Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার , ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

নাইজেরিয়া এখন ইরান-সউদী আরব ছায়াযুদ্ধের সর্বশেষ রণক্ষেত্র

প্রকাশের সময় : ৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : শিয়া-সুন্নি দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের পর উত্তর নাইজেরিয়া এখন ইরান ও সউদী আরবের মধ্যে ছায়াযুদ্ধের সর্বশেষ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। খবর এএফপি।
সউদী আরব সমর্থিত ইজলা আন্দোলনের সদস্যরা গত মাসে ইরানের শিয়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল ইসলামিক মুভমেন্ট ইন নাইজেরিয়ার (আইএমএন) উপর হামলা চালায়। আশুরা উপলক্ষে আইএমএন কর্তৃক নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের চারটি শহরে আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল এ হামলার লক্ষ্য। এর মধ্যে ইজলার শক্ত ঘাঁটি কাদুনা শহরের দাঙ্গা ছিল বেশি মারাত্মক। এতে কমপক্ষে দুইজন আইএমএন সমর্থক নিহত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মিডিয়া বলে ক্রুদ্ধ জনতা দুই দিনেরও বেশি সময় ধরে বাড়ি-ঘর ও ব্যবসাকেন্দ্রে লুটপাট চালায় ও অগ্নিসংযোগ করে। আর কোনো শিয়া চাই না বলে তারা স্লোগান দেয়।
রাজ্য সরকার কয়েকদিন আগে আইএএনকে অবৈধ সংগঠন বলে নিষিদ্ধ ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি ঘোষণা করায় নাইজেরিয়ার মুসলিম প্রধান উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে কাদুনায় ভীষণ গোষ্ঠীগত উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত ডিসেম্বরে জারিয়া শহরে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় সৈন্যরা ৩শ’রও বেশি আইএমএন সদস্যকে হত্যা করে। এ ঘটনায় সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার পর এ দাঙ্গা সংঘটিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সব সংঘর্ষের ঘটনা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ার মতো নাইজেরিয়াও এখন সউদি-ইরান ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
জারিয়ার আহমাদু বেলো বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবুবকর সাদিক মোহাম্মদ এ এফ পিকে বলেন, এটা সত্য যে সউদী আরব বিশে^র বহু এলাকায় শিয়াবিরোধী আন্দোলনে অর্থ প্রদান করছে। যদি শিয়াদের বিরুদ্ধে হামলা বৃদ্ধি পায় তাহলে ইরান তাদের সমর্থন দেবে এবং সউদী আরব শিয়াদের উপর হামলাকে সমর্থন করবে।
ইজালা নেতা আব্দুল্লাহ বালা লাউর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, নাইজেরিয়ার সংবিধান শুধু সুন্নি ইসলামকে স্বীকার করে বলে ঘোষণা করে তিনি ক্রোধ সৃষ্টিতে ইন্ধন জোগিয়েছেন।
রিয়াদ ও নাইজেরিয়া সরকারের সাথে তার গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রায়েছে। অন্য দিকে তাদের টিভি স্টেশন মানারা থেকে শিয়া বিরোধী কথাবার্তা প্রচার করা হয়।
জারিয়া হামলার পর সউদী আরব ও ইরান উভয়েই নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির সাথে যোগাযোগ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সংযত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন এবং ‘একটি গ্রুপ’ ইসলামী দেশগুলোর মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের বীজ বপন করছে। এ কথার মধ্য দিয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে সউদী আরবের প্রতি ইঙ্গিত করেন।
নাইজেরিয়ার মিডিয়া খবরে বলা হয় যে, সউদী বাদশাহ সালমান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করে আবুজায় আইএমএনের উপর দমন অভিযানকে সমর্থন করেছেন।
উল্লেখ্য, সুনিী জিহাদি গ্রুপ বোকো হারাম ২০০৯ সালে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করার সময় থেকে উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় কমপক্ষে ২০ হাজার লোককে হত্যা করেছে।
রিয়াদ উগ্র রক্ষণশীল সালাফি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নাইজেরিয়ার লড়াইর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থাকলেও আইএমএনের বিরুদ্ধে অভিযানে দ্রুত সমর্থন প্রদান করে বলে মোহাম্মদ জানান। তিনি বলেন, জারিয়া সংঘর্ষের প্রতি ইরান ও সউদী আরবের প্রতিক্রিয়া গোষ্ঠীগত অন্তর্দ্বন্দ্বকেই প্রকাশিত করে।
মার্চ মাসে সউদী ধর্মীয় নেতারা নাইজেরিয়ায় ইজালা আয়োজিত ‘পথভ্রান্ত ইসলামী মতাদর্শ’ বিষয়ক সম্মেলনে যোগদান করেন এবং তারপর থেকে সেখানে ইসলাম প্রচার করছেন।
মে মাসে নাইজেরিয়ায় ইরানের প্রতিনিধি আইএমএন নেতা ইবরাহিম জাকজাকিকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানান এবং তার আটককে অন্যায্য বলে আখ্যায়িত করায় কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। পরে তাকে তেহরানে ডেকে নেয়া হয়।
একজন ঊর্ধ্বতন নাইজেরীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, আইএমএনের ধর্মীয় বিষয় কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলার প্রতি তাদের অশ্রদ্ধা এক সমস্যা। অন্য দিকে তাদের প্রতি রাজ্য সরকারের অনুমোদনও নেই।
একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে ১৯৭৮ সালে আইএমএফ আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সুন্নি বিপ্লবী গ্রুপে রূপান্তরিত হয়। ইরানের সাথে জাকজাকির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইজালাসহ রক্ষণশীল ওয়াহাবিদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ১৯৯৬ সালে গ্রুপটি শিয়া ইসলামের গ্রুপে পরিণত হয়।
অন্যদিকে একজন সউদী প্রশিক্ষিত আলেম ১৯৭৮ সালে ইজালা প্রতিষ্ঠা করেন।
ইসলামের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ দাহিরু হামজা বলেন, তখন থেকেই ইজালা মিস্টিক সূফি ধারা বিরোধী অবস্থান নেয়, যাদের ধর্মাদর্শকে ইসলামবিরোধী বলে গণ্য করা হয়। তিনি বলেন, শিয়ারা অধিকতর সংগঠিত হয়ে ওঠায় এবং সালাফি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অধিক সংখ্যক মানুষকে তাদের মতাদর্শে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে সালাফি প্রভাবের প্রতি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করায় ইজালা তাদের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে।
ইজালা সউদী আরব ও ধনী মুসলমানদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পেয়েছে এবং মসজিদ ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। সংগঠনটির সদস্যদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে সরকারের মধ্যে মিত্র সংগ্রহকে উৎসাহিত করে।
গত ডিসেম্বর থেকে ইজালার আইএমএন ও শিয়াবিরোধী প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা জারিয়ায় সামরিক অভিযানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে এবং আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। লাউ উত্তেজনায় ইন্ধন সৃষ্টির অভিযোগ প্রত্যাখান করেন।
উত্তরাঞ্চলের কমপক্ষে পাঁচটি রাজ্য কাদুমার অনুকরণে আইএমএনের প্রকাশ্য মিছিল নিষিদ্ধ করেছে।
শিয়া সংবাদপত্র আহলুলবায়তের সম্পাদক মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, সাধারণ মানুষ আইএমএনের উপর নিষেধাজ্ঞাকে শিয়াদের উপর নিষেধাজ্ঞা বলে গণ্য করছে। এটা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে, কারণ ইজালা অনুসারীরা এ তথ্য ছড়াচ্ছে যে, সরকার শিয়াদের নিষিদ্ধ করেছে ও লোকে তা বিশ^াস করতে শুরু করেছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ