Inqilab Logo

বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

হুমকিতে শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা

প্রকাশের সময় : ৮ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

স্টাফ রিপোর্টার : হযরত শাহজালাল (রহঃ) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা হুমকির মুখে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলো যখন ওই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এর পরপরই গতকাল ঘটল সন্ত্রাসী হামলা। কথিত কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই সন্ত্রাসী হামলায় একজন আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো তিনজন। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর ওই স্থানটিতে চুরি নিয়ে এক যুবকের বেপরোয়া হামলা নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, সিভিল এভিয়েশন, এপিবিএন, আনসার, রেড লাইনসহ ২২টি সংস্থা বিমানবন্দরে কর্মরত। এছাড়া কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার রয়েছে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি। বিমানবন্দরের প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে দুতলায় ভিতরে প্রবেশ করার গেইট পর্যন্ত রয়েছে নিরাপত্তা তল্লাশি। তারপরেও এতসব নিরাপত্তা ভেদ করে একজন যুবক চুরি নিয়ে কিভাবে প্রবেশ করল এবং প্রবেশ পথেই কেন তাকে আটক করা হয়নি এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এ হামলার কারণে বহির্বিশ্বে শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কি বার্তা যাচ্ছে এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেছেন দেশের সুশীল সমাজের সচেতন মানুষ। এদিকে নিহত আনসার সদস্যের লাশ তারগ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়াতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। হাসপাতালে দফায় দফায় হামলাকারী শিহাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে হামলার কোনো ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি কোনো সংস্থাই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর গতকাল বলেছেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে কতটা দুর্বল তা গতকালের ওই সন্ত্রাসী হামলাই প্রমাণ করে। এ হামলায় বিদেশিদের কাছে কি বার্তা যাচ্ছে তাও ভেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, এটা কোনো ছোট ঘটনা নয়। নিরাপত্তার নামে বিমানবন্দরে যে সব উদ্যাগ নেয়া হয়েছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল এভিয়েশনের একজন কর্মকতা বলেন, নিরাপত্তার নামে এপিবিএন বিমানবন্দরের প্রবেশ পথে এতসব বাড়াবাড়ি করেন। কিন্তু তারা কাজের কাজ কিছুই করছেন না। ওই কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে যারাই দায়িত্ব পান তারাই শুধু ধান্ধা করেন। নিরাপত্তা জোরদার করার নামে বার বার সাধারণ মানুষকে প্রবেশ পথে হয়রানি করা হয়। তিনি আরো বলেন, এপিবিএন অনেক সময় বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। তাদের হয়রানির ভয়ে সাধারণ মানুষ ভীত থাকেন।
এদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে জানতে চাইলে প্রধান নিরাপত্ত কর্মকর্তা রাশেদা সুলতানা ক্ষোভের সাথে বলেন, সাংবাদিকদের যন্ত্রণায় আর বাঁচি না। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। তারপরেও নানা অজুহাত সৃষ্টি করেন সাংবাদিকরা। নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ওই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে উল্টো সংবাদ কর্মীদের দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শুধু আমার বিরুদ্ধে লিখে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হবে না। আমার বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির পাশে। তিনি আরো বলেন, আমার দায়িত্ব শুধু বিমানবন্দরের ভিতরে। বাইরে কি হলো তা আমার বিষয় নয়। বাইরের দায়িত্ব এপিবিএন-এর।
একটি সূত্র জানায়, বিমানবন্দর ও আশপাশ এলাকাসহ ভিতরে বাহিরে সকল স্থানের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিমানবন্দরের পরিচালক ও প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার। তাঁরা এর দায় এড়াতে পারেন না।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত সোহাগ মিয়ার লাশ গতকাল তার চাচা রমিজ উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তর করেন আনসার কর্তৃপক্ষ। গত রাতে সোহাগের লাশ কুষ্টিয়া তার গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে এবং দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হামলাকারী যুবক শিহাবকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবদ করছেন। তবে সে বিভ্রান্তমূলক তথ্য দিচ্ছে। হামলাকারী মাদক সেবন করেছিল কিনা তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে নিহত আনসার সদস্য সোহাগের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের জানান, ছুরিকাঘাতে বুকের বামপাশে গুরুতর জখম হয়। ওই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ সোহাগের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পুরশা গ্রামে।
হামলাকারী শিহাব বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলার এই ঘটনা সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে দেখছে। ঘটনার সঙ্গে নাশকতার কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কীনা সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার শিহাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে শিহাব অসংলগ্ন কথা বলছে যা কর্মকর্তাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানান, হামলাকারী যুবকের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সে নিজেকে কখনো শিহাব আবারো কখনো ডিজিটাল আকাশ বলে পরিচয় দিচ্ছে। সে জানিয়েছে, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার হাতে ছুরি ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘যা তোর ছুরিকে কেউ প্রতিহত করতে পারবে না।’ সেই ছুরি নিয়ে আনসার সদস্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলা করে সে।
বুকের বাম পাশে ছুরিকাঘাতেই সোহাগের মৃত্যু
নিহত আনসার সদস্য মো. সোহাগ মিয়া বুকের বাম পাশে ছুরিকাঘাতেই মৃত্যু হয়েছে। আনসার সদস্য সোহাগ মিয়ার (২৮) লাশ ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শফিউজ্জামান এ তথ্য জানান।
গতকাল সোমবার ময়নাতদন্তের শেষে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘ছুরিকাঘাতে বুকের বাম পাশে বড় গর্তে হয়ে যায়। আর ওই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর ১২টার দিকে আনসার কর্তৃপক্ষের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।’
এরপর নিহতের চাচা রমিজ উদ্দিনের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয় আনসার কর্তৃপক্ষ। পরে লাশ নিয়ে তিনি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পুরশা গ্রামের মান্দার আলীর ছেলে।
রবিবার সন্ধ্যায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন আনসার সদস্য সোহাগ মিয়া (২৮)। এছাড়া এ ঘটনায় আহত হন আরও তিনজন। আহতদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এক যুবক তিন নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। এয়ারপোর্টের ক্লিনারদের মতো হলুদ টি-শার্ট পরা থাকলেও তার কাছে ডিউটি পাস ছিল না। এজন্য গেটে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বাধা দেয়। তখন সে আনসার সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ সদস্য আশিক তাকে আটকাতে গেলে তাকেও আঘাত করে ওই যুবক।
তদন্ত কমিটি গঠন
এ ঘটনায় পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এপিবিএন-এর অতিরিক্ত ডিআইজি হাসিব আজিজকে কমিটির প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে আর্মড ব্যাটেলিয়ন (এপিবিএন)। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অ্যাডিশনাল এসপি সাইফুল ইসলাম শান্ত ও ইন্সপেক্টর মতিয়ার রহমান। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিমানবন্দরের পরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের এ তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটও গত রাত থেকেই তদন্তে নেমেছে। তবে হামলাকারী কি কারণে এ হামলা চালিয়েছে তা এখন পর্যন্ত জানাতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তারা বলছেন, হামলাকারী শিহাব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সে এক একক সময় একক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বিভ্রান্ত করার জন্যই সে সঠিক কোনো তথ্য দিচ্ছে না।
বিমানবন্দর থানায় মামলা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে আনসার সদস্য সোহাগ মিয়াকে (২৮) হত্যার ঘটনায় মামলা (মামলা নং-১০) দায়ের করেছেন আনসারের কোম্পানি কমান্ডার আশরাফুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে আনসারের ৩ নং প্লাটুনের কমান্ডার আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নূরে আজম মিয়া এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
ওসি মো. নুরে আজম মিয়া জানান, শিহাবকে আসামি করে এ মামলাটি দায়ের করেছেন আনসারের কোম্পানি কমান্ডার আশরাফুল ইসলাম। মামলায় একজনকেই আসামি করা হয়েছে। তিনি জানান, শিহাব পুলিশ প্রহরায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। মামলাটির ধারা দেয়া হয়েছে, দ-বিধি ৪৪৮/১৮৬/৩৩৩/৩৫৩/৩০২/৩০৭। মামলাটি তদন্ত করবেন বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এজাজ শফিক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: হুমকিতে শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ