Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ০১ ভাদ্র ১৪২৯, ১৭ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

মৃত্যুর ঝুঁকি থাকার পরও লিবিয়া-ইউরোপে মানব পাচার কেন ঠেকানো যাচ্ছে না?

অনলাইন ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০২২, ১১:৪৭ এএম

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় আবার সাতজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এরকম ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও উন্নত জীবনের খোঁজে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার সময় বাংলাদেশিদের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

গত বছর মে মাসে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাবার পথে অভিবাসন প্রত্যাশীদের একটি নৌকা বে যাবার পর সাগর থেকে যে ৩৩জনকে উদ্ধার করা হয়েছে তাদের সবাই বাংলাদেশি ছিল বলে জানিয়েছিল আইওএম। সেই ঘটনায় ৫০ জন অভিবাসী নিখোঁজ ছিলেন। দু'হাজার উনিশ সালের মে মাসে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাবার পথে সাগরে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ৪০ বাংলাদেশি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বারবার বাংলাদেশিদের এরকম হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও কেন এই প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না?

দু'হাজার উনিশ সালে ইতালির এক আশ্রয় শিবিরে একজন বাংলাদেশি তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিবিসি সাংবাদিক ইসমাইল এইনাশে। সেই তরুণ বিবিসিকে বলেছেন, ২০১৬ সালে ১৯-বছর বয়সে কাজের খোঁজে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে এক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেন। এজন্য দালালের মাধ্যমে তার ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করা হয়, যেখানে তার বয়স দেখানো হয় ২১ বছর। তারা লিবিয়ায় গিয়ে কাজ করে ধনী হওয়ার জন্য তাকে প্রলুব্ধ করে। তাকে বলা হয়, সেখানে কাজ করে হাজার হাজার টাকা আয় করতে পারবে।

কিন্তু লিবিয়ায় যাওয়া মানুষের দুর্দশা, নির্যাতন, নিপীড়ন বা ঝুঁকি সম্পর্কে তাকে কিছু জানানো হয়নি। বাড়ির একটি গরু বিক্রি করে লিবিয়া যেতে টাকা দেয় তার পরিবার। প্রথমে তাকে ঢাকা থেকে বাসে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিভিন্ন ফ্লাইটে মুম্বাই, দুবাই, কায়রো হয়ে লিবিয়ায় যান। লিবিয়ায় যাওয়ার পরেই আরও টাকা আদায়ের জন্য তাকে একটি কারাগারে আটকে ফেলা হয়। বাড়ির বাকি দুটি গরু বিক্রি করে তার মুক্তিপণ দেয় পরিবার।

যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে তার মতো আরও ১৫ জন বাংলাদেশি ছিল। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে ত্রিপোলির একটি কারখানায় কিছুদিন কাজ করেন। কিন্তু সেখানেও তাকে নির্যাতন করা হতো। তখন তিনি আবার পাচারকারীদের সহায়তায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যারা সিদ্ধান্ত নেন। একটি ডিঙি নৌকায় করে ৭৯ জন বাংলাদেশির সঙ্গে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। উদ্ধার করার পর তাদের প্রথমে ল্যাম্পাডুসা দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে সিসিলির উপকণ্ঠে পলিমারোর একটি আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

লিবিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের মৃত্যু বা আটক হওয়া অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মিসর, ইরাক, সুদান বা সিরিয়ার নাগরিকদের পাশাপাশি সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও রয়েছে। অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ফ্রন্টিয়ারের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, যত মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করে আটক হয়েছে, বাংলাদেশ সেই তালিকায় তৃতীয়। গত বছর ৭,৫৭৭ জন বাংলাদেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেছে। এই তালিকার শীর্ষে তিউনিসিয়া। এরপরে মিশর, বাংলাদেশ, সিরিয়া, ইরান, আইভরি কোস্ট, ইরাক, আফগানিস্তান এবং এরিত্রিয়া রয়েছে।

অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা রামরুর চেয়ারপার্সন তাসনিম সিদ্দিকী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''রাষ্ট্রের যে মেকানিজম আছে, তার ভিতর যে জবাবদিহিতা থাকা দরকার, সেটা নেই। যারা যাচ্ছেন, তারা কিন্তু জেনেই যাচ্ছেন যে, তারা অবৈধ পথে যাচ্ছেন। তবে তারা ভাবেন, তারা পার হতে পারবেন, তাহলেই জীবন বদলে যাবে। তারা জেনেশুনে সেই ঝুঁকিটা নেয়।'' কিন্তু সেখানে পথে পথে যত বিপদ লুকিয়ে আছে, সেসব তথ্য তাদের কাছে খুব বেশি থাকে না।

''অন্যদিকে যাদের এসব ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব, তারা জেনে বুঝেও অনেক ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে থাকেন। যেমন এয়ারপোর্টে হয়তো এরা টুরিস্ট ভিসা নিয়ে যাচ্ছেন। তখন গ্রামের এই লোকটা প্রথমবার সুদান, তিউনিসিয়া যাচ্ছেন- দেখার পরেও তারা ছেড়ে দিচ্ছেন। সেখানে তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যাচ্ছে না,'' বলছেন তাসনিম সিদ্দিকী।

তবে অভিবাসন বিভাগের গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মোঃ মোকাব্বির হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, 'আমি আপনাকে নিশ্চিতভাবেব লতে পারি, বাংলাদেশ থেকে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কেউ ইমিগ্রেশন পার হতে পারে না। এখন ধরুন কারও কাছে কাছে দুবাইয়ের ভিজিট ভিসা আছে, তাকে আপনি কীভাবে আটকাবেন?''

''হয়তো অন্য কোন দেশের বৈধ ভিসা নিয়ে এখান থেকে বৈধভাবে বের হচ্ছে। সেখান থেকে সে লিবিয়া বা অন্য কোথাও যাচ্ছে। আমার এখান থেকে তো কেউ সরাসরি লিবিয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি, যাতে এভাবে কেউ বিদেশে গিয়ে অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা না করে। যাদের ভিজিট ভিসা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও আমরা যথেষ্ট সতর্ক আছি।''

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু এভাবে বিদেশগামী ব্যক্তিদের বেশিরভাগ মানুষ জেনেশুনে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হলে বা স্বজনরা হতাহত হলেও কেউ আর আইনি পদক্ষেপ নিতে চান না। ফলে ফেরত এলেও মামলা হয় না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মানব পাচার সংক্রান্ত ৫৩৮টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে গুটিকয়েক রয়েছে লিবিয়া থেকে মানব পাচার ঘিরে। সেই বছর ২০২০ সালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্যোগী হয়ে পাচারকারীদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

গত বছরের মে মাসে লিবিয়া উপকূল থেকে ৩৩ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করার পর বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছিলেন, "সরকারিভাবে লিবিয়ায় শ্রমিক পাঠানো বন্ধ আছে। সুতরাং যারা গেছেন তাঁরা নিজের রিস্কে গেছেন। তা ছাড়া তারা কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেও যাননি। সম্ভবত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গেছেন। তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।''

তবে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির খুব বিরল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মোঃ মোকাব্বির হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''পাচারের ক্ষেত্রে যারাই অভিযোগ করেন, যারা ফেরত আসছেন, সেটা অ্যাড্রেস করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, যারা বিদেশে গিয়ে ফেরত আসেন, তারা কারও বিরুদ্ধে বলেন না, মামলাও করেন না।

"আমরা তিউনিসিয়া থেকে যাদের ফেরত এনেছি, তাদের একজনও অভিযোগ করতে রাজি হননি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট চেষ্টা করে, কিন্তু কেউ যদি অভিযোগ না করে, তাহলে আপনি তো যে কাউকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না।'' ''যারা যায় এবং যারা পাঠায়, এই দুই গ্রুপের মধ্যে বোঝাপড়া অত্যন্ত শক্ত। তারা কেউ ডিসক্লোজড করে না, এটা রিয়েলিটি। আমরা বা ইমিগ্রেশন পুলিশ, সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু এরা কেউ স্বীকার করতে চায় না। তবে কেউ তথ্য দিলে সেটা অবশ্যই দেখা হয়,'' বলছেন মি. হোসেন।

ব্র্যাকের অভিবাসব প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলছেন, ''বড় বা আলোচিত ঘটনা হলে কিছু মামলা হয়, গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু কিছুদিন গেলেই সেটা থেকে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসলে কঠোর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়, ফলে মানব পাচারকারীদের কর্মকাণ্ডও বন্ধ হয় না।'' ''সেই সঙ্গে যারা বিদেশে যাচ্ছে, তাদের নিজেদের এবং তাদের পরিবারকে সবার আগে সচেতন হতে হবে,'' বলছেন মি. হাসান। সূত্র: বিবিসি বাংলা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অভিবাসন


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ