে এবং পরিবহন খাতে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিকল্প নেই। মূল সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। পরিবহন সংগঠন ও মালিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে দুর্ঘটনার দায় নিতে হবে। গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ, দক্ষ চালক তৈরি, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্ধারণ, বিআরটিএ’র দক্ষতা বৃদ্ধি, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন নিষিদ্ধ বা বিকল্প সড়ক নির্মাণ করতে হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বা দুটি গাড়ির মালিকদেরসহ অন্যান্য পরিবহন কোম্পানীকে একটি বড় কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশেই মালিকদের সমন্বয়ে বড় কোম্পানি গঠন করে পরিবহণ ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়। এতে চালক ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ে। পরিবহন খাতেও শৃঙ্খলা ফিরে আসে। সারা দেশের চালকদের সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে চালকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সড়কের নিয়ম কানুন মেনে চলার জন্য চালক ও যাত্রীদের বাধ্য করতে হবে। বাংলাদেশে শতকরা ৭০ ভাগ যাত্রী সড়ক পরিবহনে যাতায়াত করে। সড়ক পরিবহনে এত যাত্রী খুব কম দেশেই দেখা যায়। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সড়ক পরিবহনের উপর থেকে চাপ কমাতে হবে। এজন্য রেল ও নৌপথকে আধুনিক ও গতিশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে। রেলকে যাত্রীদের কাছে নিরাপদ, আরামদায়ক ও জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। বাংলাদেশে রেলের বিপুল সম্পত্তি ও বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এবং সেবার মান বৃদ্ধি করে যাত্রীদের রেল ভ্রমণে উৎসাহী করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ সবসময়ের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। তখনই কেবল দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে।

[email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সড়ক দুর্ঘটনা


আরও
আরও পড়ুন