Inqilab Logo

বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী
শিরোনাম

উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা

রেজাউল করিম রাজু | প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০২২, ১২:০৩ এএম

উত্তরাঞ্চল বা বরেন্দ্র অঞ্চল বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক বিশাল অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। জনপদটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাল, সেন, গুপ্ত, কুষান, সুলতানী, মোঘল, ডাচ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বৃটিশ আমলের অজস্র ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

এসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। চেনা জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। যদিও অনেক কিছুই কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেকগুলো শুধু নাম নিয়ে টিকে আছে। সেসব স্থানের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া প্রাচীন ইট, কষ্টিপাথরের মূর্তি মৃতশিল্পের টুকরো জানান দেয় অতীত ইতিহাসের কথা।

মাইলের পর মাইলজুড়ে আম্রকাননের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। শিবগঞ্জের সঙ্গে ভারতসীমান্ত। ওপারে রয়েছে বড় সোনা মসজিদ। আর এপারে ছোট সোনামসজিদ, যা সুলতানী আমলের স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। এটি ১৪৯৩ থেকে ১৫১৮ এর মধ্যে সুলতান হুসেইন শাহ নির্মাণ করেন। এখানে বীর শ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের কবর রয়েছে। কাছেই রয়েছে সুফী সাধক হযরত শাহ নেয়ামত উল্লার মাজার। পাশে আছে মসজিদ ও লম্বা দিঘীর পাড়ে তাহাখানা। রয়েছে দারাস বাড়ি মসজিদ, খনিয়া দিঘী মসজিদ, ধনিয়া চকমসজিদ, চল্লিশ কক্ষ বিশিষ্ট মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ। শুধু মসজিদ-মাজার নয়, অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রহনপুর বুরুজ ও নওদা গ্রামে উঁচু ঢিবির মাঝে লুকিয়ে আছে প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে বিরাট নগরীর অতীতের প্রমাণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সাথে এখানকার মাসকলাইয়ের রুটি আর চমচমের সুখ্যাতি অনেক।

রাজশাহীর দরগা পাড়ায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহমখদুম (র.) তুরকান শাহ-সহ অনেক সুফি সাধক। বাংলাদেশের প্রাচীনতম মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম বাঘা মসজিদ। এখানে শায়িত আছেন হযরত মওলানা শাহ মোয়ায্যেম উদ-দৌলা ওরফে শাহ দৌলা। মসজিদ ও মাজারের সাথে রয়েছে বিশাল দিঘী। রয়েছে চারঘাটে বাংলাদেশের একমাত্র দৃষ্টিনন্দন পুলিশ একাডেমি। পুঠিয়ায় রয়েছে করম আলী শাহের মাজার। বিশালকারের সুউচ্চ ও বহুগুচ্ছ চূড়া বিশিষ্ট পুঠিয়ার পঞ্চরত্ন মন্দিরটি স্থাপত্য শৈলিতে অনন্য। সম্প্রতি রাজবাড়ি যাদুঘর ও মন্দির সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।

রাজশাহী নগরীকে গড়ে তোলা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দনভাবে। মরা পদ্মার তীরকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি রাজশাহী যে কোন মানুষের নজর না কেড়ে পারে না। এখানেও আম, মাসকলাইয়ের রুটির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন রসনা মেটাতে প্রস্তুত। রয়েছে চোখ জুড়ানো নকশার সিল্ক।
নাটোরে রয়েছে দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি। রয়েছে উত্তরা গণভবন। মিনি কক্সবাজার খ্যাত বিলহালতির পাশে রয়েছে গ্রিনভ্যালি। আর এখানকার কাঁচাগোল্লার স্বাদ না নিলে অসম্পূর্ণতা থেকে যাবে। নওগা জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পাঁচ টাকার নোটে দৃশ্যমান মান্দার কুসুম্বা মসজিদ। বিদ্যোৎশাহী নরপতি ধর্মপাল দেবের নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ স্থাপত্য সৌধ সোমপুর বিহার বা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বলিহার রয়েছে বাদলগাছি উপজেলায়। রাজবাড়ি, পত্নীতলার দিব্যক স্তম্ভ, জলছড়া বিহার, আলতাদিঘীও পর্যটকদের টানে। রয়েছে পতিসরে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারিবাড়ি। আগে নওগাঁ গাঁজা চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল, তবে তা নিষিদ্ধ হবার পর এখন ধানের পর আম বাগানের বিস্তৃতি বাড়ছে।

পাবনার বিশাল চলনবিলের রূপ পর্যটকদের কাছে টানে। দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতাল (পাগলা গারদ) মনটা উদাস করে দেয়। অনুকুল ঠাকুরের আশ্রম ভক্তদের অতিপ্রিয়। রেলের আবাসভূমি ঈশ্বরদি পাকশী। হার্ডিঞ্জ সেতু, লালনশাহ সেতুর সাথে যুক্ত হয়েছে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখানে কর্মরত রাশিয়ানদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এক টুকরো রাশিয়ান গ্রাম। প্রতিদিন এখানে বেড়াতে আসছে হাজারো মানুষ। তাঁতের জন্য এখনো সুনাম ধরে রেখেছে পাবনা। সিরাজগঞ্জকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু) পাশে নির্মিত হচ্ছে রেলসেতু। গড়ে উঠেছে ইকোপার্ক। রয়েছে ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মাজার। শাহজাদপুরে মাহমখদুম মসজিদ চাটমোহরে শাহী মসজিদ, হুন্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির ও দৌচালা মন্দির, সিরাজগঞ্জের শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি, এখন রবিন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

বগুড়ার মহাস্থানগড় বাংলার প্রাচীনতম নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম। পন্ড্রুনগরীই বর্তমানকালে মহাস্থান নামে পরিচিত। এ অঞ্চলের বড় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। মহাস্থানকে ঘিরে রয়েছে অনেক কাহিনী। এখানে সুলতান মাহী সাওয়ারের মাজার রয়েছে। মহাস্থানে রয়েছে শেষ অধিপতি পরশু রামের প্রাসাদ ও জীবনকূপ। প্রবাদ মতে, একূপের পানির স্পর্শে নাকি মরা দেহে প্রাণ ফিরে আসত। মাহী সাওয়ারের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের নাকি রাজা পরশুরাম কূপের পানির সাহায্যে জীবন্ত করতেন। দরবেশ মাহী সাওয়ার চিলের মাধ্যমে কূপের মধ্যে গোমাংস নিক্ষেপ করলে কূপের পানি কার্যকারিতা হারায়। রয়েছে শিলাদেবীর ঘাট, বাংলার বহুল প্রচলিত লোকগাথা বেহুলা লক্ষীন্দরের কাহিনীর গোকুল মেড়। বেহুলার বাসরঘর, নেতাই ধোপানীর ঘাট। শিলাদেবীর ঘাট এসব নিয়ে চিত্তাকর্ষক গল্পও কম নয়। মহাস্থান নিয়ে অল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। ভীমের জাঙ্গালের বিস্তৃতি রংপুর পর্যন্ত। শুধু মহাস্থান নয়, গড়ে উঠেছে অনেক নতুন স্থাপনা। করতোয়া তীরে টিএমএসএসের রিসোর্ট। মহাস্থানের কটকটি আর বগুড়ার দইয়ের কথা না বললেই নয়। বগুড়ার সাথে লাগোয়া জেলা জয়পুরহাট, মহাস্থানের পাশপাশি বলে এখানে রয়েছে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রয়েছে নিমাই পীর ওরফে নাসির উদ্দীন পীরের দরগা। রয়েছে লাকমা রাজবাড়ি, পাথরঘাটা, নান্দাইল দিঘার মত দর্শনীয় স্থান। হালের প্রিন্সের চাতালেও ভিড় জমায় মানুষ।

রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম ক’বছর ধরে বাজার মাত করে আম রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমন্ত্রণ জানাচ্ছে আম বাগানে এসে বাগান দেখা আর খাবার মজা নিতে। এই রংপুর ঘিরে রয়েছে অনেক কথা আর দর্শনীয় স্থান। নাথ সাহিত্যেও সুবিখ্যাত গাঁথা গোপীচন্দ্রের সন্যাস। লোককাহিনীর রাজা হবুচন্দ্র আর তার মন্ত্রী গবুচন্দ্রকে নিয়ে হাস্যরসে ভরা মুখোরচক গল্প কাহিনী। অন্যান্য প্রাচীন কীর্তির মধ্যে বেশকটি দূর্গের কথা জানা যায়, যার মধ্যে রাজা নীলশ্বরের দূর্গ, লোহানিপাড়া বিহার, কাটা দুয়ার দূর্গ ইত্যাদি। রয়েছে শাহ ইসমাইল গাজীর মাজার, কেরামত আলীর মাজার, শাহজালাল বোখারীর দরগা। রংপুর অঞ্চলে ইসমাইল গাজী সম্পর্কে অনেক কথা প্রচারিত রয়েছে। মিঠা পুকুরে মোঘল আমলের একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদ সংলগ্ন দীঘির নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয়েছে মিঠাপুকুর। রয়েছে বেগম রোকেয়ার বাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয় তাজহাট জমিদার বাড়ি, ভিন্নজগতসহ অনেক দর্শনীয় স্থান।

গাইবান্দার নাম নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। গাইবান্দার বোগদাহ সাহেবগঞ্জ এলাকায় ত্রিশ বর্গকিলোমিটারজুড়ে এক সময় বিশাল নগরীর অস্তিত্ব ছিল। সাহেবগঞ্জ আখ ফার্মের জন্য বুলডোজার চালানোর ফলে সবকীর্তি নষ্ট হয়ে যায়। বোগদা-সাহেবগঞ্জ বিরাটনগরও অস্তিত্ব হারিয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের কুঠিবাড়ি, পলাশবাড়ি এডুকেশন পার্ক বালাসীঘাটে ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করে।

কুড়িগ্রামের সেই চিলমারীর বন্দর আজো হৃদয়ে ঝড় তোলে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ী চিলমারীর বন্দরে’। এখানকার ছিটমহলগুলো মানুষকে টানে। বীর প্রতীক তারামন বিবির বাড়িও কুড়িগ্রামে। রয়েছে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, শাহী মসজিদ।

লালমনিরহাট জেলার সৈয়দপুর রেলের কারখানা এখনো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি ছিটমহল এ জেলায়, যা অন্যরকম অনুভূতি যোগায়। নীলফামারীতে এক সময় বৃটিশরা নীলের চাষ করতো বলে এর নাম হয়েছে নীলফামারী। এখানকার নীল সগার, ময়নামতি দূর্গ, মীরজুমলার মসজিদ, সিন্দুরমতি দিঘী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে লুকিয়ে আছে অনেক ইতিহাস।

দিনাজপুর জেলার অতীত ইতিহাস অনেক লম্বা। এখন কাটারীভোগ চাল আর চিড়া রসালো শাসালো লিচু আর ফজলী আম ভোজন রসিকদের মুখে পানি আনে। দিনাজপুরে রামসাগর, কান্তাজীর মন্দির, চেহেল গাজীর মাজার-মসজিদ, সুরা মসজিদ, মুল্লুক দিওয়ানের মাজার-দিঘীসহ অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শালবন বিহার, হালের স্বপ্নপরী মানুষদের টানে।

ঠাকুরগাঁ জেলাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস। যার মধ্যে বাংলাগড়, নেকমরদ ও গড়গ্রাম। এখানে শায়িত রয়েছেন শেখ নাসির উদ্দীন নেকমরদ। এখানে বড় মেলা বসে। এখানে আছে গোরাইকূপ ও মন্দির, কোরামখানগড়, কোয়েলী রাজারগড় ও মহলবাড়ি মসজিদ। এসব স্থানে পর্যটকরা ভীড় জমায় বছরজুড়ে। উত্তরের শেষ জেলা পঞ্চগড়। এলাকাটি বৃটিশ আমলে জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বোদা, তেতুলিয়া ও দেবীগাওসহ পঞ্চগড় থানা দিনাজপুর জেলার সাথে যুক্ত হয়। পরে পঞ্চগড় আলাদা জেলা হিসাবে রূপ পায়। পঞ্চগড় থানায় পাঁচটি দূর্গ বা গড় থাকায় এর নাম হয় পঞ্চগড়। ভিতরগড় ছাড়া অন্যগুলো হলো বোদেশ্বরীগড়, হোসেনগড়, মীরগড়। সমতল ভূমির চা বাগান আর হিমালয়ের কন্যা পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্গা দেখা অন্যরকম অনুভূতি জাগাবে।

উত্তরাঞ্চলের কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে আলোকপাত করা এর বাইরে বহু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অনেক স্থাপনা অযত্নে অবহেলায় অস্তিত্ব হারাচ্ছে। সরকারের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ বিভাগ নামে একটি দপ্তর থাকলেও তাদের সীমাবদ্ধতা কম নয়। ফলে কার্যক্রম জোরদার করতে পারেনি। পুরো উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো স্থান। সারা বছরজুড়ে আনাগোনা করতে পারে পর্যটকরা। এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে পর্যটন।

লেখক: ইনকিলাবের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা
আরও পড়ুন