Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

জাতীয় উন্নয়নের পূর্ব শর্ত নারী উন্নয়ন

ফরিদুল হক খান | প্রকাশের সময় : ২৩ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও এদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ এখনো নারীর প্রতিকূলে। সমাজে নারীরা এখনো নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই বীভৎস সমাচার। নারীর ওপর হিংস্র আক্রমণ। যৌন পীড়ন। তার শারীরিক-মানসিক লাঞ্ছনা। নারী ঘরে-বাইরে-কর্মক্ষেত্রে-শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রায় সর্বত্র চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। যুবতী, কিশোরী, বালিকা, কন্যাশিশু, পূর্ণবয়স্ক কেউই রেহাই পাচ্ছে না পাশবিকতা থেকে। নারীর ওপর হিংস্র আক্রমণের ইতিহাস অতিশয় প্রাচীন হলেও বর্তমান সভ্য, আধুনিক, অগ্রগামী সমাজে এমনটি মেনে নেয়া দুরূহ। বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট একটি বা দুটি নয়, প্রায় সর্বত্র। নারী এবং নির্যাতন শব্দ দুটি যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একজন নারীর সামাজিক নিরাপত্তা এখানে পদে পদে বিঘিœত। কিন্তু তারপরও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় নারীর ক্ষমতায়ন এবং অধিকারের প্রশ্নে আমাদের অর্জনকে একেবারে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ যেমন বেড়েছে, তেমনি ক্ষমতায়নেও তাদের অবস্থান আগের চেয়ে ইতিবাচক।
জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম পূর্ব শর্ত হচ্ছে নারী উন্নয়ন। বর্তমান সরকার নারীর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অতীতে আমাদের সমাজে নারীশিক্ষার বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। কিন্তু নারী উন্নয়নে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার ফলে আমাদের দেশে নারী শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই চিহ্নিত করে।
একথা বলতেই হবে, বাংলাদেশে নারীর অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় অর্জন। কোনো সন্দেহ নেই, গত ২০ বছরে দেশের নারীরা অনেক সামনে এসেছেন। আমাদের দেশের নারীরা সর্বক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখন সেনাবাহিনীতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিমান চালাচ্ছেন। নারীরা কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল। গার্মেন্টসে নারীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এখন সব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছেন।
নারী-পুরুষ নিজ অবস্থানে সমুজ্জ্বল। পরিবার ও সমাজে কন্যা-জায়া-জননী হিসেবে নারীর ভূমিকা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একই সঙ্গে নারীর মানবিক মর্যাদা ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। আসলে একটি আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের আলাদা আলাদা ভূমিকার কথা চিন্তাও করা যায় না। নারী-পুরুষ কেউ কারও প্রতিপক্ষ তো নয়ই, বরং একে অপরের পরিপূরক। সমকালীন বিশ্বে নারী নেতৃত্ব অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কথা আরও সত্যি। এ দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেত্রীও নারী। সরকার, প্রশাসনসহ বিভিন্ন পেশায় নারীদের অবস্থান সুদৃঢ়। নারীরা পুরুষের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নারীরা অগ্রগণ্য। কিন্তু তারপরও কোন কোন ক্ষেত্রে নারী এখনও বৈষম্যের শিকার। নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেলেও দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীসমাজ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। যৌতুকসহ নানাবিধ কারণে এখনও অনেক নারীকে নির্যাতিত হতে হয়, কখনও কখনও জীবনও দিতে হয়। কর্মক্ষেত্রেও নারীর বৈষম্য সেভাবে কমেনি। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকারও নারীÑ এমন অভিযোগ প্রায়শই ওঠে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অন্যতম গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী। আর কৃষিক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ তো সেই অতীত থেকে। কর্মজীবী নারীকে অনেক ক্ষেত্রে পোহাতে হয় নানা ভার।
এদেশে এখনো নারীদের সমস্যা বহুবিধ। পরিবার, সমাজ, বাইরের কর্ম জগৎ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার আদায়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মান্ধতা এবং অশিক্ষার কারণেও নারী তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নারীর মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈষম্য আমরা দেখছি। এছাড়া যৌতুক, বাল্যবিবাহ, একাধিক কন্যাসন্তানের জš§দান নিয়ে স্ত্রী তালাক, পারিবারিক সহিংসতা, এসিড নিক্ষেপ বা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার ঘটনাক্রমেই বাড়ছে। আমি মনে করি নারীর সত্যিকার উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।
ষ লেখক : সংসদ সদস্য, জামালপুর-২



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।