Inqilab Logo

শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

রাজধানীতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে-আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১২ মে, ২০২২, ১২:০১ এএম

বর্ষা আসার আগেই রাজধানীতে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। নগরীতে একশোটি পাত্রের মধ্যে ১০টিতেই পাওয়া যাচ্ছে এডিসের লার্ভা। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হয়নি। এরই মধ্যে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে নগরীর বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় এখনো খাল, নর্দমা, নির্মাণাধীন বাসা বাড়ির চারপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়নি। বৃষ্টির পানি জমে থাকা রাস্তার পানি ও সরানো হচ্ছে না। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ নিলেও তা যথেষ্ট ও যুগোপযোগী নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন নানা কারণে এবছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ নিতে পারে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যেসব এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে, সেসব এলাকার ড্রেন ও নর্দমায় আবারও গাপ্পি মাছ ছাড়া হবে জানিয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু সঙ্কট মোকাবিলায় এখন থেকেই এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসের জোরালো প্রক্রিয়া ছাড়া এ থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি নগরবাসীদের বাসা বাড়ি নিয়মিত পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, গবেষণানির্ভর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ছাড়া ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রতিবছর মৌসুমের শুরুতে এসে উদ্যোগ নিয়ে কোনো লাভ হবে না। ডেঙ্গু এবং মশাবাহিত অন্যান্য রোগ নির্মূল করতে হলে দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সম্ভাব্য যে সকল পাত্রে এডিস মশা জন্মায় বা জন্মানোর সম্ভাবনা রয়েছে সেই সব পাত্র অপসারণ করা বেশি জরুরি। বর্ষা শুরুর আগেই মেয়রদের উচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে, পাড়া মহল্লায় ভাগ করে স্থানীয় সমাজকর্মী এবং যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা।

গতকাল বুধবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, অপরিচর্যিত ছাদবাগান ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এখন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বাসায়, স্থাপনায়, বাড়ির আনাচে-কানাচে, ছাদবাগানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। ছাদবাগানগুলো যেন সঠিকভাবে পরিচর্যিত থাকে। সেজন্য ঢাকাবাসীর সহযোগিতা চাই। তাদের ছাদবাগানগুলো যেন পরিচর্যিত থাকে। অপরিচর্যিত ছাদবাগানে পানি জমে থাকলে সেখানে লার্ভা জন্মায়। কিন্তু ছাদবাগান যদি যথাযথভাবে পরিচর্যা করা হয় তাহলে সেখানে লার্ভা জন্মাতে পারে না।

এর আগে মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে পরিচালিত এডিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ চিরুনি অভিযানের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে শুরু হলে দুটি মূল কাজ অগ্রাধিকার পায়। একটি হলো মশক নিধন ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাতে করে ঢাকাবাসী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হয় এবং দ্বিতীয়ত হলো পানিবদ্ধতা নিরসন। এই দুটি বিষয়কে বিবেচনা করেই এবার অগ্রিম কাজ আরম্ভ করেছি। সেই প্রেক্ষিতেই বর্ষা মৌসুমের আগেই স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক প্রাক মৌসুমের একটি জরিপ করা হয়েছে। সেখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিনটি ওয়ার্ডকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং চারটি ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা এই সাতটি ওয়ার্ডকে নিয়েই কাজ আরম্ভ করেছি যাতে করে কোথাও এই লার্ভা জমে না থাকতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, রাজধানীর দুই সিটির ৯৮টি ওয়ার্ডের ১১০ স্থানে ডেঙ্গুর প্রকৃত অবস্থা নিয়ে মাঠপর্যায়ে চালানো প্রাক্-মৌসুম এডিস সার্ভেতে এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা পরিচালিত এ জরিপে উত্তর সিটির ৬৩টি এবং দক্ষিণ সিটির ৯৬টি বাড়িতে এডিস মশা অতিরিক্ত মাত্রায় চিহ্নিত হয়েছে। জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি ওয়ার্ডে বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ কিউলেক্স মশা আর বাকি ৫ দশমিক ১ শতাংশ এডিস মশা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে নির্মাণাধীন ভবনে, যা ৪২ দশমিক ১১ শতাংশ, বহুতল ভবনে ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, একক ভবনসমূহে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ, সেমিপাকা/বস্তি এলাকায় ৯ দশমিক এবং পরিত্যক্ত (ফাঁকা) জমিসমূহে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) উচ্চমাত্রার ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকা ওয়ার্ডগুলো হলো পুরান ঢাকার মদন মোহন বসাক রোড ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড। দয়াগঞ্জ ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ৪০ নম্বর ওয়ার্ড এবং ডিস্ট্রিলারি রোড ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড। মশার ঘনত্ব পরিমাপক ব্রুটো ইনডেক্স অনুযায়ী এসব এলাকায় মশার ঘনত্ব ২০ শতাংশের বেশি।

মধ্যম মাত্রার ঝুঁকিতে থাকা ডিএসসিসির ওয়ার্ডগুলো হলো রাজারবাগ ও চামেলিবাগ এলাকা নিয়ে গঠিত ১৩ নম্বর ওয়ার্ড; ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা এবং পূর্ব রায়েরবাজার নিয়ে গঠিত ১৫ নম্বর ওয়ার্ড; শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলামোটর এলাকা নিয়ে গঠিত ২১ নম্বর ওয়ার্ড এবং লালবাগ ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ২৩ নম্বর ওয়ার্ড। মধ্যম মাত্রার ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকা ডিএনসিসির ওয়ার্ডগুলো হলো পল্লবী ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ৬ নম্বর ওয়ার্ড, মহাখালী ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ২০ নম্বর ওয়ার্ড এবং লালমাটিয়া ও মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে গঠিত ৩২ নম্বর ওয়ার্ড। ব্রুটো ইনডেক্স অনুযায়ী, এসব এলাকায় মশার ঘনত্ব ১০ থেকে ১৯ শতাংশ। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ আরও ওয়ার্ডগুলো হলো ডিএসসিসির ৮, ১৪, ২০, ৩৫, ৪৬ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ড এবং ডিএনসিসির ১০, ১৩, ১৬, ২৭, ৩০ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড। এদিকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএসসির

আসন্ন ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কীটনাশক নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আইন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা হবে। গতবার ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করেছি। এবার শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে জেলও হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বলেছেন, দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনই প্রতিরোধ করতে না পারলে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হবে। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করেছি। কারণ ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধির বেশিরভাগ কারণই হলো মানুষের তৈরি। সচেতনতা আমাদের অনেকাংশেই মুক্তি দিতে পারে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, লোকবল, যন্ত্রপাতি এবং ওষুধ কী পরিমাণ মজুত আছে সেগুলো নিয়ে দুই সিটির মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অবস্থাটা পর্যালোচনা করেছি। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুই সিটি করপোরেশেনই ডেঙ্গু মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত আছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ডেঙ্গু


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ