Inqilab Logo

রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৫ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুর্নীতি মামলার অর্ধশত আসামি

শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ জামিন না নিলেও গ্রেফতার নেই তদন্তে প্রভাব বিস্তার-তদবির

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ৩০ মার্চ, ২০২২, ১২:০৪ এএম

দুর্নীতি মামলার অর্ধশত আসামি। বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিচ্ছেন না। দুদক তাদের গ্রেফতারও করছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা ঠুঁকে দিয়েই সারছে তাদের দায়িত্ব। ফলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুর্নীতি মামলার অন্তত অর্ধশত আসামি। কারাগারের বাইরে থেকে তারা তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছেন বলে জানা গেছে। করছেন উচ্চ পর্যায়ের তদবিরও। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রাহকের ৭০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে গত ৮ মার্চ পৃথক দু’টি মামলা করে দুদক। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া আরো অন্তত ১৩০০ কোটি টাকার হদিস নেই। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ অর্থ হাতিয়ে নেন। এতে আরো বলা হয়, পরস্পর যোগসাজশে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি: ও (এফআইএলআইসিএল)র ১৫৮তম পরিষদ সভার কার্য বিবরণীর ভুয়া সার-সংক্ষেপ সৃজন করে এ সার-সংক্ষেপের বরাত দিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লি:’র ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার, মতিঝিলে ‘এফআইএলআইসিএল’র নামে রক্ষিত ২২টি এমটিডিআর জামানত রেখে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পিএফআই প্রপার্টিজ লি: কে ৪০ কোটি টাকার ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৭০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩৯ টাকা আত্মসাৎ করেন। যা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ১০৯ ও ৪০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মামলাটির আসামির তালিকায় রযেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ভেঙে দেয়া পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, তৎকালীন পরিচালক কে এম খালেদ, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ, পরিচালক এম.এ. খালেক, পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, পরিচালক ফরিদউদ্দিন এফসিএ, পরিচালক আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আব্দুল আজিজ এবং বরখাস্তকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্যাহ। মামলাটি তদন্ত করছেন সংস্থার সহকারি পরিচালক শারিকা ইসলাম এবং সহকারি পরিচালক বায়েজিদুর রহমান। তদন্ত তত্ত্বাবধানে রয়েছেন পরিচালক বেনজির আহমেদ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। অন্যদিকে দুদকের প্রসিকিউশন শাখা জানায়, তিন সপ্তাহ আগে মামলাটি রুজু হলেও মামলা দু’টিতে এখন পর্যন্ত কোনো আসামি জামিনও নেননি। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)র একটি সূত্র জানিয়েছেন, একজন আসামি অন্য একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য আসামিরা নিজ বাসায় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।
দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্র জানায়, শত কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে গত ৭ মার্চ কাস্টমসের সাত কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে টায়ার, বোতাম ও সেফটিপিন আনার ঘোষণা দিয়ে সিগারেট আমদানি করে শত কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের ১৪ মে থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০টি চালানের মাধ্যমে আসামিরা ১০৫ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন। এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী প্রোগ্রামার কামরুল হক, শুল্কায়ন গ্রুপের সাবেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (বর্তমানে ঢাকার কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা) সাইফুন্নাহার জনি, সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা ও বর্তমানে রাজশাহীর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট মো. হাবিবুল ইসলাম, কাস্টমসের এআইআর শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা সুলতান আহম্মদ, কম্পিউটার অপারেটর ফিরোজ আহমেদ, উচ্চমান সহকারী মো. আবদুল্লাহ আল মাছুম ও অফিস সহায়ক মো. সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার কোতোয়ালি থানাধীন জারা এন্টারপ্রাইজের মালিক মাহবুবুর রহমান, সিফাত ট্রেডিংয়ের মালিক মো. সালাউদ্দিন টিটো, মুভিং ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার মো. মিজানুর রহমান চাকলাদার ওরফে দীপু চাকলাদার, মো. মফিজুল ইসলাম, আবদুল হান্নান দেয়ান এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স চাকলাদার সার্ভিসের মো. হাবিবুর রহমান (অপু) চাকলাদার। এ মামলার আসামি দীপু চাকলাদার ইতিপূর্বে দায়েরকৃত আরেকটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। মামলায় অপু চালকাদার পলাতক রয়েছেন। কিন্তু সাইফুন্নাহার জনি, হাবিবুর রহমান, মাহবুবুর রহমানসহ বাকিরা এখন পর্যন্ত জামিন নেননি। দুদক তাদের গ্রেফতার করেছে বলেও জানা যায় নি। দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম মামলাটি তদন্ত করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রটি আরো জানায়, ১ কোটি ৪২ লাখ ২২ হাজার ৭৪৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক আইন-২০০৪ এর ২৬(২),২৭ (১) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারাসহ দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় একটি মামলা হয় গত ২৩ মার্চ। কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুল মান্নান মজুমদার এবং তার স্ত্রী তাসনুভা চৌধুরী মামলাটির আসামি। মামলা তদন্ত করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক এমরান হোসেন। দুই আসামিই এখন পর্যন্ত জামিন নেননি বলে জানা গেছে।
৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং পাচারের মামলায় পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের ২২ মামলায় ৮৩ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ৫২ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পি কে হালদারের সহযোগী শঙ্খ বেপারি, রাশেদুল হক, অবান্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাইসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয় গতবছর। বাকিদের অধিকাংশই এখন অবধি আদালত থেকে জামিন নেননি। আসামিদের গ্রেফতারে দুদকেরও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, গত এক বছরে বৃহৎ অঙ্কের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা সম্বলিত অন্তত ২৬টি মামলা হয়েছে। শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার এই মামলার আসামিরা প্রভাবশালী। সরকারের মধ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইশারায় তদন্ত কর্মকর্তারা আসামিদের গ্রেফতার করতে পারছেন না। আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে আসামিদের কারো কারো ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বেশ কয়েকটি তদন্ত কর্মকর্তা এখন তোপের মুখেও রয়েছেন। প্রভাবশালী আসামিরা তদন্ত কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি করলেও চাকরির ওপর আঘাত আসতে পারে-এই আশঙ্কায় গ্রেফতারে আগ্রহী হচ্ছেন না। এর ফলে একদিকে যেমন দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে দুদকের আপসকামী মনোভাবের প্রকাশ ঘটছে। তেমনি কারাগারের বাইরে থাকা আসামিরা বিভিন্ন পর্যায় থেকে তদবির করছেন। তদন্তকে প্রভাবিত করছেন।
তবে এ বিষয়ে ‘ঢালাও অভিযোগ’ অস্বীকার করে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা স্বাধীন। এই ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। তদন্ত কর্মকর্তারা যদি মনে করেন তদন্তের স্বার্থে আসামি গ্রেফতারের প্রয়োজন; সেটি তারা করতে পারেন। এ জন্য কমিশনের দ্বিতীয়বার অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। আসামি গ্রেফতার না করার বিষয়ে কমিশনের কোনো ‘গ্রীণ সিগন্যাল’ নেই। কারণ ইতোমধ্যেই বেশ কিছু আসামিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুর্নীতি মামলা

২৭ জুন, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ