Inqilab Logo

শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

পদ্মা-যমুনায় ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ

নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়ানোর তাগিদ

প্রকাশের সময় : ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৫৫ পিএম, ৪ নভেম্বর, ২০১৬

আরিচা সংবাদদাতা : মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। এতে একদিকে সরকারের ইলিশ রক্ষার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে ইলিশের বংশ বিস্তার বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুুপ্ত হওয়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার সময় আরো বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তারা।
জানাযায়, বর্তমানে চলছে ইলিশ প্রজননের ভরা মৌসুম। এসময় ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে ওঠে আসে। স্রোতের বিপরীতে চলতে থাকে এবং ডিম ছেড়ে বংশ বৃদ্ধি করে। প্রজনন মৌসুম হিসেবে ইলিশের বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে ইলিশ ডিম ছেড়ে সারতে পারেনি। ফলে এ নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাওয়ার পর মানিকগঞ্জের শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে। এতে একদিকে সরকারের ইলিশ রক্ষার যে পদক্ষেপ তা ভেস্তে গেছে। অপরদিকে বিনষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার ইলিশের বংশ বিস্তার। নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ছে চকচকে রূপালী ইলিশ। ফলে জেলেদের পাশাপাশি অনেক শৌখিন মৎস্য শিকারী নদীতে এসেছে মাছ ধরতে। বর্তমানে শহর ও গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারে ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে বেশীর ভাগই রয়েছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। এসব মাছ আর কিছু দিন নদীতে থাকলেই ডিম ছাড়তো। বৃদ্ধি পেতো হাজার হাজার ইলিশ। এভাবে ডিমওয়ালা মাছ ধরা হলে এক সময় এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুপ্তি হয়ে যাবে। ফলে ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর সরকারী নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে এক থেকে দেড় মাস করা দরকার বলে অনেকেই মনে করছেন। এতে জেলেদের সাময়িক কষ্ট হলেও মা ইলিশগুলো অনায়াসে নদীতে ডিম ছেড়ে বংশ বিস্তার করতে পারবে। এতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বিলুপ্তির পথ থেকে রক্ষা পাবে জাতীয় মাছ ইলিশ। নদীতেও সারা বছর পাওয়া যাবে ইলিশ।
স্থানীয় জেলেরা জানান, সরকার যদিও ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুম হিসাবে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু এ সময়ে মা ইলিশ তেমন একটা ডিম ছেড়ে সারতে পারেনি। মূলত ইলিশের ডিম ছাড়ার সঠিক সময় হচ্ছে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের পুরো মাস। যারা নদীতে মাছ ধরে তারাই একমাত্র ভাল বলতে পারবে কখন ইলিশ ডিম ছাড়বে। ইলিশের প্রজনন মৌসুম নির্ধারণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন যদি জেলেদের সাথে আলাপ করে নিতো তাহলে ভাল হতো। এতে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপও ভেস্তে যেতনা বলে তারা মনে করেন। ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ করা না হলে আগামীতে এ দেশ থেকে ইলিশ মাছ বিলুপ্তি হয়ে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
শিবালয়ের ছোট আনুলিয়া গ্রামের জেলে রবি হলদার বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরি। মাছ ধরাই আমাদের একমাত্র কাজ। মাছ ধরে বিক্রি করে সারা বছর সংসার চালাই। আমরা বুঝতে পারি ইলিশ মাছ কখন ডিম ছাড়বে। সরকার ইলিশের ডিম ছাড়ার যে সময় মনে করেছিল তা আসলে সঠিক ছিলনা। তাই নদীতে ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ছে। মূলত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাস মা ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রকৃত সময়। এসময় যদি ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতো তাহলে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতো। আমরাও ওই সময় ইলিশ মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতাম এবং সারা বছর নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেতো।
জাফরগঞ্জের নাঠু হলদার জনান, সরকার নির্ধারিত প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক অসাধু জেলেরা প্রশসনকে ফাঁকি দিয়ে নদীতে মাছ ধরেছে। আমরা নদীতে যাইনি। ফলে অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্তু এখন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই বলে ডিমওয়ালা মাছ ধরতে আপত্তি নেই। তাই মা ইলিশ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি।
কৃষ্ণপুর গ্রামের নিরঞ্জন হালদার জানান, সরকারী নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানেও থামাতে পারেনি জেলেদের ইলিশ ধরা। এবার নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে মা ইলিশ ধরে গোপনে বিক্রি আর বরফ দিয়ে গুদামজাত করাই ছিল মৌসুমী জেলেদের প্রধান কাজ। ফলে নিষেধাজ্ঞার পরের দিন আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাটের মাছের আড়তে ওঠে শত শত মণ ডিমওয়ালা মা ইলিশ। মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর একদিনে হঠাৎ করে এত মাছ আসলো কোথা থেকে এটাই সচেতন মহলের প্রশ্ন? তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরে গুদামজাত করার কারণেই অল্প সময়ে এত মাছের আমদানী হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। এদিকে ক্রেতারা একটু কম দামে কেনার আশায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন মাছের আড়তে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সকালে আরিচা মাছের আড়তে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে ঢাকা, সাভার ও নবীনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাইভেটকার নিয়ে মাছ কিনতে আরিচা এসেছে ক্রেতারা। মাছের আড়তে শুধু মানুষ আর মানুষ।
এদিকে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সুযোগে পয়সা কামানোর ধান্ধায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিল কতিপয় সরকার দলীয় নেতাকর্মী, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধ ও এক শ্রেণীর সাংবাদিক। এদের ছত্রছায়ায় মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনা থেকে নির্বিচারে প্রচুর পরিমাণে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরে বিক্রি করে কয়েকদিনে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেছে মৌসুমী জেলেরা। শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কামাল মোহাম্মদ রাশেদের নেতৃত্বে মৎস্য অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে জেলেদেরকে আটক করে জেল জরিমাও করেছে। এরপরও মাছ ধরা বন্ধ রাখেনি জেলেরা।
নাম প্রকাশে অনৈচ্ছুক জনৈক এক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় যে সব জেলে সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও পুলিশকে টাকা দিয়ে কন্টাক করে নদীতে নেমেছে তারা ধরা পড়েনি। আর যারা টাকা দেয়নি তারাই ধরা পড়েছে। এর মধ্যে অনেকেই দালাল ধরে তদবির করে জরিমানা দিয়ে ছেড়ে এসেছে। আর যারা টাকা দিতে পারেনি তাদের জেল হয়েছে। জেলেদের ছাড়ানোর জন্য তদবির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্থানীয় বিশেষ কিছু ব্যক্তি। এরমধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও সাংবাদিক। জেলেদেরকে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় জোর তদবির। অভিযানের কয়েকদিন তদবিরকারী ওইসব সাংবাদিক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদেরকে থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে দেখা গেছে।
এ ব্যাপারে শিবালয় উপজেলার মৎস কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল আলম বলেন, এবছর ২৮টি মোবাইল কোর্ট এবং ৪২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে ১ দশমিক ৩১ মেট্রিক টন মাছ উদ্ধার করা হয়, যার মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৮৬ লাখ টাকা। মামলা হয়েছে ২শ’ ৬৮টি, জরিমানা করা হয়েছে ৯ দশমিক ২৪ লাখ টাকা, মোট ৫৪ জনকে জেল দেয়া হয়েছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামাল মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, ইলিশ প্রজননের এ মৌসুমে ইলিশ ধরার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার মেয়াদ আরো কিছু দিন বাড়িয়ে এক মাস করলে ভাল হতো। মা ইলিশ মাছগুলো আরো বেশী ডিম ছাড়তে পারতো। আগামী বছর নদীতে আরো বেশী মাছ পাওয়া যেতো। এতে ইলিশের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।



 

Show all comments
  • Md. Abdul Gaffar ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১০:৪৭ এএম says : 1
    প্রিয় সম্পাদক, আসলে আপনার এই খবরের 1নম্বর ও 2 নম্বর প্যারার খবর যদি হান্ডেটে হান্ডেট বাস্তব হয় তাহলে কর্তৃৃপক্ষের এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করার আবশ্যকতাও হান্ডেটে হান্ডেট।
    Total Reply(0) Reply
  • Md. Babul Khan ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ৯:০৯ এএম says : 0
    Mother Elesh not kach to fisher man to net
    Total Reply(0) Reply
  • Tania ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১:০৬ পিএম says : 0
    i agree with them
    Total Reply(0) Reply
  • Abir ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১:০৭ পিএম says : 0
    ডিমওয়ালা মাছ ধরা হলে এক সময় এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুপ্তি হয়ে যাবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Mizan ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১:০৭ পিএম says : 0
    Thanks a lot for this news
    Total Reply(0) Reply
  • সৌরভ ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ১:০৯ পিএম says : 0
    আমি মনে করি সরকারের অতিদ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
    Total Reply(0) Reply
  • Akas Khan ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ৪:৪৪ পিএম says : 0
    আমি মনে করি মাননীয় সরকারের উচিৎ স্থানীয় জেলেদের সাথে পরামর্শ করে অতি দ্রুত ইলিশ মাছ ধরার প্রতি নিষেধ্গার সময় পরিবর্তন করা
    Total Reply(0) Reply
  • saleh ৫ নভেম্বর, ২০১৬, ৭:৫৪ পিএম says : 0
    দায়িত্বশীল হয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেকতে হবে ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পদ্মা-যমুনায় ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ