Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

পানিতে টইটম্বুর সিলেট শহর

বন্যায় লণ্ডভণ্ড নগর-গ্রাম, লোকজন বিশুদ্ধ পানি-খাবার সঙ্কটে আগামী বর্ষার আগে সুরমা কুশিয়ারা খনন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন ষ বন্যা দুর্গতদের জন্য ২৫ লাখ ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ,

ফয়সাল আমীন, সিলেট থেকে | প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০২২, ১২:০৩ এএম

বৃষ্টি আর ভারত থকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীগুলো ভরে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সিলেটে নগর-গ্রামের জনজীবন। সুরমা-কুশিয়ারায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার ওপর দিয়ে। সিলেট নগরীরসহ সদর উপজেলার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী গোয়াইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। এসব এলাকাতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন জনপদ। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সিলেটের নগর গ্রাম নাস্তানুবাদ। এছাড়া চলমান অতিবৃষ্টি আর অতি ঢলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে সংকটময়। দু’কূল ছাপিয়ে নদীর পানি উপচে পড়ে, ডুবিয়ে দেয় সব। অথচ নদীর বুকে ভেসে যাবে নগরী লোকালয়ের সব জঞ্জাল। এমনই পরিস্থিতি এখন। সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারা এখন ফুঁসছে। এই অবস্থায় সুরমা-কুশিয়ারা খননের কথা জানালেন সিলেট-১, আসনের এমপি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। এছাড়া বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে সিলেটে অবস্থান করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এই নদীগুলো ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া ২৫ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল। এই অবস্থার মধ্যে সিলেটের আকাশে চোখ রাঙ্গাচ্ছে কালবৈশাখী ঝড়। আবহাওয়ার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে তাণ্ডব চালাতে পারে কালবৈশাখী।

এছাড়াও ভারতের মেঘালয় রাজ্য হবে ভারি বৃষ্টি। বিশেষ করে শিলং ও ডাউকিতে। ফলে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা। এছাড়া আবহাওয়া অধিদফতর সিলেটের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সিলেটে আগামী ২০ থেকে ২১ মে পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। যে কারণে আরও অবনতি হতে পারে বন্যা পরিস্থিতির।

চলমান বন্যায় নাস্তানুবাদ হয়ে আছে সিলেটের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিভিন্ন উপজেলায় প্লাবিত এলাকায় বাঁধ ও পাকা রাস্তাসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়া লোকজন বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও শৌচাগার সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, ঔষধ জ্বালানি তেলের দোকান পানির নিচে থাকায় মানবিক বিপর্যয়ের শংকা দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বাঁধ ও পাকা রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় মানুষজনকে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও সিলেট নগরীর কয়েকটি এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকার রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে। বাসাবাড়িতেও প্রবেশ করেছে পানি।

পাউবো সিলেটের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এ. কে. এম. নিলয় পাশা ইনকিলাবকে জানান, সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। নতুন করে বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভাঙ্গনের খবর সংগ্রহ করছেন তারা। সিলেট জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এছাড়াও চাল ও শুকনো খাবার বিভিন্ন উপজেলার বর্ন্যাতদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।

এদিকে, গত এক সপ্তাহের অব্যাহত বৃষ্টি আর ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে বন্যা দেখা দিয়েছে সিলেট নগরীসহ বেশিরভাগ উপজেলা। সিলেট সিটি করপোরেশন, সদর, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় লাখো মানুষ এখন পানিবন্দী। সিলেটের বন্যায় দুর্ভোগে পড়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বন্যা দুর্গত এলাকাগুলো পরিদর্শনে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট এসে পৌঁছেন তিনি । তার সঙ্গে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি। বিমানবন্দর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি ছুটে যান বন্যা কবলিত সিলেট নগরীর চালিবন্দর এলাকায়। সেখানের আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তদের মাঝে শুকনো ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন্ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সারাদেশের নদ-নদী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করেছেন। ড্রেজিংয়েরও পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সুরমা-কুশিয়ারা। তবে আগামী বছর বর্ষা মৌসুমের আগে নদী খনন করা গেলে বন্যার প্রকোপ ঠেকানো সম্ভব হবে। এতে আমাদের ক্ষয়ক্ষতিও কমবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিলেটকে বলা হতো দিঘীর শহর। কিন্তু এখন আমরা নগরের ভেতরের সব পুকুর দিঘী ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং করেছি। এছাড়া প্রধান নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। খালি মাঠগুলো ভরাট হয়ে গেছে। একারণে পানি নামতে পারছে না। এসময় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী, বন্যা মোকাবেলায় আগামীতে এই অঞ্চলের নদনদীগুলোর নব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়ে বলেন, নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এই নদীগুলো ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি বলেন, সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।

এদিকে, দিরাই (সুনামগঞ্জ) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা কেটে দিয়েছে হাওর রক্ষা বাঁধ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে বাঁধ কাটার অপরাধে কাউকে আটক করা যায়নি। ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে। জানা যায়, উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের কাজাউড়া গ্রামের দক্ষিণে বরাম হাওরের ৭৯ নম্বর পিআইসির হাওর রক্ষা বাঁধটি গত মঙ্গলবার রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা কেটে দিয়েছে। পরদিন সকালে জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায় কিছু লোককে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা সেখানে গিয়ে মাছ ধরার লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা কিছু জানে না বলে জানায়।

বাঁধ কেটে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ৭৯ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. সোলেমান চৌধুরী জানান, শুনেছি রাতের আঁধারে কারা বাঁধটি কেটে দিয়েছে, তবে এ ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না।
তথ্যমতে জানা যায়, হাওরে ধান কাটা শেষ হওয়ায় মাছ ধরার জন্য পিআইসির লোকজনই রাতের আঁধারে বাঁধটি কেটে দিয়ে মৎস্যজীবীদেরকে মাছ শিকারের সুযোগ করে দিয়ে নিজেরাও লাভবান হবে। আর আমাদের হাওরে পানি প্রবেশের কারণে এলাকার কৃষকদের গরু ঘাস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিরাই অফিসের উপ-সহকারি প্রকৌশলী শাখা কর্মকর্তা এ.টি.এম. মোনায়েম হোসেন জানান, ৭৯ নম্বর হাওর রক্ষা বাঁধটি কেটে দেয়ার খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ আমরা সেখানে গিয়ে মৎস্যজীবীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তারা বাঁধ কেটে দেয়ার ব্যাপারে কিছু জানে না বলে জানায়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বন্যা


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ