Inqilab Logo

শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ০৪ ভাদ্র ১৪২৯, ২০ মুহাররম ১৪৪৪

মহাসড়কের উন্নয়ন কাজে ধীরগতি জনজীবনে দুর্গতি

টাঙ্গাইল-রংপুর সড়কের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে দেশ-বিদেশের পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

কামাল আতাতুর্ক মিসেল | প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০২২, ১২:০২ এএম

টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়ক চারটি আন্তর্জাতিক করিডরে যুক্ত হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলা হচ্ছে মহাসড়কটি। দুইপাশে ধীরগতির গাড়ির জন্য আলাদা লেনসহ নির্মাণ করা হচ্ছে চার লেনের সড়ক। ১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির এ উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করছে দেশ-বিদেশের পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চার লেনে সড়কের কাজ বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড। তাদের কাজে ধীরগতি দৃশ্যমান। চলতি বছরের মার্চে শেষ করার চুক্তি থাকলেও আবদুল মোনেম বাস্তবায়ন করেছে সার্বিক কাজের ৩৫ শতাংশ। আগেভাগে শুরু করেও কাজ বাস্তবায়নে অন্য ঠিকাদারদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হাটিকুমরুল-মির্জাপুর অংশ ছাড়াও আরেকটি প্যাকেজে এলেঙ্গা-বঙ্গবন্ধু সেতু অংশের প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজও পেয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড।

সওজ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণ বলছে, কাজ বাস্তবায়নে আবদুল মোনেমের ধীরগতি দৃশ্যমান। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভায় ধীরগতিতে কাজ বাস্তবায়নের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেমের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। এর আগে যথাসময়ে কাজ বাস্তবায়নের জন্য একাধিকবার চিঠিও দিয়েছে সওজ অধিদফতর। যদিও কাজে কোনো ধরনের ধীরগতি নেই বলে দাবি করেছেন আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, করোনা মহামারী ও নির্মাণ উপকরণের সরবরাহ সঙ্কটে শুরুর দিকে কাজ বাস্তবায়নে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল, বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।

অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের স্বনামধন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি আবদুল মোনেম লিমিটেড। অতীতে তারা অনেকগুলো সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নকাজ ভালোভাবে শেষ করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেমের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা খেই হারিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও হয়তো তারা কিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে আবদুল মোনেম লিমিটেডের অংশের কাজ বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সওজ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।

সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেও আবদুল মোনেমের কাজে ধীরগতির বিষয়টি চোখে পড়েছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে প্রকল্প এলাকা শুরু হলেও বর্তমানে সড়ক উন্নয়নকাজ চলছে বঙ্গবন্ধু সেতুর পর থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হেগো-মীর আখতারের জয়েন্ট ভেঞ্চার। কাজ শুরু করার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৯ সালের মার্চে হেগো-মীর আখতারকে সাইট হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু-হাটিকুমরুল অংশে। নির্মাণাধীন সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, ওভারপাস, মূল সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।

হাটিকুমরুলের যেখান থেকে হেগো-মীর আখতারের অংশ শেষ হয়েছে, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আবদুল মোনেমের অংশ। এটি প্রকল্পের ৭ নম্বর প্যাকেজ। হাটিকুমরুলে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে বগুড়ার মির্জাপুরে। বঙ্গবন্ধু সেতু-হাটিকুমরুল অংশে শ্রমিক-প্রকৌশলীদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়লেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে আবদুল মোনেমের বাস্তবায়নাধীন হাটিকুমরুল-মির্জাপুর অংশে। বঙ্গবন্ধু সেতু-হাটিকুমরুল অংশে বেশির ভাগ অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও হাটিকুমরুল-মির্জাপুরে উল্লেখ করার মতো কোনো কাঠামোই এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সড়কের পূর্বপাশে কোথাও মাটির কাজ চলমান আছে। আবার কোথাও কোথাও বেজ কোর্সের কাজ চলছে। কয়েকটি সেতু-কালভার্টের কাজ চললেও সেখানে গুটিকয়েক শ্রমিকের উপস্থিতি ছাড়া আর কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

সওজ অধিদফতর আবদুল মোনেম লিমিটেডের বিরুদ্ধে ধীরগতিতে কাজ করার অভিযোগ তুললেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা তা মানতে রাজি নন। ধীরগতির বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইলে আবদুল মোনেম লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, শুরুতে করোনা মহামারীর কারণে আমরা কাজ বাস্তবায়নে কিছুটা জটিলতার মধ্যে পড়ি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ উপকরণের অব্যাহত দরবৃদ্ধি এবং উপকরণ সঙ্কটও নির্মাণকাজ বিঘ্নিত করেছে। এত কিছুর পরও আমরা নির্মাণকাজ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি।

অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ৭ নম্বর প্যাকেজে (হাটিকুমরুল-বনানী) আমাদের প্রায় ১৮ লাখ কিউবিক মিটার মাটির কাজ করতে হয়েছে। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতটা মাটির কাজ করতে হয়নি। সড়ক নির্মাণের মতো প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে কিন্তু মাটির কাজেই। তারপরও শুরুর দিকের জটিলতাগুলো কাটিয়ে এখন আমাদের কাজের অগ্রগতি ভালো। এ সময় ৭ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চায়না কনস্ট্রাকশন সেভেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন করপোরেশন লিমিটেড তিনটি প্যাকেজে (প্যাকেজ ১০, ১১ ও ১২) বগুড়ার মোকামতলা থেকে রংপুর পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন করছে। সওজ অধিদফতর এখনো এ প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি সাইট হস্তান্তর করতে না পারলেও ৪৬ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন করেছে।

৬ নম্বর প্যাকেজে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নকাজ করছে হেগো-মীর আখতারের জয়েন্ট ভেঞ্চার। ২০১৯ সালের মার্চে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে মির্জাপুর থেকে বনানী পর্যন্ত অংশের কাজ করছে সিপিসিএল-তান্তিয়ার জয়েন্ট ভেঞ্চার। প্রতিষ্ঠানটিকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সাইট হস্তান্তর করেছে সওজ অধিদফতর। কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। সিপিসিএল-তান্তিয়ার জয়েন্ট ভেঞ্চারের বিরুদ্ধেও ধীরগতিতে কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ এনেছে সওজ অধিদফতর। দেশ-বিদেশের পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা মহাসড়কটির উন্নয়নকাজ। তবে এ লক্ষ্য অনুযায়ী কোনো ঠিকদারই কাজ বাস্তবায়ন করতে পারছে না। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আবদুল মোনেম।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান বলেন, আবদুল মোনেম লিমিটেডের কাজের ধীরগতি সম্পর্কে আমরা অবগত। শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করে তাদের সঠিক সময়ে কাজ শেষ করার জন্য একাধিক চিঠি দিয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবকেও অবহিত করা হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মহাসড়ক


আরও
আরও পড়ুন