Inqilab Logo

শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ০১ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

সব দল অংশ না নিলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না : সিইসি

দিনের ভোট রাতে হয়েছে জেনেশুনেও বলতে ভয় পাই : এটিএন বাংলার নির্বাহী সম্পাদক

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৯ এপ্রিল, ২০২২, ১২:০১ এএম

রাতে ভোটের বাক্স ব্যালট পেপার দিয়ে ভরে রেখে পরদিন ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলোই ঘটেছে বাংলাদেশে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম, সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পর্কে চরম আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এই আস্থার সঙ্কট দূর করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। একইসঙ্গে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নিজেদের ক্ষমতা যথাযথ প্রয়োগ করার কথাও বলেন।
নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে গতকাল আয়োজিত এক সংলাপে এ পরামর্শ দেন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এটিএন বাংলার নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন বলেন, বাংলাদেশের কোনো নির্বাচন কমিশনই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সকলেই বলেছেন, যারা পরাজিত হোন তারা নির্বাচনের সমালোচনা করেন। কিন্তু আপনারা অনেকেই বলেছেন রাতে তো নির্বাচন হয় না। আসলে রাতে ভোটের বাক্সভরে রাখা হয়েছিল ব্যালট পেপার দিয়ে। ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে পরের দিন। এগুলোই ঘটেছে বাংলাদেশে। আমরা এই কথাগুলো জেনেশুনেও বলি না, কারণ আমরা বলতে ভয় পাই, লিখতে ভয় পাই। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা কতখানি তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এখন আমার স্বাধীনতা আর নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা যদি এক রকম হয় তাহলে আমাদেরকে এখানে ডাকার কোনো মানে হয় না। আমি মনে করি নির্বাচন কমিশন আমার চাইতে স্বাধীন। নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কথা বলতে চায়, স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায় তাহলে তাদের পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ যথেষ্ট। নির্বাচন কমিশনের মেরুদন্ড শক্ত থাকলে সরকারের খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। আপনারা চাইলেই সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবেন। বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের গণমাধ্যম আপনাদেরকে সহায়তা করবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমÑ এর প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, সবাই নির্বাচনে আসবে, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে। আরেকটি কথা নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এটিই আপনাদের পেশাগত জীবনের শেষ অ্যাসাইনমেন্টে। এরপর হয়তো আর কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ পাবেন না। এটি মাথায় রেখে কাজ করলে ভালো কাজ করতে পারবেন।
বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ মাসুদ কামাল বলেন, মূল সঙ্কটটি কোথায় তা ভালো বোঝেন বলেই আপনারা দায়িত্বটা নিয়েছেন। না বুঝলে হয়তো আপনারা দায়িত্ব নিতেন না। আরও কিছু বোঝার জন্য এ সংলাপ করছেন। নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হল আস্থার সঙ্কট। মানুষ নির্বাচন কমিশনের কথাবার্তায় বিশ্বাস করে না। গত দু’টি নির্বাচনে এ বিশ্বাস শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। যদি প্রত্যেক নাগরিককে আপনি ভোট দেওয়া নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে বুঝবো আপনি সফল। এ বিষয়টি আপনি অর্জন করতে পারবেন কিনা তাই মুখ্য বিষয়।
অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, একটা সুন্দর গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবাইকে চেষ্টা করতে হবে। আমরা অর্থহীন সংলাপ করছি না। সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। গণতন্ত্র বিকশিত হবে না।
রাজধানীর আগারগাওঁয়ে নির্বাচন ভবনে দেশের সিনিয়র ইলেকট্রনিক সাংবাদিকদের সঙ্গে ইসির চতুর্থ ধাপের সংলাপ হয়। এর আগে গত ১৩ মার্চ শিক্ষক সমাজ এবং ২২ মার্চ সুশীল সমাজ ও ৬ এপ্রিল প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনধাপে সংলাপে বসে ইসি। গতকাল চতুর্থ ধাপের সংলাপে ৩৯ জন সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন ২৬ জন।
২০১৭ সালে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনও দায়িত্ব নেওয়ার পর সমাজের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সংলাপে বসেছিলেন। ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসার মধ্য দিয়ে ওই সংলাপ শুরু হয়। পরবর্তীতে নুরুল হুদা কমিশন ৪০টি রাজনৈতিক দল, নারী নেতৃত্ব, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সংলাপে বসেছিল। সবার সাথে সংলাপ করে নুরুল হুদা কমিশন যে নির্বাচন উপহার দিয়েছেন তাতে বর্তমান ইসির সংলাপ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সমাপনী বক্তব্যে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না, সেটা ফোর্স করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমাদের দায়িত্ব থাকবে সবাইকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আহ্বান করা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, সংলাপে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে এ নিয়ে কয়েকটি মিটিং করেছি। যেহেতু বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ইভিএমের যে সুবিধাটা সেখানে পেশিশক্তির ব্যবহার হ্রাস করতে পারে, যেখানে সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স পূরণ করা যায় না। কাজেই ইভিএমের ভালো দিক আছে। আমরা ইভিএম নিয়ে স্টাডি করছি, যেটা জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছেন। নির্বাচনে কেউ আসল কী আসল না এটা আমাদের দায়িত্ব নয়। কেউ কেউ বলেছেনÑ দলগুলো যদি তাদের লোকবল দিয়েই ভারসাম্য করতে পারে, নির্বাচনে যদি দুপক্ষ থাকে, তবে দুপক্ষকে খেলতে হবে, তাহলে নির্বাচনটা ওইদিক থেকে সহজ হয়।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রের ভেতরে ক্যামেরা ও বাইরের মনিটরে দেখা যায়Ñ এগুলো নিয়ে কথা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিচরণ যদি থাকে, তারাও রিপোর্ট করতে পারবেন। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য এসব বিষয়ের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের সাধারণভাবে ওপেন হতে হবে। তথ্য দিতে হবে বলে মনে করি।
সিইসি বলেন, আমাদের সৎভাবে দায়িত্ব পালনের স্পৃহা ও চেষ্টা আছে, থাকবে। ব্যাপক অনিয়মের তথ্য আমাদের কাছে আসলে সাহস নয়, আমাদের দায়িত্ব হয়ে যাবে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অনেক বিধান আমাদের অনুকূলে থাকলেও তা প্রয়োগের হার বাড়াতে হবে। নির্বাচনকে হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখতে যা যা করতে হয়, তা করতে হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে যেন ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা। অনেক সময় কারচুপির হয়, সেটা রোধ করতে হবে।
সংলাপে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন, বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ আব্দুল হাই সিদ্দিক, এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম, এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন, চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিক রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল, সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ, নাগরিক টিভির হেড অব নিউজ দীপ আজাদ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, একুশে টিভির হেড অব নিউজ রাশেদ চৌধুরী, মাইটিভির হেড অব নিউজ শেখ নাজমুল হক সৈকত, সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা দানিশ, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির চিফ নিউজ এডিটর আশিস সৈকত, মাছরাঙা টিভির হেড অব নিউজ রেজোয়ানুল হক রাজা, একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন, দেশ টিভির চিফ নিউজ এডিটর বোরহানুল হক সম্রাট, নিউজ ২৪’র এক্সিকিউটিভ এডিটর রাহুল রাহা, ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউনের বার্তা প্রধান মাসুদ কামাল, গ্লোবাল টিভির এডিটর সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, জাগো নিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, এবং স্পাইস টিভির এডিটরিয়াল হেড তুষার আব্দুল্লাহ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সিইসি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ