Inqilab Logo

রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

বন্দর প্রসারের মহাসুযোগ

বন্দরের সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে কর্ণফুলীর উভয় তীরেই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ অপরিহার্য : বাড়বে বিনিয়োগ-শিল্পায়ন ও রাজস্ব আয়

শফিউল আলম | প্রকাশের সময় : ১৮ মে, ২০২২, ১২:০০ এএম

বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মিলিত মোহনায় চট্টগ্রাম একটি সুপ্রাচীন ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় তথা সমুদ্র বন্দর। এখানে কর্ণফুলীর শুধুই একটি তীরের উত্তর পাশ ধরে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। দক্ষিণ পাড়ে বাম তীরে বন্দর সম্প্রসারণের জন্য অপার ভূ-প্রাকৃতিক সুবিধা থাকলেও সেখানে বন্দর-সুবিধা এখনও সৃজন হয়নি। ডান ও বাম উভয় তীরেই দেশের প্রধান এই সমুদ্র বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর মহাসুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠেছে নদী-সাগর মোহনার উভয় তীরেই।

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও তা নিশ্চিত করতে হলে শুধুই প্রয়োজন অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা স্থাপন করে তার সদ্ব্যবহারের পরিকল্পিত উদ্যোগ। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্পায়ন, শিপিং বাণিজ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সময়ের চাহিদা পূরণের জন্য তা অপরিহার্য মনে করেন পোর্ট-শিপিং সার্কেল ও বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা মহল। এ পদক্ষেপ নেয়া হলে বাড়বে বন্দরের সক্ষমতা, দেশের বিনিয়োগ-শিল্পায়ন ও জাতীয় রাজস্ব আয়।

অতিসম্প্রতি দুর্ঘটনা কবলিত একটি জাহাজের কন্টেইনার নিরাপদে আনলোড করা হয় কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে বেসরকারি জেটিতে। গত ৪ মে ‘এমভি হাইয়ান সিটি’ জাহাজটিকে কর্ণফুলী ড্রাইডক জেটিতে ভিড়িয়ে জাহাজের নিজস্ব ক্রেনের (গিয়ার) সাহায্যে ৪০ ফুটি কন্টেইনার অনায়াসে খালাস করা সম্ভব হয়। গত ১৪ এপ্রিল কুতুবদিয়ার কাছে ‘এমটি ওরিয়ন এক্সপ্রেস’ জাহাজের সাথে সংঘর্ষে ‘হাইয়ান সিটি’র কার্গো হোল্ডের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে জাহাজটি ৭ ডিগ্রি কাত হয়ে যায়। এরপর জাহাজটি সতর্কভাবে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে বেসরকারি কর্ণফুলী ড্রাইডক জেটিতে ভিড়িয়ে কন্টেইনার খালাস করা হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় তা সম্পন্ন হয়। যা চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম।

চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭টি জেটি-বার্থসহ জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি, বিভিন্ন মুরিং-রিভার মুরিং, লাইটারেজ জেটিসমূহ, ইয়ার্ড, শেড, কিউজিসি, আরটিজিসিসহ হরেক আকারের ভারী যান্ত্রিক সরঞ্জাম ইত্যাদি অবকাঠামো সুবিধা এ যাবৎ গড়ে উঠেছে কর্ণফুলী চ্যানেলের উত্তর প্রান্তে অর্থাৎ ডান দিকে। দক্ষিণ দিকে এ ধরনের কোন বন্দর-সুবিধা গড়ে উঠেনি। অথচ সেখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে একাধিক শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ে উঠেছে।
ইতোমধ্যে বেসরকারি জেটি ও ডক সুবিধা নিয়ে কর্ণফুলী ড্রাইডক গড়ে উঠেছে। তাছাড়া রয়েছে বিভিন্ন বিশেষায়িত জেটি। পরিকল্পিতভাবে এখনও দক্ষিণ পাড়ে বন্দর-সুবিধার সম্প্রসারণ ঘটেনি। ভূ-প্রাকৃতিকভাবে সেখানে বন্দর সম্প্রসারণের মহাসুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। দক্ষিণ তীর সংলগ্ন কর্ণফুলী চ্যানেলে জাহাজ ভিড়ার জন্য অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত গভীরতা (ড্রাফট) রয়েছে। আবার অনেক স্থানে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ড্রাফট বাড়ানোরও সুযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণপাড়ে বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণের মহাসুযোগের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন। এরজন্য এখনই সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে অসুবিধা কোথায়? ওপাড়ে বন্দর-সুবিধা বিস্তৃত হলে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন জোরদার হবে। চট্টগ্রাম বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণের সম্ভাব্য সবরকম উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, অনতিবিলম্বে বে-টার্মিনাল বাস্তবায়ন করতে হবে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হলে বে-টার্মিনালের বিকল্প নেই।

নির্মাণাধীন কর্ণফুলী টানেল ও বে-টার্মিনালকে ঘিরে ওপাড়ে বন্দর-সুবিধা সম্প্রসারণে নতুন আশাবাদ জেগে উঠেছে পোর্ট-শিপিং ও ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা মহলে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলের মূল নির্মাণকাজে প্রায় ৮৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে এখনও তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তাছাড়া ওপাড়ে গড়ে উঠেছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লি. (সিইউএফএল), কাফকো, ড্যাপ ছাড়াও সিমেন্ট, স্টিল ও লোহাজাত কারখানা, চিনি, সারসহ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। ওপাড়ে আনোয়ারা ও পটিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের একক বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে বহুজাতিক ও বিশেষায়িত কোরিয়ান ইপিজেড।

প্রায় ৭৭৪ একর জমিতে চীনের একক বিনিয়োগে আনোয়ারা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চায়না স্পেশাল ইকোনমিক জোন। এসব প্রকল্প, মেগাপ্রকল্প, শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী মোহনার উভয় তীরে আনোয়ারার গহিরা-পারকি পর্যন্ত অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গড়ে উঠতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর অবকাঠামো সুবিধা। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত শিল্পায়ন বিস্তৃত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ সম্পন্ন হলে বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি হবে। চট্টগ্রাম হবে ‘ওয়ান সিটিÑ টু টাউন’।

এদিকে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে পণ্যসামগ্রী হ্যান্ডলিংয়ে তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গেল ২০২১ সালে বন্দরে ৩২ লাখ এক হাজার ৫৪৮ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এ সময়ে জাহাজ আসা-যাওয়া করেছে ৪ হাজার ২০৯টি। কন্টেনার ছাড়াও খোলা সাধারণ (ব্রেক বাল্ক কার্গো) পণ্যসামগ্রী হ্যান্ডলিং হয়েছে ১১ কোটি ৬৬ লাখ ১৯ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন। বন্দরের প্রবৃদ্ধির হার পণ্যের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশের বেশি এবং জাহাজের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ।

দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এ অবস্থায় আগামী ১০, ২০ বছর কিংবা ৫০ বছরের চাহিদা সামাল দেয়ার উপযোগী সক্ষমতা বিশেষ করে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর ১২ থেকে ১৮ শতাংশ হারে বন্দরে কন্টেইনারসহ পণ্য ওঠানামার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। অন্যথায় শুধু বন্দর-শিপিং সেক্টর নয়, দেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়বে।

বিশেষত গত দেড়-দুই দশকের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরের ডান-বাম উভয় পাড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দ্রুত প্রসার ঘটছে। কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের মিলিত মোহনায় উভয় পাড়ে সমানতালে বন্দরের ভৌত ও কারিগরি অবকাঠামো গড়ে উঠলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ বিস্তৃত হবে। এরজন্য বহুমুখী বন্দর সুবিধার সমন্বয়ে মাল্টি-পারপাস জেটি-বার্থ, টার্মিনাল, শেড-ইয়ার্ড গড়ে তুলতে হবে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরেও।

এটি উপেক্ষিত থাকায় বিদ্যমান বন্দরের প্রাকৃতিক সুবিধার আংশিক ব্যবহার হচ্ছে। বন্দর কাঠামোর প্রসার ঘুরেফিরে আগের জায়গায় সীমিত। বন্দর-সম্পদের বাড়তি সুবিধা সদ্ব্যবহার হলে আমদানি-রফতানি কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হবে। এর সাথে কর্ণফুলীর উভয় প্রান্তে পোর্ট-শিপিং, পরিবহন, শিল্প-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিভিন্ন লিঙ্কেজ খাত সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের পথ হবে সুগম।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সমুদ্র বন্দর


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ