Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০৯ ভাদ্র ১৪২৬, ২২ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

ইরাক যাওয়ার পথে আটক ৫ শনাক্ত ৪ দালাল

মানব পাচারের নতুন রুট শাহ আমানত!

প্রকাশের সময় : ১১ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

রফিকুল ইসলাম সেলিম : লিবিয়ার পর এবার অবৈধভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক যাওয়ার পথে ৫ বিদেশগামীকে আটক করেছে র‌্যাব। বুধবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের ৪ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানব পাচারকারীরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জাল কাগজপত্র দিয়ে তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে ঠেলে দিচ্ছিল।
এর একমাস আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত অপর দেশ লিবিয়া যাওয়ার পথে ৩৯ জনকে উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। পাচারের সময় তিন দফা লিবিয়াগামী ৫০ জন ও ইরাকগামী ৫ জনকে উদ্ধারের পর শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আকাশপথে মানবপাচারের রুট হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জানা যায়, ইমিগ্রেশন পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায় পাচারকারী চক্র আকাশপথে মানব পাচার করছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার হয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানব পাচার বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ঢাকার হযরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও জঙ্গি ইস্যুতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আর এই প্রেক্ষাপটে শাহ আমানতকে পাচারকারীরা নিরাপদ মনে করছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। গত দেড় বছরে পাচারের সময় লিবিয়াগামী অন্তত ৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর ২১ জনসহ গত ৬ মাসে অন্তত এক হাজারের বেশি যুবক এই বিমানবন্দর হয়ে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে যাওয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে। তাছাড়া প্রতিদিনই অবৈধভাবে লিবিয়াগামী কোনো না কোনো যাত্রীকে আটকে দেয়া হচ্ছে বলেও জানান ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তারা। জানা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক ও লিবিয়ায় নেয়ার পর মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা এসব যুবকদের সাগরপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। দুর্গম পথে অবৈধভাবে পাচারের মাধ্যমে চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরতে যাওয়া এসব যুবকদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ভূ-মধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়াতে ৩শ’ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয় যাদের মধ্যে ৩৭ জন বাংলাদেশী। এসব হতভাগ্য যুবকরা আকাশপথে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
র‌্যাবের মানবপাচার বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করছে র‌্যাব। তার ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৭, চট্টগ্রাম গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারে শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাতারগামী এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে কতিপয় লোক অবৈধভাবে কাতার হয়ে ইরাক যাচ্ছে। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার একটি বিশেষ অভিযানিক দল বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে ইরাক গমনের প্রাক্কালে ৫ জনকে আটক করে।
তারা হলেনÑ মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর থানার আনন্দপুর গ্রামের রহমান মোল্লার পুত্র মোঃ তুহিন ইসলাম (২৬), নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানার গোলাপপুর বাজারের সামছুদ্দিন আহমেদের পুত্র সজিব আহমেদ (৩০), মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর থানার আনন্দপুর গ্রামের তাফিজ ঢালীর পুত্র মোঃ রাসেল ঢালী (২৭), একই জেলার আনন্দপুর গ্রামের তাফিজ তাতীর পুত্র মোহাম্মদ সোহাগ (৩২) ও একই জেলার আনন্দপুর গ্রামের শহিদুল্লাহ বেপারীর পুত্র মোঃ রিপন (২৩)।
এ সময় তাদের কাছ থেকে পাসপোর্টসহ কাতারের ভিসা এবং তাদের প্রত্যেকের ব্যাগ তল্লাশি করে ইরাকের ৫টি ভিসার কাগজ পাওয়া যায়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাদেরকে বিভিন্ন দালালদের মাধ্যমে ইরাক নেয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকার ফকিরাপুলস্থ ছায়ানীড় হোটেলে উঠানো হয়। পরবর্তীতে দালাল রবিউল (৩২), ঢাকা এসে এদেরকে ভিসা এবং পাসপোর্ট দিয়ে যায়। বিমানের টিকিট পর্যালোচনা করে দেখা যায় এদের যাতায়াতের রুট ছিল চট্টগ্রাম থেকে শারহাজ হয়ে কাতার সেখান থেকে ইরাক।
র‌্যাব জানায়, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দালালের মাধ্যমে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা চুক্তির মাধ্যমে ইরাক পাঠানোর জন্য লোকজনদের প্রলুব্ধ করে। এসব চাকরি প্রার্থীরা ইরাক পৌঁছানোর পরে টাকা পরিশোধ করবে বলে চুক্তি হয়। তারা কোন অগ্রিম টাকা দেয়নি। ইরাক পৌছানোর পরে কিছু কিছু চাকরি প্রার্থী নিজ উদ্যোগে আবার কেউ দালালের মাধ্যমে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে যাবে বলে জানা যায়।
আটককৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ৪ দালালকে শনাক্ত করেছে র‌্যাব। তারা হলোÑ মুন্সিগঞ্জ জেলার মোঃ সবুজ (৪৫) ও মোঃ সজিব আহমেদ (২৫), ঢাকার মোঃ রবিউল (৩২) ও মোঃ জসিম (৩২)। র‌্যাব জানায়, উদ্ধারকৃতদের ভিসা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রত্যেকের কাতারের ভিসা ইস্যুর তারিখ একই দিন এবং মেয়াদও ৬০ দিন করে। সবগুলো ভিসাই বিজনেস ভিসা এবং শর্ট ট্রাম ভিজিট ভিসা। কিন্তু বিজনেস ভিসার অনুকূলে কোন স্পন্সরশিপ কিংবা বিজনেস সংক্রান্ত কোন ডকুমেন্ট নেই। পার্সেনাল ভিসা হওয়া সত্ত্বেও ৩ জনের ভিসার নম্বর একই। ইরাকের ভিসাতে দেখা যায়, সবগুলো ভিসার নাম্বার ইস্যুর তারিখ এবং মেয়াদ একই।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এসব চাকরি প্রার্থীদের বিমানে উঠার পর বাংলাদেশী কাজগজপত্র ছিড়ে ফেলতে নির্দেশনা দেয়া হয় এবং কাতারে পৌঁছানোর পর সিন্ডিকেটের অন্য দালালদের মাধ্যমে কাতার থেকে বিমানযোগে তাদেরকে ইরাক পাঠানো হবে। পরবর্তীতে ইরাকে নিয়ে তাদেরকে নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়ে থাকে। র‌্যাব জানায়, তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সনাক্ত হওয়া দালালদের ধরতে অভিযান চলছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গত দেড় বছরে শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে সন্দেহভাজন তিন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। সন্ধান মিলেছে এক দালাল চক্রের, যেখানে বিদেশিরাও জড়িত। গত বছর ১২ মে শাহ আমানত থেকে ১১ জনকে উদ্ধার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ফ্লাই দুবাইয়ের একটি বিমানে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল তাদের। ওই ঘটনার আগের দিন নগরীর বড়পোল এলাকা থেকে তিন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৩টি পাসপোর্ট। সেগুলোর মধ্যে ১৭টিতে লিবিয়ার এবং একটিতে মিশরের ভিসা ছিল। গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি কর্মকর্তারা সে সময় নিশ্চিত হন ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করে তারা মানব পাচার করে আসছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার আগের এক মাসে প্রায় পাঁচশ জনকে তারা লিবিয়ায় পাঠায়।
জানা যায়, ইউরোপে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের অন্যতম রুট হয়ে উঠেছে লিবিয়া থেকে বড় নৌযানে ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির বিভিন্ন দ্বীপে পৌঁছানো। এভাবে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকা ডুবে অনেকের মৃত্যুর খবর আসছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, ধরাও পড়ছেন অনেকে। সম্প্রতি লিবিয়ায় ভূ-মধ্যসাগর থেকে ৩শ’ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৭ জন বাংলাদেশী বলে জানা যায়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ