Inqilab Logo

বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৩ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

হাজতখানা স্রেফ অপচয়

দুদক কার্যালয়ে নিছক দর্শনীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই এটি বিগত কমিশনের কাজ

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০১ এএম

কোনো কাজেই আসছে না দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাজতখানা। এটি স্থাপনের চার বছরে কোনো আসামিকে একরাতও রাখা হয়নি কথিত এ ‘হাজতাখানা’য়। এটি স্থাপনে যে ব্যয় হয়েছে সেটি স্রেফ অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে এ তথ্য।
সূত্রমতে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিগত কমিশন এই হাজতখানা স্থাপন করে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই যে কোনো সংস্থা হাজতখানা স্থাপন এবং পরিচালনা করতে পারে না-এটি তৎকালীন কমিশনের মাথায় কাজ করেনি। ফলে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে হাজতখানা স্থাপনের পর এটি ব্যবহারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাইতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। পুলিশের আপত্তির মুখে কথিত হাজতখানাটি ব্যবহারের অনুমোদন মেলেনি। এতে সেগুনবাগিচাস্থ দুদক কার্যালয়ের হাজতখানাটি এখন নিছক দর্শনীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। আসামি গ্রেফতারের পর আদালতে সোপর্দ করা পর্যন্ত দুদককে এখনও থানা-পুলিশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সূত্রটি জানায়, বিগত কমিশন ৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘প্রশাসন অনুবিভাগ’র কার্যক্রমের ৫ ও ৬ নম্বর এজেন্ডা হিসেবে ২০১৬ সালে যথাক্রমে ‘সশস্ত্র ইউনিট’ এবং ‘হাজতখানা’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। হাজতখানা স্থাপনকে বড় একটি ‘সাফল্য’ বলে প্রচার করে তৎকালীন কমিশন। ২০১৬ সালে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সশস্ত্র ইউনিট গঠন এবং নিজস্ব হাজতখানা তৈরির অনুমোদন চান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। তাতে বলা হয়, স্বাধীন কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজকে অধিক গতিশীল এবং পুলিশের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীলতা হ্রাস করতেই দুদক থেকে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বহু চিঠি চালাচালির পর ২০১৮ সালে হাজতখানা স্থাপনের অনুমতি পায় দুদক। তবে আইনগত জটিলতার কারণে দুদক কর্মকর্তাদের অস্ত্র বহনের অনুমতি মেলেনি। তাই নিজস্ব ‘সশস্ত্র ইউনিট’ সৃষ্টি করাও সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের ২০ সদস্যকে প্রেষণে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘আর্মড ইউনিট’। এই ইউনিট এখন ২৪ ঘণ্টা দুদকের ব্যারাকে অবস্থান করে। তাদের কোনো কাজে লাগানো হয় না।
সংস্থার একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, সংজ্ঞায় উল্লেখিত শর্ত এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দুদকে দু’টি হাজতখানা স্থাপন করা হয়। নারী আসামিদের রাখার জন্য স্থাপন করা হয় পৃথক হাজতখানা। পিআরবি ৩১৭ বিধি, পিআরবি ৩২২ বিধি, পিআরবি ২২৮ এবং পিআরবি ৩২৯ বিধি অনুসারে সমস্ত আয়োজনই সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু হাজতখানা ব্যবহারের অনুমতি প্রদানে আপত্তি তোলে পুলিশ। ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সভায় খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসামি হাজতখানায় রাখা দুদকের কাজ নয়। এরপর ওই হাজতখানা ব্যবহারে সরকারি অনুমোদন লাভের চেষ্টাও ভেস্তে যায়।
গ্রেফতারকৃত আসামি থানা পুলিশের হেফাজতে রাখার স্বীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা জানান, আসামিকে হাজতে রাখার এখতিয়ার পুলিশই দিতে চাইছে না। তবে এতে দুদকের অনেক অসুবিধা হচ্ছে। আসামি গ্রেফতারের পর সমস্ত দায়-দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে দুদককে। অথচ আসামি রাখতে হচ্ছে পুলিশি জিম্মায়। পুলিশের হাজতখানায় আসামি রাখা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ আসছে।
এছাড়া অনেক প্রভাবশালী আসামি থানা পুলিশের কাছ থেকে কিছু অনৈতিক সুবিধাও নিচ্ছেন। থানা পুলিশ অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা বিক্রি করছে। আসামিদের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ-পথ্যও দেয়া হয় না। এমন ঘটনাও রয়েছে, ক্ষুধার্ত আসামিকে বাসা থেকে আনা নাশতা খেতে দেয়ার বিনিময়ে থানা পুলিশ ৩৭ হাজার টাকা আদায় করেছে। অর্থের বিনিময়ে অনেক ভিআইপি আসামি পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে গিয়েও রাত কাটানোর অভিযোগ রয়েছে।
থানা হাজতে অস্বাস্থ্য পরিবেশে আসামি অসুস্থ হয়ে যায়। আসামির ওপর মানসিক নির্যাতনও চালানো হয়। অথচ সংবিধান, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৬০ সালের পুলিশ আইন, ১৯৪৩ সালের ‘বাংলাদেশে পুলিশ রেগুলেশন’ এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে গ্রেফতারকৃত আসামিরও কিছু অধিকার রয়েছে। থানা হাজতে সেই অধিকার সুরক্ষা হয় না।
এসব দিক বিচেনা করে দুদক নিজস্ব হাজতখানা স্থাপন করে। কিন্তু হাজতখানা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ কর্মকর্তা বলেন, ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতারকৃত প্রভাবশালী আসামি জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভুইয়া, পাপিয়া, রিজেন্ট সাহেদ, ডা: সাবরিনা, আরিফ চৌধুরী এবং পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত পি কে হালদারের সহযোগীদের দুদক হেফাজতে রাখতে গিয়ে থানা পুলিশের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এ সময় রমনা থানা হাজতের পুলিশের বিরুদ্ধে আসামির প্রতি মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আসে। পরে আসামিকে রাতে অন্য থানা হাজতে রাখেন দুদক কর্মকর্তারা।
আলাপচারিতায় দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুদক যেহেতু একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দুদককে যেহেতু আসামি গ্রেফতার করতে হয়, জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয় তাই একটি হাজতখানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ, আসামি গ্রেফতার করতে দিনে কিংবা রাতে সব সময়ই অভিযান চালাতে হয়। রাতে গ্রেফতার করা আসামি থানায় পাঠিয়ে দিতে হয়। পরদিন আবার থানা থেকে দুদকে আনা হয়।
অন্যদিকে রিমান্ড থেকে আসামিকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের নিজস্ব হাজতখানা ব্যবহারের অনুমোদন না মেলায় আসামিদের কর্মকর্তাদের কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়। এ ছাড়া পুলিশও সব সময় সহায়তা করতে চায় না। অনেক সময় জরুরি অভিযানে সময়মতো পুলিশ ফোর্স পাওয়া যায় না। এসব বিবেচনায় দুদক নিজস্ব আর্মড ফোর্স এবং হাজতখানা চেয়ে সরকারের কাছে দেন-দরবার করে।
নিজস্ব আর্মড ফোর্সের অনুমোদন না মিললেও অনুমোদন পায় নিজস্ব হাজতখানা স্থাপনের। কিন্তু এ হাজতখানা ব্যবহারের কোনো অনুমোদন মিলছে না। এতে এখনও আসামি গ্রেফতার, হেফাজতে রাখা এবং জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো: মাহবুব হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনও অবগত নই। আপডেট তথ্য জেনে জানাতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুদক

২৩ এপ্রিল, ২০২২

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ