Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ০৫ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

পরিবেশ ও বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ১২:০৫ এএম

রাজধানীসহ দেশের প্রধান নগরীগুলোতে বায়ুদূষণ নতুন কিছু নয়। বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের অন্যান্য শহরের মধ্যে শীর্ষে থাকে। গত জানুয়ারির শুরু থেকে ঢাকা শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। ২১ দিনই ছিল নগরীর বায়ু অত্যন্ত দূষিত। ১৯ থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত একটানা ৪ দিন ছিল বায়ুদূষণের শীর্ষ তালিকায়। এবার জানা গেছে, ঢাকাকে ছাড়িয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষ স্থান দখল করেছে গাজীপুর। গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি পরিচালিত জরিপের ফলাফল উল্লেখ দৈনিক ইনবিলাবের এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেয়ার পলিউশন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুর এখন বায়ুদূষণের শীর্ষে রয়েছে। সংস্থাটি দেশের বায়ুমান নির্ণয়ের জন্য গত বছর সারাদেশের ৩ হাজার ১৬৩টি স্থানে গবেষণা চালায়। সাধারণত বাতাসে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি অনুযায়ী, সহনীয় পর্যায় হিসেবে ধরা হয় ২.৫ পিএম (পার্টিকুলেট ম্যাটার)। এ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই তা দূষিত হিসেবে গণ্য হয়। গাজীপুরের বাতাসে এ মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬৫ পিএম, যা বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়েছে। সারাদেশে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে গড়ে ১০২.৪ পিএম। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৪টিই দূষিত। এ এক ভয়াবহ চিত্র। এ থেকে বোঝা যায়, দেশে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ নেই বললেই চলে। পুরো দেশ এখন যেন এক গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে মানুষ দিন দিন নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বুকভরে নির্মল নিঃশ্বাস নেয়ার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাতাসের বিশুদ্ধতার জরুরি। দেখা যাচ্ছে, দেশের বায়ুদূষণ এতটাই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে যে, স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ঢাকার কথাই যদি ধরা হয়, তবে দেখা যাবে, এর বায়ু সবসময়ই সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক গুণ বেশি থাকে। ধুলোবালি, যানবাহন-কলকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, ময়লা-অবর্জনা থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধ ও অন্যান্য উপাদানে বায়ু সবসময় দূষিত থাকে। অনেক সময় এমনও দেখা যায়, দূষিত বায়ু নগরীকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এমন এক বিষাক্ত বায়ুমন্ডলের মধ্যেই মানুষ বসবাস করছে। নিঃশ্বাসের সাথে দূষিত বায়ু গ্রহণ করে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ, কিডনীজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। শুধু মৃত্যুই নয়, এর কারণে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তির যখন মৃত্যু হয়, তখন সে পরিবারটির কি পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে, তা কেবল তারাই জানে। অথচ এর জন্য তারা কাউকে দায়ী করতে পারছে না। বায়ুদূষণ কমানোর কোনো উদ্যোগও সরকার ও এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। এতে দেশের মানুষ যে, দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে, একটি অসুস্থ জাতিতে পরিণত হচ্ছে, এদিকে কোনো খেয়াল নেই। সরকার ব্যস্ত বড় বড় মেগাপ্রকল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ উন্নতি কার জন্য? মানুষ যদি অসুস্থ হয়ে থাকে এবং ক্রমাগত অসুস্থতার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে এ উন্নয়ন ভোগ করবে কে? সরকারকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বলা বাহুল্য, অসুস্থ জাতি নিয়ে কখনোই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এগিয়ে যেতে পারে না। বায়ুদূষণ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহু লেখালেখি হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। ভয়াবহ এ সমস্যা নিয়ে সরকার অনেকটা নির্বিকার। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের তৎপরতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অথচ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং করণীয় নিয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন প্রবণতা লক্ষণীয় যে, তারা যেন বৃষ্টি মৌসুমের অপেক্ষায় রয়েছে। বৃষ্টি হলে বায়ু সজীব-সতেজ হয়ে উঠবে এবং সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বায়ুদূষণ যে শুধু শুষ্ক মৌসুমেই হয় না, এটি সবসময়ের বিষয় হয়ে রয়েছে এবং মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তা তারা উপেক্ষা করে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা আত্মঘাতী ছাড়া কিছুই নয়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নাগরিকদের বসবাস উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সড়কে বা কোনো স্থানে সামান্য ময়লা-আবর্জনা কিংবা টিস্যু পেপার পড়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তা পরিস্কার করা হয়। কোনো কোনো দেশে যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেললে শাস্তির বিধান রয়েছে। দেশগুলো নগরীসহ সারাদেশের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখার জন্য নানা প্রকল্প ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে। আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হয় না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায় না। মানুষকে সচেতন করা দূরে থাক, তারা নিজেরাও সচেতন হচ্ছে না। নগরীতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণসহ সার্বিক দূষণে যে এক অসহনীয় পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলছে, এ ব্যাপারে উদাসীন হয়ে রয়েছে। এমনকি দেশ ও নগরজুড়ে যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে, সেগুলোও পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। পরিবেশ বিধ্বংসী এমন কর্মযজ্ঞ বিশ্বের আর কোথাও হয় কিনা, তা আমাদের জানা নেই। দেশের বায়ুদূষণ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, এ ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। যেসব কারণে বায়ূ দূষিত হচ্ছে, তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করতে হবে। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, যানবাহন, কালকারখানা এবং অন্যান্য স্থাপনা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধুলিবালি ও ধোঁয়া প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ বিশুদ্ধ রেখে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রকল্প বায়ু ও পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে উঠবে, সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে জবাবদিহি ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পরিবেশ ও বায়ুদূষণ রোধ
আরও পড়ুন