Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

কৃষি অর্থায়নকে সহজ ও কার্যকরী করবে ‘আইফার্মার’

দূর হবে কৃষকদের ঋণদানের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের অসুবিধা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২১ মে, ২০২২, ৪:৫৯ পিএম

বর্তমান সময়ে কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে একটি বিস্তৃত অবকাঠামো তৈরি হয়েছে; এর পুরোটা জুড়েই রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা। আর্থিক খাতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সার্বিক অর্থায়ন প্রক্রিয়া ও কৃষি খাতেও পরিবর্তন আনছে। এ পরিবর্তনের সারথি হয়ে কাজ করে যাচ্ছে, দেশের একমাত্র ফুল-স্ট্যাক অ্যাগ্রিটেক স্টার্টআপ ‘আইফার্মার’। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বর্তমানে আমাদের দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান সন্তোষজনক নয়। এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে। তবে, এ কারণগুলো চিহ্নিত করে ও এর সমাধানে কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

বর্তমান সমস্যা

প্রতি বছরই কৃষকদের মাঝে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ বাড়লেও, চাহিদার তুলনায় এই ঋণ অপ্রতুল। বিশেষ করে, চাষের মৌসুমে উৎপাদন খরচ মেটাতে বেশিরভাগ কৃষকদের ঋণের দ্বারস্থ হতে হয়। এক্ষেত্রে, প্রথাগত বা ট্রেডিশনাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণে কৃষকদের মাঝে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না।

ব্যাংক ও নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট বা এনবিএফআইগুলো কৃষিঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইকরণ (ভেরিফাই) করা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য গত দশকের (২০১০-২০১৯) মাঝামাঝি সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলে বেশ কিছু ব্যাংক নিজেদের মনোনীত এজেন্টদের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ শুরু করে। কিন্তু, এক্ষেত্রে মনোনীত এজেন্টরা ব্যাংকের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা না হওয়ায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তীতে লোন রিপেমেন্টের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ফলে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ আশানুরূপ সাফল্য পায়নি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্রুত লোন বিতরণের কারণে এনজিও এবং এমএফআইগুলো কৃষকদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। এছাড়াও, সুপারভাইজরি এবং লোন রিকভারি-রিলেটেড খরচ কম হওয়ার কারণে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এনজিও এবং এমএফআইগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু ব্যাংকের বরাদ্দকৃত অর্থ প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে তাই এ ধরনের লোনের বিপরীতে সুদের হার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা অত্যধিক।

তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে সীমাবদ্ধতা, চড়া সুদে ঋণ প্রদান ইত্যাদির পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ঋণ পরিশোধের শর্তাবলীও কৃষকদের জন্য উপযুক্ত না। এক্ষেত্রে, অধিকাংশ সময় সাপ্তাহিক অথবা মাসিক কিস্তির শর্তে ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় মনিটরিং না থাকার কারণে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হলে ব্যাংকগুলো দায়বদ্ধ থাকেনা, যা কৃষকদের জন্য হুমকিস্বরূপ।

 

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, ঋণ প্রদান থেকে শুরু করে পরিশোধের সময় পর্যন্ত পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা। লোনের টাকা পাওয়ার পর কৃষক তা সঠিক কাজে ব্যয় করছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকের কাছে নির্দিষ্ট কোন প্রক্রিয়া (মেকানিজম) নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষকরা লোনের টাকা নিয়ে অন্যান্য কাজে খরচ করে। তাই, তারা সঠিকসময়ে লোন পরিশোধ করতে পারে না; ফলে, তাদের বড় ধরনের ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। অন্যদিকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে লোন নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা কিছুটা বৈষম্যেরও শিকার হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লোন বিতরণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত স্বাবলম্বী বা ঋণ পরিশোধে সক্ষম এরকম কৃষকদের বাছাই করে থাকে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা বঞ্চিতই থেকে যায়।

কিভাবে আইফার্মার স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে সমস্যার সমাধান করছে?

ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে ‘আইফার্মার’ এর ইনফরমেশন ও ডাটাবেজ। ফাইন্যান্সিং সুবিধা সহজ করার ক্ষেত্রে কৃষকদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, আর্থিক এবং লেনদেনের বিভিন্ন তথ্য ও ডাটা সংগ্রহ করছে ‘আইফার্মার’। এক্ষেত্রে, সবচেয়ে বড় কার্যকর উপাদান (কন্ট্রিবিউটিং ফ্যাক্টর) হলো স্টার্টআপটির সফল অ্যাপ। ২০২০ সালে চালুর পর থেকে এ অ্যাপটির মাধ্যমে লোন প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রথমে ‘আইফার্মার’ তাদের নিজস্ব ফিল্ড ফ্যাসিলিটরদের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঋণ প্রত্যাশী কৃষকদের বাছাই করে তাদের প্রয়োজনীয় ঋণের পরিমাণ ও সক্ষমতা বোঝার চেষ্টা করে কৃষকদের প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করে। অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় তারা কৃষকদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সহ আরও বেশ কয়েক ধরনের ডকুমেন্টস সংগ্রহ করে ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। অর্থাৎ, ঋণ দেয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিলো ফিল্ড ফ্যাসিলিটরদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল, যা ছিলো সময়সাপেক্ষ, অদক্ষতা এবং অনেক সময়ই সম্ভাবনাময় কৃষকরা ফিল্ড ফ্যাসিলিটরদের সীমাবদ্ধতার কারণে উপেক্ষিত হতো। সফল অ্যাপটি মূলত এ ধরনের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাকে দূর করে কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত করতে চালু করা হয়। যদিও এ অ্যাপটি কৃষকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকই যেহেতু টেক স্যাভি (তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান) না তাই ‘আইফার্মার’ মূলত তাদের ফিল্ড ফ্যাসিলিটরদের ও এজেন্টদের মাধ্যমেই কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ফিল্ড এজেন্টরা সাধারণ কিছু তথ্য দিয়েই কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম শুরু করতে পারে এবং অ্যাপটিতে আগে থেকে তথ্য সংরক্ষিত রেখে ফলো-আপ করার সুবিধা থাকায় কৃষকদের খুব সহজেই অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অন্যদিকে, অ্যাপটিতে সরকারের পরিচয় অ্যাপিআই সংযুক্ত থাকার কারণে ফিল্ড এজেন্টদের দেয়া তথ্য আইফার্মার টিম ঢাকায় বসেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারে। এছাড়াও, কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির সকল আপডেটই রিয়েল টাইম অ্যাপে পাওয়ার কারণে ফিল্ড এজেন্টদেরকে হেড অফিস থেকে ম্যানুয়ালি ইনফর্ম করার প্রয়োজন পড়ে না, তাই কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির পুরো প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হয়েছে। এছাড়া সফল অ্যাপ ব্যবহার করে কৃষকরা লোন অ্যাপ্লিকেশন করতে পারে এবং এ অ্যাপেই অনুমোদন পেয়ে যায়।

 

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

ভবিষ্যতে দেশের কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করতে ‘আইফার্মার’ তাদের সকল কার্যক্রমকে সফল অ্যাপকেন্দ্রিক করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। অ্যাপটি সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে স্টার্টআপটি এজেন্টদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে আরও দ্রুততার সাথে কৃষকদের প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করা, খামার ব্যবস্থাপনা, তহবিল ছাড় এবং লেনদেনকে আরও সহজতর করে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া, খামারের ছবি দেখেই কৃষকদেরকে দ্রুততার সাথে পরামর্শ প্রদানেরও পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে রিটেইল ইনভেস্টরদের পাশাপাশি ব্যাংক ও নন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কৃষকদেরকে লোন দেয়াকে সহজ করতে আইফার্মার কৃষকদের ঝুঁকির বিষয়গুলো, আর্থ-সামজিক আচরণ এবং ফসল উৎপাদনের মাত্রা সহ ৪০ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছে। একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে সংগ্রহ করা এসব তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে স্টার্টআপটি কৃষকদের জন্য ক্রেডিট স্কোরিংয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে করে ভবিষ্যতে এই স্কোরের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ও নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে পারে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন