Inqilab Logo

শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৩ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২২ মে, ২০২২, ১২:০০ এএম

সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড় হানা দিয়েছে। ঝড়ে বগুড়া, কুষ্টিয়া, মাগুড়া, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, যশোর জেলায় মৌসুমী ফসলসহ ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদন।

বগুড়া ব্যুরো জানায়, বগুড়ার কাহালুতে কালবৈশাখী ঝড়ে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া শহর এবং শহরতলীতে অসংখ্য গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ তারের ওপর পড়েছে। ফলে ভোর রাত থেকে জেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবারহ বন্ধ হয়ে গেছে। উড়ে গেছে অসংখ্য আধাপাকা বাড়ির টিনের চাল। গতকাল শনিবার ভোরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়ে স্থায়ী ছিলো মাত্র ৪ মিনিট। বগুড়া আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া জানান, ৪ মিনিট স্থায়ী এই ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৮৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার। বাতাসের গতিবেগ কমে এলে শুরু হয় বৃষ্টিপাত। দমকা বাতাসের পাশাপাশি ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

ঝড়ে বগুড়া শহর পুলিশ লাইন্স, বিয়াম মডেল স্কুল ও আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল এবং সরকারি আজিজুল হক কলেজের বড় গাছগুলো ভেঙে পড়েছে। এছাড়াও শহরের শহীদ খোকন পার্ক এবং এডওয়ার্ড পার্কে বেশ কিছু গাছে গোড়াসহ উপড়ে পড়ে। এসময় গাছে থাকা নানা প্রজাতির পাখিও মারা যায়। কাহালু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমবার হোসেন জানিয়েছেন, কাহালুর কালাই মাছপাড়ায় ঝড়ে নিহত শাহীন মিয়া গাইবান্ধার জুমারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তিনি কাহালু এলাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক ইউছুব রানা মণ্ডল জানান, বোরো ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে ঝড়ে পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য ফসলের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। নর্দান পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানীর (নেসকো) নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুক জানান, ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খুঁটি উপড়ে পড়া ছাড়াও গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে বিদ্যুতের তারের ওপর। ফলে পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।

যশোর ব্যুরো জানায়, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কালবৈশালী ঝড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের সময় মাঠে কাজ করা অবস্থায় বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া কালীগঞ্জে বজ্রপাতে ধান ক্ষেত ভুস্মীভূত হয়েছে। সদর উপজেলার ডেফলবাড়ি গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলামের ৬ লাখ টাকা দামের দুইটি মহিষের বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ঝড়ের কবলে পড়ে আহত হয় আরো ৪ জন। এছাড়া কালীগঞ্জ ও হরিণাকুন্ডু এলাকায় ঝড়ে গাছপালা, ঘরবাড়ি ও উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৬টার দিকে এসব ঘটনা ঘটে।

এদিকে তীব্র ঝড়ে ঝিনাইদহ সদরের গোয়ালপাড়া, ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন সড়ক, কালীগঞ্জে বারোবাজার, রঘুনাথপুর, কোটচাদপুরের এলাঙ্গীসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় ও রাস্তার পাশে ভেঙে পড়ে ছোটবড় প্রায় শতাধীক গাছ। এতে সকাল ৬টা থেকে বন্ধ হয়ে যায় ঝিনাইদহ-যশোর সড়কে যানবাহন চলাচল। খবর পেয়ে ঝিনাইদহ, কালীগঞ্জ ও কোটচাদপুর ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিটের ৪ ঘণ্টা চেষ্টায় যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রথীন্দ্রনাথ বসাক বলেন, ঝড়ে ৩৩টি বিদ্যুতের পোল ভেঙেছে। তাছাড়া ৩৩কেভি লাইনের উপর গাছ পড়ে তার ছিড়ে গেছে। সব স্থানেই মেরামতের কাজ চলছে। ঝিনাইদহ ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীর নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার রাশিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা দ্রুত লাইন চালু করার কাজ করছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় বিকাল পর্যন্ত লাইন চালু করেত পারেনি।
এদিকে ঝড়ের পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার তালিকা কাজ শুরু করেছে। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করছি। তালিকা শেষ হলে তারা যাতে সহযোগীতা পান সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে।

স্টাফ রিপোর্টার, কুষ্টিয়া থেকে জানায়, কুষ্টিয়ায় কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে অনেক গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। শত শত হেক্টর জমির আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্ধ রয়েছে এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৫টার দিকে ঝড় শুরু হয়। প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী ছিল এ ঝড়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আম বাগানের মালিক কামাল উদ্দিন বলেন, বাগানের সব আম ঝড়ে পড়ে গেছে। আর এক সপ্তাহ পর থেকে আম পাড়া শুরু হতো। কিন্তু ঝড়ের তাণ্ডবে আমার ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেল। কৃষক শাহজাহান বলেন, পেঁপে বাগানের খুব ক্ষতি হয়েছে। বেশির ভাগ পেঁপেগাছ উপড়ে গেছে। দৌলতপুরের কবির আলী বলেন, সকালের ঝড়ে আমার তিনটি ঘরের চালা উড়ে গেছে। এখন মেরামতের কাজ করছি।

কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জানে আলম বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে সড়কের দুপাশে শত শত গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় এলাকাবাসীর সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের টিম গাছগুলো সড়ক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) মো. মোকসেমুল হাকিম বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ের বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে। তার ছিঁড়ে অনেক স্থানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা মেরামতের কাজ করছি।

কুমারখালী আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ মামুন আর রশিদ বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৫টার দিকে ৭ কেটিএফ ঝড় ও ২৫ মিমি বৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। তবে কুমারখালী উপজেলায় ঝড়ের মাত্রা অন্যান্য উপজেলার চেয়ে তুলনামূলক কম হয়েছে। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুশান্ত কুমার প্রমানিক বলেন, ঝড়ে তাৎক্ষণিক ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি। তবে কৃষি বিভাগের লোকজন মাঠে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছে।

স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরা থেকে জানান, মাগুরার শালিখা উপজেলায় বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে আছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। গতকাল শনিবার সকালে মাত্র ৫ মিনিটের কালবৈশাখীর ছোবলে এঘটনা ঘটে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উজগ্রামের প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ২টি ঘরের চাল ও মাগুরা কৃষি ইনস্টিটিউট রামপুর শালিখার দুই কক্ষের দুইটি টিনের চালা উড়ে গেছে। সেওজগাতি আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়টির একটি কক্ষের টিনের চালা দুমড়ে মুচড়ে উড়ে গেছে। একই গ্রামের বিদ্যুতের ১১ট খুটি উপড়ে পড়ে গেছে। ভাটোয়াইল গ্রামের চারটি বসত ঘরসহ অনেক ঘর উড়ে গেছে। এছাড়া মাগুরা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সকালের ঝড়ে ক্ষেতের ফসল, গাছের আমসহ মৌসুমী ফলের ক্ষতি হয়েছে।

টাঙ্গাইল জেলা সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ পাঁচশতাধিক কাঁচা ও আধা-পাকা ঘরবাড়ি বিধবস্ত হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোরে উপজেলার দেউলাবাড়ি, সংগ্রামপুর, রসুলপুর ও লক্ষীন্দর ইউনিয়নে এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে।
জানা যায়, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে অনেক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। গাছের চাপায় স্কুল ছাত্রীসহ একই পরিবারের তিন জন আহত হয়েছে। এছাড়াও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বিদ্যুৎতের তার ও খুটি লন্ডভন্ড হওয়ায় সকাল থেকেই চার ইউনিয়নে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে হঠাৎ করে প্রচণ্ড বেগে আসা ঘূর্ণিঝড়ে উপজেলার দেউলাবাড়ি, সংগ্রামপুর, রসুলপুর ও লক্ষীন্দর ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও দেউলাবাড়ি ইউনিয়নের এম. কে. ডি. আর উচ্চ বিদ্যালয়ের ২টি টিনসেড বিল্ডিং স¤পূর্ণভাবে বিধবস্ত ও আরেকটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাত্নক হুমকির মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করানো হচ্ছে।
নওগাঁ জেলা সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড় তাণ্ডব চালিয়েছে। এতেকরে লণ্ডভণ্ড হয়েছে শত শত গ্রাম। ধান, আম, ভুট্টা, পটলসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে গেছে টিনশেড ও আধাঁ পাকা ঘর। বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। উপড়ে পড়েছে বহু গাছপালা। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক ও এলাকাবাসী।

জানা যায়, গতকাল শনিবার রাত ২টায় হঠাৎ ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি ও ঝড়ের সাথে ভারী বজ্রপাতও হয়েছে। ঝড়ে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে, গাছের ডাল পড়ে, প্রাচীরের ইট পড়ে বিভিন্নভাবে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই। ঝড় শেষে সকাল গড়িয়ে গেলেও কৃষি বিভাগের কোন লোকজন মাঠ পরিদর্শন করেনি বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।

লক্ষীকুল গ্রামের ভ্যানচালক মাজেদুল ফকির বলেন, ‘বউ বাচ্চা নিয়ে ঘরত আছিনু। রাতে খুব জোড়ে বাতাস হচ্ছিল কিন্তু এমন যে হইবে তা হামরা বুঝতে পারিনি। গাছ ভেঙে পড়েছে বাড়ির উপর। ভ্যাগিস বাইরে আছুনো। নইলে সবাই মারে গেনু হেনি। গাছ পড়ে টিন ফাঁক হয়ে গেছে ও ইটের দেওয়ালের ইট এসে পড়েছে বিছানায়। ইট পড়ে খাট ভেঙে গেছে। এখন খোলা আকাশের নীচে। এখন ঘর সারমো কেমনে। বাচ্চাদের নিয়ে কী করমো হামরা? আল্লাহ্ কেন গরিবের দুঃখ দেখে না।’

বদলগাছী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছেন, ঝড়ো হাওয়ায় বদলগাছী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের অনেক খুটি হেলে পড়েছে। বিদ্যুতের লাইনের উপর গাছপালা পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় তার ছিড়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে গতকাল শনিবার ভোর থেকেই কাজ চলছে। খুব দ্রুতই পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। কোলা ইউপি চেয়ারম্যান শাহিনুর ইনলাম স্বপন বলেন, ঝড়ে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে যা দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হবে। ফসলের ক্ষতির ব্যাপারে জানতে উপজেলা কৃষি অফিসার হাসান আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ