Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৯ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

রায়পুরার নিলক্ষারচরের বিদ্রোহী ও ক্ষতিগ্রস্ত আ’লীগ নেতাদের প্রতি রাজুর হুঁশিয়ারি

১৪ থেকে ৬৫ বছরের লোকদের গ্রেফতারের নির্দেশ

প্রকাশের সময় : ১৭ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সরকার আদম আলী, নরসিংদী থেকে
গত সোমবার রায়পুরার নিলক্ষারচরে আওয়ামী লীগের দুই লাঠিয়াল বাহিনী ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত খোকন, মানিক, মোমেন ও শাহজাহানের লাশ গত মঙ্গলবার রাতে গ্রামের গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গ থেকে ৪টি লাশ গ্রামে নিয়ে যাবার পর গ্রামের স্বল্পসংখ্যক মানুষ তাদের দাফনক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পুলিশের ভয়ে নিহতদের আত্মীয়-স্বজন অনেকেই দাফনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
সংঘটিত গ্রাম্য দাঙ্গা, পুলিশের গুলি ও টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ৪ আওয়ামী লীগ কর্মীসহ শতাধিক হতাহতের ঘটনা ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের তৃতীয় দিনে গতকাল বুধবার বিধ্বস্ত এলাকা সফর করেছেন রায়পুরার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। তিনি নিলক্ষা আবুল হাশেম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার দলীয় সমর্থকদের নিয়ে সভা করেছেন। সভায় বক্তৃতাকালে তিনি বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকার, মোর্শেদ মেম্বার, সহিদ ও মোতালিব মেম্বার নামে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতাদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন, যদি ক্ষান্ত না হস; তবে তোদের কপালে দুঃখ আছে। তিনি হক সরকারের সমর্থক আমীরাবাদ ও সোনাকান্দী গ্রামের ১৪ থেকে ৬৫ বছর বয়স্ক সকলকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে রায়পুরার নিলক্ষারচরে অব্যাহত গ্রাম্য দাঙ্গা, পুলিশের গুলি ও টেঁটার আঘাতে ৪ বিদ্রোহী আ’লীগ কর্মীর প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের ঘটনা নিয়ে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ৩ দিন ধরে রায়পুরা তথা নরসিংদীর রাজনৈতিক ও সাধারণ মহলে এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা নিয়ে চলছে বিভিন্নমুখী আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়।
জনগণ বলছে, নিলক্ষারচরে ভয়াবহ দাঙ্গার কারণ রাজনৈতিক। দাঙ্গাবস্থা সৃষ্টির দায় রাজনৈতিক নেতাদের। ভয়াবহ প্রাণহানি, রক্তক্ষয়, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দমনে ব্যর্থতার প্রত্যক্ষ দায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের, পরোক্ষ দায়ও রাজনীতিকদেরই।
গত মঙ্গলবার ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি আবুল কালাম আজাদ ও গতকাল বুধবার রায়পুরার এমপি এবং সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু নিলক্ষা সফরে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোসহ এলাকার জনগণের মুখ থেকে এসব কথা উচ্চারিত হয়েছে। মন্ত্রী রাজু বুধবার নিলক্ষা সফরকালে রাজীব নামে এক লাঠিয়াল নেতাকে তার গাড়িতে করে এলাকায় নিয়ে যান। এই রাজীবের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল পালন, অস্ত্র ও বোমা সরবরাহ এবং দাঙ্গা চলাকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে লাঠিয়ালদের পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। রাজীবের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যাপক অভিযোগ থাকার পরও মন্ত্রী রাজু তার সপক্ষে সাফাই গেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলছেন, নরসিংদীর মেয়র লোকজন হত্যাকা-ের পর ছাত্রলীগ নেতারা প্রকাশ্যে জনসভায় দাঁড়িয়ে লোকমান হত্যাকা-ের জন্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুকে দায়ী করেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রায়পুরার নিলক্ষারচরে সংঘটিত হত্যাকা- এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য সন্দেহের অঙ্গুুল এমপি রাজুর দিকেই উত্থিত হয়েছিল। বুধবারের তার একতরফা সভা সেই সন্দেহকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তিপ্রিয় জনগণ বলছে, বিগত ইউপি নির্বাচনে এমপি রাজুর মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকার নির্বাচন করায় এমপি রাজু তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এরপর থেকে তাকে ও তার সমর্থকদের বাড়িছাড়া করে দেন বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম। তার প্রধান লাঠিয়াল সেনাপ্রতি সুমেদ আলী, রাজীবসহ অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা। আব্দুল হক চেয়ারম্যান ও তার সমর্থকরা বাড়িতে উঠতে গেলেই তাদের ওপর হামলা চালায় তাজুলের লাঠিয়াল বাহিনী। এ অবস্থায় গত কয়েক মাসে ১২-১৩টি সংঘর্ষ ঘটেছে নিলক্ষার বিভিন্ন গ্রামে। মন্ত্রী রাজুর সমর্থক চেয়ারম্যান তাজুল ও তার লাঠিয়াল বাহিনী হক সরকারের লোকদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে রায়পুরা থানায় কমবেশি ৭-৮টি মামলা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে ২-৩ হাজার লোককে। কিন্তু কোনো আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। প্রাপ্ত তথ্য মতে, নিলক্ষা ইউনিয়নে দেড় হাজার ওয়ারেন্ট পেন্ডিং পড়ে রয়েছে। এমপি রাজুর সমর্থক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বলে পুলিশ কোনো আসামি ধরার সাহস পায়নি। লাঠিয়াল সরদার সুমেদ আলীর কীর্তিকলাপ নিয়ে স্থানীয় পত্রিকাসমূহে সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করতে সাহস পায়নি পুলিশ।
এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পর নিলক্ষা আবু হাশেম উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। নির্বাচনের পর থেকে এই ক্যাম্পটি বহাল থাকলেও এলাকায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের দাঙ্গা থেমে থাকেনি। ক্ষমতাসীন চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের লাঠিয়াল সরদার সুমেদ আলী তার বাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করছে, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার সাহস পায়নি। সুমেদ আলী ও তার লাঠিয়াল বাহিনী বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদাবাজি করেছে। চাঁদা না দিলে মারধর করছে। বাড়িঘর লুটপাট করছে। অগ্নিসংযোগ করছে। ক্যাম্প পুলিশ সুমেদ আলী ও তার লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলতে পারেনি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতারা জানিয়েছেন, গত শনিবার, রবিবার ও সোমবারের হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আওয়ামী লীগের একজন নেতা তার বাসায় পুরনো আওয়ামী লীগ, বর্তমান বিএনপির নেতাসহ তার সমর্থক লাঠিয়াল নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘাঁটি আমিরাবাদ ও সোনাকান্দী গ্রাম দখলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় শনিবার, রবিবার ও সোমবার। সোমবার সকালে তাজুল, সুমেদ আলী ও রাজীবদের নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ