Inqilab Logo

বৃহস্পিতবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ০৩ ভাদ্র ১৪২৯, ১৯ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

পর্দা উঠতে যাচ্ছে আজ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : যুক্ত হতে পারে ২৫০ এজেন্সি ঢাকায় আজ মন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক

শামসুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ২ জুন, ২০২২, ১২:০০ এএম

অবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের পর্দা উঠতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল গতকাল রাতে ঢাকায় এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ।
আজকের বৈঠকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর প্রস্তাবিত সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির সাথে প্রায় ২৫০টি এজেন্সি যুক্ত হয়ে কর্মী প্রেরণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, উভয় দেশের সম্মতিক্রমে রফতানি শুরু হলে এবার মালয়েশিয়ায় প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী যেতে পারবে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ছয় লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি চালু না হওয়ায় বহু নিয়োগকারী কোম্পানী চাহিদাপত্র ইস্যু করেও কর্মী নিতে পারছে না। ইতোমধ্যে নেপাল থেকে প্রচুর সংখ্যায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে না পারলে নিয়োগকর্তারা নিরুপায় হয়ে নেপাল থেকে একচেটিয়া অভিবাসী কর্মী নেয়ার পথ খুঁজবে। এদিকে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসাইন গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, মালয়েশিয়ার সুপ্রিম উড এন্টারপ্রাইজ গত ২১ ফেব্রুয়ারি এবং স্কাই উড এসডিএন বিএইচডি’ গত ২৪ এপ্রিল তাদের এজেন্সির মাধ্যমে ১৫ জন সাধারণ কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র ইস্যু করেছে। মালয়েশিয়ার আরো একাধিক নিয়োগকর্তা সাধারণ কর্মী নেয়ার জন্য একাধিক চাহিদাপত্র ইস্যু করেছে।

মালয়েমিয়ায় কর্মী প্রেরণের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হাজার হাজার মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মী বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সিতে প্রতিনিয়ত ধরণা দিচ্চেণ। সম্প্রতি সোনারগাঁও হোটেলে বায়রা সম্মিলিত গণতান্ত্রিক জোটের প্যানেল প্রধান ও বায়রার সাবেক মহাসচিব মো. রুহুল আমিন স্বপন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের দাবিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ঘোষণা করেছেন দেশটিতে যে কোনো প্রক্রিয়ায় জনশক্তি রফতানি শুরু হলে সকল রিক্রুটিং এজেন্সিই কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। তিনি কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং দেশের স্বার্থে অনতিবিলম্বে দেশটির শ্রমবাজার উন্মুক্ত করণে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

দশ সিন্ডিকেটের অনৈতিক কর্মকান্ডের দরুণ দেশটিতে ২০১৮ সাল থেকে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। বৈশ্বিক করোনা মহামারীর পর মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে অভিবাসী কর্মীর অভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির শিল্প কারখানার মালিকরা বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বিভিন্ন কোম্পানী প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদফতরে কাগজপত্র জমা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগের পর ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুরে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী কোম্পানীগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের যাতায়াতের বিমান ভাড়া বহন করবে। উল্লেখিত চুক্তি স্বাক্ষরের পর শিগগিরই কর্মী প্রেরণ শুরুর কথা থাকলেও সীমিত সংখ্যাক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের প্রস্তাব আসায় দুই দেশের মতানৈক্যে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া গত ছয় মাস ধরে ঝুলে রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা নেই। মালয়েশিয়া যে প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগের কথা বলেছে, সেটাতে বাংলাদেশ একমত হতে পারেনি বলেই জনশক্তি রফতানি বিলম্ব হচ্ছে।

বাংলাদেশ যে কয়টি দেশে জনশক্তি রফতানি করে তার মধ্যে অন্যতম মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। একসময় দেশটিতে বিভিন্ন কাজ নিয়ে লাখ লাখ কর্মী যেতেন। পরে দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ থেকে দুইবার কর্মী নেয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া। সবশেষ ২০১৮ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। ওই সময় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম আর দুর্নীতি করে কর্মী পাঠানোর অভিযোগ আনে মালয়েশিয়া।

ওই সময়ে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়া হয়। রিক্রুটিং এজেন্সি ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেড, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, আল ইসলাম ওভারসিজ, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, ক্যারিয়ার ওভারসিজ কনস্যালট্যান্টস লিমিটেড, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস ও শানজারি ইন্টারন্যাশনাল সিন্ডিকেট তৈরি করে কর্মী পাঠানো শুরু করে। এদের কারণে মালয়েশিয়া যেতে একেকজন কর্মীকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় আর নানা ধরনের দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তা বেশিদিন এগোয়নি। তারপর কেটে যায় সাড়ে তিন বছর।

এরপর নানান দেনদরবার করে পুনরায় শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়া সরকারের মাধ্যমে এবার মাত্র ২৫টি এজেন্সির সঙ্গে ২৫০ সাব-এজেন্সির তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে সরকারকে। পাশাপাশি দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানান ১৪ জুলাই এক চিঠিতে সুপারিশ করা হয়, যেন এই প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশ কর্মী পাঠায়। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ১৮ জানুয়ারি এক চিঠিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে, তা আর পুনরায় হবে না। আর এ নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হওয়ায় বিষয়টি ছয় মাস ধরে ঝুলে রয়েছে।
মন্ত্রী ইমরান আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা দ্রুত মার্কেটটা খুলতে চাই। জানুয়ারির পর থেকে কয়েকবার তারিখ সেট হয়েছে, কিন্তু মালয়েশিয়ার অনুরোধেই তারিখ বারবার পরিবর্তন হয়েছে। যেসব কারণে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি ঝুলে আছে, সেসব বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো ছাড় দিচ্ছে কি না? এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গিভ অ্যান্ড টেক তো থাকেই। আমি সবসময় আমাদের কর্মীদের স্বার্থ দেখেছি।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে সকল প্রক্রিয়া শেষ করে রেখেছে মালয়েশিয়া। সেখানে বাংলাদেশের অংশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া এখনো দৃশ্যমান হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তারিখ চূড়ান্ত হলে প্রক্রিয়া শুরু করতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। সকল প্রস্তুতি রয়েছে। বিকেলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমদ মনিরুছ সালেহীনের সাথে একাধিক বার যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।

অফরদিকে আজকের বৈঠকের জন্য মালয়েশিয়ার সফররত প্রতিনিধি দলের মধ্যে রয়েছেন মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ইপ-সচিব জেনারেল (অপারেশন) দাতুক মুহাম্মদ খাইর রাজমান বিন মোহাম্মদ আননুওয়ার, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক জেনারেল তুন হাজী আশরি বিন আ. ওহমান, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক সচিব দাতুক কামারুলআজলান বিন মোহাম্মদ হানাফিয়া ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী বিভাগের প্রিন্সিপাল সহকারী সচিব তুন হাজী শাহাবুদ্দিন বিন আবু বকর।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ