Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

চবি যেন জঙ্গলপট্টির জাদুঘর

সোহেল রানা | প্রকাশের সময় : ২০ নভেম্বর, ২০১৬, ৯:৫৪ পিএম

জঙ্গলপট্টির জাদুঘর! চারিদিকে পাহাড়। পাহাড়ের বুক চিড়ে ঝর্ণা। ঝর্ণার পাশেই ঘাস খাচ্ছে হরিণ! আর ছোট্ট লেকে ঝুলন্ত সেতু। পাখির কিচির-মিচির শব্দে মুখরিত বোটানিক্যাল গার্ডেন। ডিসি হিলের সৌন্দর্য ও ফরেস্ট্রির পাহাড় বান্দরবনের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এতো সব অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। যেন এক কল্পিত জাদুঘর। যার নাম হতে পারে জঙ্গলপট্টির জাদুঘর। পথ চলতেই যে কারো চোখ আটকে যায় এর যে কোন অংশের উপর ।
সাটল ট্রেন : চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কি:মি: দূরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। তাই শিক্ষার্থীদের শহর থেকে ক্যাম্পাসে চলাচল করতে হয় শাটল ট্রেনে। সারা বিশ্বে মাত্র দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ট্রেন সার্ভিস। যার একটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাটল। ২৬ বছর আগে ১৯৮৪ সালে চালু হয় এই সাটল সার্ভিস। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি মুখরোচক কথা প্রচলিত আছে। চবিতে পড়বেন আর শাটলে চড়বেন না তা কি হয়। নিজের অজান্তেই শাটল ঘিরে নানা মজার স্মৃতি জড়িয়ে যায় দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। যার ফলে শিক্ষা জীবনের সমাপ্তিতে শাটল ছুঁয়ে চোখের জল ফেলতে দেখা যায় অনেক শিক্ষার্থীকে। শাটল দিয়েই শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দ শুরু হয়।
কাটাপাহাড় রাস্তা : শাটল থেকে নেমেই শিক্ষার্থীদের হই হুল্লোর করে ছুটে চলা কাটা পাহাড়ের রাস্তায়। এ রাস্তায় পা ফেলতেই লাগে অদ্ভুত শিহরণ। দুই পাশের বিশাল পাহাড়। পাহাড়ের বুকে কাশ ফুল! মাঝখানে পাকা  রাস্তা। সেই রাস্তার দুই পাশে ড্রেন যেখানে প্রায় ২৫০ প্রজাতির ব্যাঙ দেখা যায়। অনেক সময় পাড়াড়ের চূড়ায় হরিণ কিংবা কাঠ বিড়ালীদের দৌরাদৌড়ি দেখে শিক্ষার্থীদের আনন্দে লুটোপুটি খেতে হয়।  এ সবকিছু দেখে ভালো না লাগার উপায় নেই।
শহীদ মিনার ও গ্রন্থাগার ভবন : কাটা পাহাড়ের রাস্তার সামনে এগুলোই চোখে পড়বে শহীদ মিনার। বৃহৎ শহীদ মিনারটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় তুলে ধরে। তার কিছু সামনে সৃদৃশ্য এক খ- টিলার ওপর গ্রন্থাগার ভবন। যা দেখেই চোখের তৃপ্ততা পেতে সময় লাগে না।
জাদুঘর : রাজা আছেন, আছেন রানীও। ঢাল, তলোয়ার, কামান সবই আছে সাজানো গোছানো। রাজা-রানী থাকার পালঙ্কও আছে এক কোণে। শুধু এসবই নয় প্রতœত্ত্বাতিক নির্দশন আর হাজার বছরের বাঙালী ঐতিহ্যের নানা সব দুর্লভ জিনিস নিয়ে সাজানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের চিত্র এমনই। ১৯৭৩ সালের ১৪ জুন চট্টগ্রাম শহরের শিল্পকলা একাডেমীতে স্বল্প পরিসরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট স্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ভবনের পশ্চিম পার্শ্বে বড় কলেবরে দ্বিতল ভবনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে চবি জাদুঘর। যা নতুন ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীদের কৌতূহল অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়।
পাহাড়ী ঝর্ণা : বিশ্ববিদ্যালয় চাকসু ভবন থেকে ডান পাশে চলে গেছে পাহাড়ী রাস্তা। সেখানে গিয়ে দেখা যায় অঝোর ধারায় ঝরছে পানি। যেথায় কেউ উদাম গায়ে করছেন গোসল। কেউবা পানিতে ভিজে একাকার। এ যেন ঝর্ণা দেবীর শরীর জুড়ে ছুঁয়ে পড়ছে সৌন্দর্য্য। এখানে আসলেই মনে হবে চলে এসেছি মাধবকু-ে। সেই ঝর্ণার কাছে, যেখানে পানির শব্দে আনন্দের খেলা চলে অবিরাম।
ঝুলন্ত সেতু : প্রাকৃতিক সৈান্দর্য পাহাড় আর সবুজের অপরূপ মিলন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহীদ মিনার থেকে ২০০ গজ উত্তরে গেলে দেখা যাবে সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের সামনে কিছু ছেলে-মেয়ে হৈ চৈ করছে। কাছে গিয়ে দেখবেন এক খ- রাঙ্গামাটি! “রাঙ্গামাটির সেই ঝুলন্ত সেতু শুধু সেখানেই নয় আছে এই ক্যাম্পাসেও! সেতুতে দাঁড়িয়ে দোল না খেলে আমাদের চলেই না।” ঝুলন্ত এ সেতুকে নিয়ে এমনই মন্তব্য ইতিহাস বিভাগের নিশাদ সালমার। এখানে দাপাদাপি করেন প্রায় সবাই। এ যেন শৈশবে ফিরে যাওয়ার দুরন্ত তারুণ্য।  
কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ : কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের বৈকালিক পরিবেশটা চমৎকার। এখানে আইন বিভাগের সামনে থেকে সুর্যাস্ত দেখার দৃশ্যটা কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। অনেকে আবার সবুজ ঘাসের উপর গড়াগড়ি খায়। ‘মনে হয় সুইজারল্যান্ডে আছি। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। চোখ আটকে যায় যে দিকে তাকাই।’ এমনই মন্তব্য মাঠে শুয়ে থাকা বারেক, আশরাফ, সারোয়ার  ও সোহেল পাটোয়ারীর।
বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা : পাহাড়ি ছাত্রদের থাকার জন্য গড়ে উঠেছে ছাত্রাবাস। কিন্তু এরসঙ্গে আরো একটি বিষয় সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে তা হলো প্যাগোডা। লাল ইটের গাথুনি এই মন্দিরকে নিয়ে গেছে অন্য রকম সৌন্দর্যের জায়গায়। শিক্ষার্থী ছাড়াও প্যাগোডার সৌন্দর্য দেখতে আসে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দর্শনার্থীরা।
গোল পুকুর : ক্যাম্পাসের দক্ষিণে গেলে চোখ জুড়িয়ে যায় গোল পুকুরের নীল পানিতে। তবে সেখানে যাবার রাস্তাটাও অদ্ভুত। সুড়ঙ্গ পথের মতো দুই পাশে গাছ আর পাহাড়। সেখানে ঠা-ায় গা কেঁপে উঠে। পুকুরের চার পাশে বসার জায়গা থাকায় প্রেমিক জুটিদের নিরিবিলি পরিবেশে গল্প করতে দেখা যায়।
ক্যাম্পাসের বন্য প্রাণী : ফরেস্ট্রি হোস্টেলের দিকে যেতে হঠাৎ যে কেউ চিৎকার করে উঠতে পারেন। আরে এ যে হরিণ! বিকেলে পাহাড় থেকে নেমে আসা দুই একটি চিত্রা হরিণ ক্যাম্পাসের আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আবার কখনোবা গাছে ঝুলে থাকা সাপ দেখে অবাক হন অনেকেই। কেউবা বানরের ভেংচি কাটাতে হেঁসে হন লুটোপুটো। কখনো গাছের মগ ডালে কাঠ বিড়ালিদের লাফা লাফি দেখে বিস্ময় লাগে।
বোটানিক্যাল গার্ডেন : শহীদ মিনারের বাম পাশের পথ ধরে দক্ষিণ দিকে কিছুক্ষণ হাঁটলেই চোখে পড়বে বোটানিক্যাল গার্ডেন। এখানে সারি সারি ফুলের গাছ। আছে অনেক প্রকার ঔষধি গাছও। শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই এখানে ঘুরতে আসে দল বেধে। কেউবা আবার পিকনিক করে মেতে উঠে হাসি আর গানে। এখানেই পাওয়া যাবে বিরল প্রজাতির অর্কিডের সন্ধান।
ডিসি হিলের সৌন্দর্য : লেডিস হলের সামনের উপরে সুউচ্চ পাহাড় বেয়ে যে রাস্তাটি  উঠে গেছে তা ভিসি হিল নামে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির থাকার জন্য একটি বাড়ি আছে এখানটাই। এটি ক্যাম্পাসের সবচেয়ে উঁচু জায়গা। এখান থেকে দাঁড়িয়ে পশ্চিমে চোখ দিলে দেখা যাবে অন্য রকম প্রাকৃতিক দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে শিল্পীর আঁকা কোন চিত্র। দূরে দাঁড়িয়ে আছে সূর্য। তার ডুবে যাওয়া আলোতে পাহাড়ি পরিবেশের চিত্রও অন্যরকম। কিছু লোক আবার ব্যস্ত থাকেন এর ঢালু জমিতে ফসল ফলাতে। এসব পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া।
শেষ : ক্যাম্পাসের এতোসব বর্ণনায় যে কারোই মন চাইবে অন্তত জঙ্গলপট্টি নাম নেয়া জাদুঘরময় পাহাড়ি ক্যাম্পাস দেখতে। এমন জাদুঘরময় ক্যাম্পাসকে আরো আকর্ষণীয় করতে বিশেষ পরিকল্পনাও আছে কর্র্তৃপক্ষের।
ভিসির কথা : এ নিয়ে ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ জানান তার পরিকল্পনার কথা, “প্রাকৃতিক কারণে ভৌগলিকভাবেই সুন্দর হয়ে সৃষ্টি হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যাল। ছাত্র-শিক্ষকসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ক্যাম্পাসের বৈচিত্র্যতা ধরে রাখা সম্ভব। সৌন্দর্য বর্ধনে আমাদের আরো বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে।”




 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।