Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে

মো. আরাফাত রহমান | প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০৩ এএম

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাতের ব্যাপক পরিবর্তন মূলত তিনটি কারণে ঘটছে: (১) জৈব জ্বালানির প্রাপ্যতা, পরবর্তী দশকগুলিতে ক্রমাগত নিঃশেষিত হবার আশঙ্কা এবং সরবরাহ ও চাহিদার সমন্বয়ের অভাবে মূল্যের উঠানামা (২) জলবায়ু পরিবর্তন রোধকল্পে বৈশ্বিক ধোঁয়া নির্গমন কঠোরভাবে হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তা এবং (৩) জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশে এখনও কার্যকরভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়নি। তবে ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার সম্পর্কিত জাতীয় নীতিমালা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থে সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাস, হাইড্রো, জিওথারমাল, টাইডল ওয়েব ইত্যাদি বুঝায়।

প্রচলিত বায়োগ্যাসের ফরমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি উৎসসমূহের অন্যতম, যা ব্যবহৃত প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৩৫-৬০% পূরণ করে থাকে। বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ সোলার ফটোভল্টিক্, সোলার থারমাল পাওয়ার, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস ইত্যাদির পরিমাণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের ক্ষমতা খুবই নগণ্য। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনব্যয় তুলনামূলকভাবে জৈব জ্বালানির খরচ অপেক্ষা অধিক, তা সত্ত্বেও আনুষঙ্গিক সমস্যা অর্থাৎ পরিবেশের ক্ষতি, স্বাস্থ্য সমস্যা এবং স্বল্প পরিচালনা খরচ বিবেচনা করলে এটি অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হবে।

সোলার ফটোভলটেইক সিস্টেম সমগ্র দেশে তিন লক্ষের অধিক পরিবারে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ক্ষমতা প্রায় ১৫ মেগা ওয়াট। উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ডেভলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সোলার এনার্জি প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সোলার পিভি সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে সৌর শক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

সোলার থারমাল পাওয়ার/কনসেন্ট্রেটিং সোলার পাওয়ার (সিএসপি) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌর বিকিরণ আহরণ করে কয়েকটি পর্যায়ের পর চূড়ান্ত পর্যায়ে মেকানিক্যাল এনার্জি উৎপাদনপূর্বক জেনারেটর পরিচালনা করা হয়। দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি পূরণের জন্য এর প্রচলন করা আবশ্যক। বায়ুশক্তিও বিদ্যুতের ঘাটতি কিছুটা লাঘব করেছে। এটি কেবল জোরালো বাতাস আছে এইরূপ উপকূল এলাকা ও দূরবর্তী দ্বীপসমূহে কার্যকর থাকে। উপকূল এলাকার বায়ুশক্তির স্থাপনাসমূহের মাধ্যমে বায়ুচালিত পাম্প এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ফেনী ও কুতুবদিয়ায় ২ (দুই) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম বায়ুচালিত টারবাইন রয়েছে।

বাংলাদেশে বায়োগ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের সহজপ্রাপ্য বায়োগ্যাসের উৎসসমূহ হল: তুষ, ফসলের অবশিষ্টাংশ, কাঠ, পাটকাঠি, পশুর বর্জ্য, পৌর বর্জ্য, আখের ছোবড়া ইত্যাদি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। পশু ও পৌর বর্জ্য হইতে উৎপন্ন বায়োগ্যাস বাংলাদেশের জন্য একটি প্রতিশ্রুতিশীল নবায়ানযোগ্য জ্বালানির উৎস হতে পারে। সমগ্র বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক হাজার পরিবারিক ও গ্রামভিত্তিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট রয়েছে। রান্না-বান্নার কার্যে এবং গ্রাম ও উপ-শহর এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য মৌলিক বায়োগ্যাস প্রযুক্তি একটি সম্ভাবনাময় উৎস।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ব্যতীত বাংলাদেশে মাইক্রো হাইড্রো ও মিনি হাইড্রোর সম্ভাবনা সীমিত। কয়েকটি স্থানে দশ মেগাওয়াট হইতে পাঁচ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখনও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা গড়ে তোলা হয় নি। ১৯৬০ এর দশকে স্থাপিত দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হইল কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা দুইশত ত্রিশ মেগাওয়াট। অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস হলো: বায়োফুয়েল, গ্যাসোহোল, জিয়োথারমাল, ওয়েভ এবং টাইডাল এনার্জি। এইসব উৎসের সম্ভাব্যতা এখনও যাচাই করা হয় নি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো: (১) নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনাকে কার্যে পরিণত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি গ্রামাঞ্চল, উপশহর ও শহর এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া (২) নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহায়তা করা, উৎসাহ যোগান এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা (৩) দেশীয় অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প হিসাবে টেকসই জ্বালানি সরবরাহের উন্নয়ন করা (৪) বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটুকু অবদান রাখতে পারে তা নির্ধারণ করা (৫) বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি উভয়ের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটুকু অবদান রাখতে পারে তা নির্ধারণ করা।

(৬) নবায়নযোগ্য জ্বালানির যথাযথ, কার্যকর ও পরিবেশ-বান্ধব হিসাবে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা (৭) জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ সৃষ্টি করা (৮) নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি ও আইনী সহায়তা প্রদান করা (৯) নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রযুক্তি উন্নয়নে উৎসাহ প্রদান করা (১০) পরিশুদ্ধ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা (১১) মোট বিদ্যুৎ চাহিদার শতকরা দশ ভাগ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস হইতে মিটাবার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা।

এছাড়া টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রসারের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে সাসটেন্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করা হবে, যার দায়িত্ব বিভিন্ন এজেন্সি বা সংস্থার কার্যাবলীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কর্মপরিকল্পনাসহ টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনায় সম্বন্বয় করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য বিশুদ্ধ জ্বালানি প্রযুক্তি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং জাতীয় জ্বালানি নীতিমালা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়ন সুসংহতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য বিশুদ্ধ জ্বালানি প্রযুক্তি বিষয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন ব্যবসায়ের মডেল প্রদর্শন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্প প্রতিষ্ঠায় এবং সরবরাহকারীদের সহায়তা প্রদান।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তিকে সমালোচনা সহ্য করতে হয়। যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির খরচ অনেক বেশি এবং এটি অনেক বেশি প্রকৃতিনির্ভর তথা পরিবর্তনশীল। এছাড়াও কিছু নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌর শক্তি, বায়োগ্যাসের জন্য তুলনামূলক অনেক জায়গার প্রয়োজন হয় বলে মনে করেন অনেকে। যদিও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ক্রমাগত গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার ফলে নবায়নযোগ্য সৌর বিদ্যুতের দাম কমে এসেছে। নবায়নযোগ্য শক্তির পরিবর্তনশীলতার জন্য মানানসই ব্যাটারি ব্যাবস্থা দ্রুত উন্নতি হচ্ছে এবং অনেক দেশই স্মার্ট-গ্রিড পদ্ধতি স্থাপন করছে। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি যেহেতু সীমিত তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা নির্ভর করবে নবায়নযোগ্য শক্তির উপর। এছাড়া জলবাযু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির উপরে মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না এবং ক্রমান্বযয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
লেখক: সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার এন্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ