Inqilab Logo

শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়

| প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০২২, ১২:০৩ এএম

বেশ কিছুদিন ধরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিইআরসি এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে। কমিশনগঠিত কারিগরি কমিটি বিদ্যুতের দাম পাইকারী পর্যায়ে গড়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এর আগে গত মার্চে গ্যাসের দাম ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে ২০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। দেশ ও মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার বিদ্যমান প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো অপরিহার্য উপকরণের দাম বাড়ানোর চেষ্টাকে কারো পক্ষেই স্বাভাবিকভাবে নেয়া সম্ভব নয়। গণশুনানিতে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেছে। অথচ, গণশুনানির ‘গণবিরোধিতা’ গ্রাহ্যে না নিয়ে বিইআরসি তার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এমতাবস্থায়, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বনিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনের তরফে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন এবং বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের সুচিন্তিত পরামর্শ: সরকার ভর্তুকি দিয়ে ও দক্ষতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বর্তমান অবস্থায় রাখুক। আমরা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও পরামর্শকে বাস্তবোচিতও সমায়ানুগ বলে মনে করি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনায় বিশ্ব অর্থনীতির অপরিমেয় ক্ষতি হয়েছে। এমন কোনো দেশ নেই, যে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েছে। কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সে দেশের মানুষের অভাব, দারিদ্র্য, দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। করোনায় দেশে দেশে শুধু মানুষই মরেনি, মানুষের অর্থনৈতিক সমর্থও নিঃশোষিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনার প্রকোপ কমায় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিটা দেশ ও মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত হয়েছে। ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তাদের প্রচেষ্টাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। যুদ্ধে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এ দু’য়ের সংকট যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি দামও বেড়েছে। এইসঙ্গে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন-সরবরাহব্যবস্থায় ও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এতে খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সব কিছুতেই তার প্রভাব পড়বে। খাদ্যপণ্যসহ সব কিছুর মূল্যস্ফীতি ঘটবে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, মানুষের দুঃখ-কষ্টের সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এর ফলে গণঅসন্তোষও দেখা দিতে পারে, যা সরকারকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কাজেই বিইআরসি নয়, সরকারকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী পত্রিকান্তরে বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিই নেবে। বাড়াতে চায়, বাড়াবে। না বাড়াতে চায়, না বাড়াবে। অতঃপর আসল কথাটি বলেছেন এভাবে, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। আমাদের মূল্য সমন্বয়ের দিকে যেতে হবে। সরকার কতদিন ভর্তুকি দিয়ে চালাবে? এভাবে ভর্তুকি দিয়ে চলতে পারে না।’

পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তবতার নিরিখে তা সমর্থনীয় হতে পারে না। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ যে পরামর্শ দিয়েছেন তার সঙ্গে আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। উল্লেখ আবশ্যক, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আরো অনেক দেশেই আছে। তারা কিন্তু দাম বাড়ানোর পথে যায়নি। ভারত জ্বালানি তেলের শুল্ক হ্রাস ও ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পেট্রোলে ৮ রুপি ও ডিজেলে ৬ রুপি শুল্ক কমিয়েছে। জনগণের ওপর থেকে চাপ কমাতে এই শুল্ক কমানো হয়েছে। পাকিস্তানও একই কারণে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি থেকে বিরত রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চুরি বন্ধ, সিস্টেম লসের নামে অপচয় কমানো ও অবৈধ সংযোগ কর্তন করা হলে এবং জ্বালানিখাতের অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব হলে দাম বাড়ানো নয়, কমানোও সম্ভব। চুরি, অপচয় ও অবৈধ সংযোগ বন্ধের কথা পূর্বাপর বলা হলেও এব্যাপারে তেমন কোনো সাফল্য নেই। না থাকার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাদের বাড়তি আয়ের উৎস এসব। জ্বালানিখাতের অব্যবস্থাপনা বহুল আলোচিত। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ও এক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়ার প্রধান কারণ বেসরকারি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ও উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান বিরাট। উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। এরপরও ভাড়াভিত্তিক রেন্টাল- কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে। এদের বিদ্যুৎ না কিনলেও ভাড়া গুনতে হয় সরকারের। গত ১০ বছরে ভাড়া দিতে হয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ সরকার ভর্তুকি এবং ভোক্তারা বর্ধিত দাম দিয়ে পরিশোধ করেছে। এও দেখা গেছে, অধিক দামের তেলেচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে। আর বন্ধ রাখা হয়েছে কম দামের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ধরনের নজির আরো ক্ষেত্রবিশেষে লক্ষ করা যায়। জ্বালানি খাতকে সুশৃংখল ও সুব্যবস্থাপনার আওতায় আনা, দুর্নীতি-দুষ্কৃতি দূর এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে না। আশা করি, দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা পরিহার করবে। বিকল্প ব্যবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন