Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

দায়িত্ব পালনে পুলিশের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতা

| প্রকাশের সময় : ২১ মে, ২০২২, ১২:০২ এএম

রাজধানীর যানজট নিত্যদিনের বিষয় হলেও কখনো কখনো তা অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। এমনিতেই রাজধানীর সড়কপথ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তার ওপর সড়কের পরিমাণ অনুযায়ী যে যানবাহন চলাচলের কথা তার দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যানজটকে প্রতিনিয়ত তীব্র করে তুলছে। রাজধানীর কোনো এক জায়গায় কোনো কারণে যানজট লাগলে তা প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি ও পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। স্বল্প সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও ঠিকমতো কাজ করে না। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশকে যেমন অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তেমনি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনেও অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। গত বৃহস্পতিবার বিজয় সরণী থেকে সংসদ ভবনে যাওয়ার রাস্তায় সৃষ্ট যানজট শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ হিসেবে গতকালের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঐ সড়কের রাস্তার মুখে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কভার্ড ভ্যান উল্টে পড়ে থাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটে বুধবার রাতে। সকাল ৯টা পর্যন্ত কভার্ড ভ্যানটি সরিয়ে নেয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতেই সপ্তাহের শেষ দিন অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যানজটে পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে। যে সড়কের মুখে কভার্ড ভ্যানটি উল্টে পড়ে থাকে সে সড়কটি সংসদ ভবন হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন পর্যন্ত গিয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ, ব্যস্ত ও ভিআইপি যাতায়াতের পথে একটি যান উল্টে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকবে এবং তা ত্বরিত সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা থাকবে না, তা কল্পনাও করা যায় না।
রাজধানীর যানজটের অনেক কারণ রয়েছে। এ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নগরবিদরা আলোচনা করেছেন এবং তা সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিভিন্ন সমাধানও বাৎলে দিয়েছেন। গবেষকরা যানজটে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি, প্রতিদিন মানুষের ৩৮ লাখ শ্রমঘন্টা নষ্টসহ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এসব সমস্যা সমাধানের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। গাড়ির গতি মানুষের হাঁটার গতির সমান হয়ে গেছে। উন্নতবিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশেও যানজটের সৃষ্টি হয়, তবে ঢাকার মতো এমন যানজট কোথাও দেখা যায় না। ঢাকা এমন একটি শহরে পরিণত হয়েছে, যা বহু আগেই বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। শীর্ষ অবাসযোগ্য নগরি, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষণ থেকে শুরু করে হেন কোনো সমস্যা নেই, যা নেই। স্বাভাবিক নিয়মে একটি শহরে আয়তনের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগ সড়ক থাকা বাঞ্চনীয় হলেও ঢাকায় রয়েছে ৭ ভাগেরও কম। এই সড়কের মধ্যে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকায় প্রায় প্রত্যেকটি সড়ক সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। এই অতিসংকুচিত সড়কের মধ্য দিয়েই লাখ লাখ যানবাহন চলছে। তার ওপর যেটুকু সড়ক ও ফুটপাত রয়েছে তা অবৈধ দখল, পার্কিং এবং সড়কের মাঝপথে কিংবা যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামার কারণে যানজট স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটলে তো কথাই নেই। কখনো কখনো গাড়ি বিকল হয়ে যানজট পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় ট্রাফিক পুলিশের চরম অমনোযোগিতা রয়েছে। সড়কের মাঝে গাড়ির কাগজ-পত্র চেক করার নামে তারা নিজেরাও যানজট সৃষ্টি করছে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিজয় সরণীর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পথে কভার্ড ভ্যান উল্টে পড়ে থাকায় যে অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়, তা অভাবনীয়। সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কেন দ্রুততম সময়ে রেকার এনে তা সরিয়ে নিল না? এর ব্যাখ্যা কি? এটা পুলিশের উদাসীনতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, গড়িমসি ছাড়া কিছুই নয়।
শুধু শহরে নয়, মহাসড়কেও প্রায়ই দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে গাড়ি উল্টে যেতে দেখা যায়। এতে মাইলের পর মাইল যানজট সৃষ্টি হয়ে যাত্রীদের অশেষ দুর্ভোগে পড়তে হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে গেলেও গাড়ি সরিয়ে নেয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এটা দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট পুলিশের চরম কর্তব্যচ্যুতি। বিশ্বের যেকোনো শহরের সড়ক কিংবা মহাসড়কে এমন দুর্ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সড়ক থেকে গাড়ি সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে। আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখানে সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়ন ও সংস্কারে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ সড়কে দুর্ঘটনায় যানাবাহন পড়ে থাকলে তা দ্রুততম সময়ে সরিয়ে সড়ক সচল করার মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেই। তা নাহলে, রাজধানীসহ মহাসড়কে দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি সরিয়ে নিতে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগবে কেন? সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বেতন-ভাতা ও নানা সুযোগ সুবিধায় বেসুমার খরচ করছে। এ তুলনায় তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী গ্রেফতার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবেলা বা বাঞ্চাল করা নয়, তার মূল দায়িত্ব জনসেবা করা। দেখা যাচ্ছে, পুলিশের মধ্যে এই দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে। পুলিশের উচিৎ জনদুর্ভোগ ও সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হওয়া, যেকোনো সমস্যা দ্রুততম সময়ে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। ট্রাফিক পুলিশের উচিৎ সড়ক কিভাবে সবসময় সচল ও যানজটমুক্ত রাখা যায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বন করা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দায়িত্ব পালনে পুলিশের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতা
আরও পড়ুন