Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

বারান্দা-গাছতলায় চলছে চিকিৎসা

ফরিদপুরে ও বরগুনায় ডায়রিয়ার প্রকোপ

আনোয়ার জাহিদ, ফরিদপুর থেকে : | প্রকাশের সময় : ২৫ এপ্রিল, ২০২২, ১২:০১ এএম

ফরিদপুরে গত কয়েক দিন ধরে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সদর হাসপাতালে তিল রাখার জায়গা নাই। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালে বেড না থাকার কারণে শিশু-কিশোর বৃদ্ব আবার বনিতা, নারী-পুরুষ গাছতলায় শুয়ে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪২ জন রোগী। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের বারান্দা ও গাছ তলায় থাকতে হচ্ছে।

গতকাল রোববার ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রোগী ও স্বজনদের চাপে গিজ গিজ করছে ওয়ার্ড। ওয়ার্ডে শয্যা মাত্র ১০টি। কিন্তু রোগী ভর্তি রয়েছেন ১০০ জন। অনেক রোগীকে বারান্দায় এবং কাউকে কাউকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ডায়রিয়া ওয়ার্ড ছাড়াও আশেপাশের সকল ওয়ার্ডে এখন ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হচ্ছে রোগী। হাসপাতালটির কোথাও সিট না পেয়ে অনেকেই বারান্দায় ও গাছতলায় চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। অপরদিকে, মাত্র ২৩ বেডের ডায়রিয়া ওয়ার্ডটিতে রোগীর পরিমান এতটাই বেশি যে, নারীর পাশে পুরুষ, পুরুষের পাশে নারী, শিশু বৃদ্ব এক বেডে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিছানার চাদর, বেড কাভার স্যালাইন ঝুলানো লোহার ষ্টান্ড না থাকার কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে ফ্লোরে শোয়ায়ে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্যালাইন হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।


চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা গণমাধ্যমকে বলছেন, ফরিদপুরে প্রচন্ড গরমে হঠাৎ করে বেড়েছে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। জেনারেল হাসপাতালের ১০ শয্যার বিপরীতে ১০০ জন রোগীকে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা। সিনিয়র/জুনিয়র নার্সরা চিকিৎসা সেবা দিতে হিমসিম খাচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ জন করে নতুন নতুন আক্রান্ত হচ্ছে। শিশু-কিশোর বৃদ্ব আবাল বনিতা এসে ভর্তি হচ্ছে।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মার্জিয়া খানম গণমাধ্যমকে বলেন, এইরকম অবস্থার মধ্যে পড়ছি ১৯৮৪ সালে। তখন জেলার পানির ট্যাংকিতে মানুষের মরা পঁচা লাশ পাওয়ায় এই অবস্থা হয়েছিল। বিগত প্রায় ৩৮ বছর পর ২০২২ সালের এই এপ্রিল মাসে, ডায়রিয়া আবার মহামারি আকার ধারণ করছে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতে রোজাদার নার্সরা কোনো অনিহা প্রকাশ করছেন না। উপরন্ত আন্তরিকতার সহিত মানবিক হয়ে ও দরদ দিয়ে সকলেই কাজ করছেন। রোগীরাও নার্সদের সেবায় সবাই খুব খুশি। কিন্ত অভাব শুধু বেডের। ঔষধ ও স্যালাইনের কোনো অভাব নাই। ঔষধ পাননি সেবা পাননি এ রকম কেউ কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। হাসপাতালের পাশে অলস জায়গা পড়ে থাকলেও হাসপাতাল সৃষ্টির পর ১০ বেডের ওয়ার্ড থেকে অতিরিক্ত ১৩টি বেড বাড়ালেও কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি।

জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স গোলাপি বেগম জানান, আমরা এখন সাপ্তাহিক ছুটি না নিয়েও দিন-রাত রোগীর সেবা করে যাচ্ছি। রোগী আসছে প্রচুর, জায়গা দিতে পারছি না। নিরুপায় হয়ে অনেকেই ফ্লোর, বারান্দা আবার অনেকেই গাছতলায় সেবা নিচ্ছেন।

জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. গণেশ কুমার আগরওয়ালা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৪২ জন রোগী। আর গত এক সপ্তাহে এ রোগের ভর্তি রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ৬৪৩ জনের। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১০০ জন রোগী। তবে ভর্তি রোগী বেশি দিন থাকছে না, ভাল হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন বলে জানান এ চিকিৎসক।

ফরিদপুরের সির্ভিল সার্জন ডা. মো. ছিদ্দিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগী ভর্তি না নেওয়ায় চাপ বেড়েছে জেনারেল হাসপাতালে। এই হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে বেড সংখ্যা মাত্র ১০টি। বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০০। এই বিপুল সংখ্যাক রোগী সেবা দিতে নার্স ও চিকিৎসকদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। তবে হাসপাতালে সকল রোগীদের দাবি ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পাশে অলস জায়গায় দ্রুত একটি ভবন নির্মাণ করে রোগীদের ভোগান্তি কমাতে বিনয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট জোর দাবি জানিয়েছে।

বরগুনা জেলা সংবাদদাতা : বরগুনার আমতলীতে প্রতিদিন বেড়েই চলছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ৪৮ ঘণ্টায় ৬০ জন রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডায়রিয়া ওয়ার্ডের চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্যরা। বেডে ঠাঁই না হওয়ায় আক্রান্ত রোগীরা নিরুপায় হয়ে বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে দুর্ভোগ বাড়ছে রোগীদের।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার সকাল থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় আমতলী হাসপাতালে ৬০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। ৬ বেডের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে বেড সংখ্যা সংকুলান না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে রোগীরা বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

গতকাল রোববার সকালে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বেডের অভাবে অনেক রোগী হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসময় হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের ফুলভানু বেগম নামে এক রোগী বলেন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে জায়গার অভাবে এখন বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখানে ফ্যান নেই গরমে গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে।

গুলিশাখালী ইউনিয়নের খেকুয়ানি গ্রামের আলতাফ গাজী নামে আরেক রোগী বলেন, বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এখান থেকে বাথ রুমে যেতে কষ্ট হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তালুকদার বাজারের জাহানারা বেগম বলেন, খালি পানির মতো পড়ে। হাসপাতালে আইছি। হেও আবার রুম পাই নাই।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. সুমন খন্দকার বলেন, শুকনো মৌসুমের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এবং বিশুদ্ধ পানি পানের অভাবে এবং বৃষ্টি না হওয়ায় পানিতে লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন, প্রতিদিন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত শুরু হলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী কমে যাবে। তিনি আরো বলেন, চিকিৎসার সেবায় কোনো ঘাটতি নেই। হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুদ রয়েছে ও চিকিৎসক ও নার্সরা সবাই আন্তরিকভাবে চিকিসা দিচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ফরিদপুরে ও বরগুনায় ডায়রিয়ার প্রকোপ
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ