Inqilab Logo

শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৮ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

নজরদারিতে ঢাবি-বুয়েট

প্রকাশের সময় : ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৫৪ পিএম, ১৫ নভেম্বর, ২০১৬

ফারুক হোসাইন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৩ পৃষ্ঠার চিঠিতে ওই সব প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে লিখিত আকারে জানানোর কথা বলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বাড়াতে নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিতে বলা হয়, দেশের নামী-দামি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও কলেজ, মসজিদ ও মাদরাসার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদ। একশ্রেণীর উগ্রবাদী ছাত্র-শিক্ষক টার্গেট করে মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে নানাভাবেই নতুনদের জঙ্গি কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ ও অন্তর্ভুক্ত করছে। আর এই কার্যক্রম সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও মাদরাসায়। বাদ যায়নি দেশসেরা দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বুয়েটের ৭২ শতাংশ শিক্ষকই জামায়াত ও হিযবুত তাহরীরের সদস্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কয়েকটিকে মনে করা হচ্ছে জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর হিসেবে। ‘জঙ্গি মতাদর্শে র‌্যাডিক্যালাইজেশন ঘটছে’Ñ এমন মসজিদ মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর নজরদারি এবং ব্যবস্থা গ্রহণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এই প্রতিবেদন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা জমা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও। আর ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৩ পৃষ্ঠার চিঠিতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে লিখিত আকারে জানানোর কথা বলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বাড়াতে নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনার বিষয়ে বলছেন, জঙ্গিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করে মাঠে নেমেছে। তারা কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে জঙ্গিবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য চিহ্নিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি করা ছাড়াও দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা চালানোসহ নানা পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (সমন্বয়ক) মো: সারওয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানা যায়, চার ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি ধরে) নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দু’টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, নয়টি মাদরাসা ও পাঁচটি মসজিদ।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে দেশের শীর্ষ দুই বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাণিজ্য অনুষদ)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ, ইস্ট-ওয়েস্ট, দারুল ইহসান, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজি মাধ্যমের স্কলাস্টিকা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, আগা খান স্কুল (উত্তরা) ও লেকহেড গ্রামার স্কুল (ধানমন্ডি, বনানী ও মোহাম্মদপুর)। এছাড়া তা’মীরুল মিল্লাত (মাদরাসা মীর হাজিরবাগ, যাত্রাবাড়ী), একই মাদরাসার উত্তরা শাখা, দারুল উলুম রহমানিয়া মাদরাসা (নিউমার্কেট), জামিয়া নূরিয়া মাদরাসা (ডেমরা), লালবাগ জামিয়া কোরানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা (লালবাগ, ঢাকা), বসুন্ধরা মাদরাসা (বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা), মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদরাসা (বসিলা রোড, মোহাম্মদপুর), কামরাঙ্গীরচর মাদরাসা (ঢাকা), জামেয়া মোহাম্মদিয়া মাদরাসা (সাড়ে এগারো, মিরপুর, ঢাকা), মসজিদুল মোমেন মসজিদ (মিরপুর-১০), আল-আমিন মসজিদ (মোহাম্মদপুর), আহলে হাদিস মসজিদ (কামারপাড়া, আব্দুল্লাহপুর), বসুন্ধরা মসজিদ (বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা), মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স (বসিলা রোড, মোহাম্মদপুর)।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনের ইতঃপূর্বে সংঘটিত নাশকতার ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্ধশিক্ষিত/অশিক্ষিত/মাদরাসা পড়–য়া যুবকদের অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। তবে সম্প্রতি কয়েকটি জঙ্গি তৎপরতায় নামী-দামি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করা উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত যুবকদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একশ্রেণীর উগ্রবাদী ছাত্র-শিক্ষক টার্গেট করে ছাত্রদের বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট, ভিডিও ফুটেজ, জিহাদী বই, জিহাদী বক্তব্য সম্বলিত অডিওর মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করছে। রাজধানীর ২১টি প্রতিষ্ঠানের উগ্রবাদী কর্মকা-ে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে।
প্রতিবেদনে করণীয় ঠিক করতে কয়েক দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসা ও মসজিদে নিরীক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকদের জঙ্গিবিরোধী আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকলকে সচেতন করা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র-ছাত্রী যৌক্তিক কারণ ছাড়া ১৫ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে তাদের সম্পর্কে নিকটবর্তী থানা ও গোয়েন্দা সংস্থার নিকট নিয়মিত রিপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা। উঠতি বয়সী যুবক নিখোঁজ সংক্রান্তে থানায় জিডি হলে তা অনুসন্ধানপূর্বক নিখোঁজের ছবি, মোবাইল নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্যসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে অবহিত করা এবং ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়ে ভাড়া প্রদানে বাড়ির মালিকদের সতর্ক করা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমরা এ বিষয়ে এখনো কোনো চিঠি বা কোনো তথ্য পাইনি। চিঠি পেলেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন বলে তিনি জানান।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, এখনো এ বিষয়ে কোনো চিঠি পাইনি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, কোন ছাত্র বা শিক্ষক জড়িত সে বিষয়ে যদি আমরা কোনো তথ্য পাই তাহলে সাথে সাথেই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা থাকে চার-পাঁচ ঘণ্টা। বাকি সময়টা কাটায় বাড়িতে বা বাইরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। এ বিষয়ে পারিবারিক সচেতনতা জরুরি। ছেলেমেয়েরা কোথায় কখন কী করছে না করছে তার খবর রাখতে হবে। পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলে তখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ১৫ দিনের বেশি কোনো ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে তা জানাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারে বলা হয়েছে, জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্ট যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে বুয়েটকে নিয়ে। তদন্তে জানা গেছে, তাদের ৭২ শতাংশ শিক্ষকই জামায়াত বা হিযবুত তাহরীরের সদস্য। অন্যদিকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে জঙ্গিদের আঁতুড়ঘর বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে গত জুন মাসেই গুলশান ও শোলাকিয়াতে হামলার পর ১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৯টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি জানান, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজি মাধ্যমের ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছে সরকার। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একাধিক প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছে। নজরদারিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, মানারাত, নর্দানের ঢাকা ও খুলনা ক্যাম্পাস, এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, বিজিসি ট্রাস্ট, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব চিটাগাং, দারুল ইহসান ও বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

Show all comments
  • তাহমিনা ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১১:১৭ এএম says : 0
    বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।
    Total Reply(0) Reply
  • সাব্বির ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১১:১৯ এএম says : 0
    পারিবারিক সচেতনতা জরুরি।
    Total Reply(0) Reply
  • Abdul Hannan ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:৫২ পিএম says : 0
    ar sob dos khali madrasar !
    Total Reply(0) Reply
  • বিপ্লব ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:৫৩ পিএম says : 0
    শিক্ষার সকল স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাড়াতে হবে। কারণ কোন ধর্মীই অন্যায়কে সমার্থন করে না।
    Total Reply(0) Reply
  • শামীম ১৬ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:৫৪ পিএম says : 0
    এটাই এখন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নজরদারিতে ঢাবি-বুয়েট

১৬ নভেম্বর, ২০১৬
আরও পড়ুন