Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯, ১০ মুহাররম ১৪৪৪ হিজরী

বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক | প্রকাশের সময় : ২২ জুন, ২০২২, ১২:০০ এএম

স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বন্যায় ভাসছে বাংলাদেশ। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ হাওর অঞ্চলগুলো এখন পানির নিচে। ইতোমধ্যে অন্যান্য জেলাও বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা এই বন্যা আরো বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে আল্লাহর দিকে খুব বেশি রুজু করা এবং কর্তব্য-সচেতন হওয়া জরুরি। বায়ু আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহরই হুকুমে তা প্রবাহিত হয়। পানি আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহরই হুকুমে তা বর্ষিত হয়। বায়ু ও পানি ছাড়া যেমন মানুষের জীবন অচল তেমনি এই পানি-বায়ুই হতে পারে তার জীবননাশেরও কারণ। আল্লাহর হুকুমের কাছে মানুষ কত অসহায়। তবু মানুষ গর্ব করে। অহঙ্কারে লিপ্ত হয়। এই অহঙ্কারেরই এক দিক হলো, বিপদাপদেও সচেতন না হওয়া, আল্লাহমুখিতা অবলম্বন না করা।

প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহরই হুকুমে তা পরিচালিত। কাজেই আল্লাহর দিকে রুজু করা এবং তাঁর কাছে মুক্তির উপায় অন্বেষণ করা মুমিনের কর্তব্য।
আল্লাহর হুকুম দুই প্রকারের : প্রাকৃতিক হুকুম এবং করণীয়-বর্জনীয়ের হুকুম। জীবন ও জগতে আল্লাহর ইচ্ছাই কার্যকর, তাঁর ইচ্ছাকে রদ করার কেউ নেই। জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনে এই সত্য পুনঃ পুনঃ প্রকাশিত। কাজেই তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা কর্তব্য। বিপদাপদ আল্লাহরই তরফ থেকে- এই উপলব্ধি মানুষের মনে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে। আর আল্লাহর ভয়ই পারে মানুষের কর্ম ও আচরণকে সংশোধন করতে।

যে বান্দা ক্ষণস্থায়ী জীবনের নানা দৃষ্টান্ত থেকে আল্লাহর পরিচয় লাভ করে এবং তাঁর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে সে চিরস্থায়ী জীবনে মুক্তি ও সফলতা অর্জন করে। পক্ষান্তরে যে গাফিল ও উদাসীন থাকে এবং অবাধ্যতা ও নাফরমানির মধ্যে সময় কাটায় সে চিরস্থায়ী জীবনে ব্যর্থ ও বন্দি হয়। কাজেই মানুষের কর্তব্য, জীবন ও জগতে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো থেকে শিক্ষা ও উপলব্ধি অর্জন করে নিজ করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং আল্লাহর ফরমাবরদারীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা।

আল্লাহর হুকুমে মানুষ যখন বিপদাপদে আক্রান্ত হয় তখন তার অসহায়ত্ব প্রকাশিত হয়ে পড়ে, ওই সময় আল্লাহ মহানের দিকে প্রত্যাবর্তন তার জন্য সহজ হয়ে যায়। কাজেই এ সময় আল্লাহমুখী হওয়াই স্বাভাবিকতা এবং এটিই মুমিনের গুণ। আর এ অবস্থাতেও আল্লাহর দিকে রুজু না করা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এ বিপদের চেয়ে এটা বড় বিপদ। কোরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে : অতপর যখন তাদের কাছে আমার (পক্ষ হতে) সঙ্কট আসল, তখন তারা কেন অনুনয়-বিনয় করল না? বরং তাদের অন্তর আরো কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল তাদের কাছে শয়তান তা শোভনীয় করে দিলো। (সূরা আনআম : ৪৩)।

বিপদাপদে দ্বিতীয় করণীয় হচ্ছে, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কে জানে, আগামীকাল আমার ওপরও বিপদ আসবে না? এই বিপদ যেমন আল্লাহর হুকুম তেমনি বিপদে বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোও আল্লাহর হুকুম। কাজেই এই সময় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বড় উপায়। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ঐ পর্যন্ত বান্দার সাহায্যে থাকেন যে পর্যন্ত বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে’। কাজেই বিপদাপদে যে অন্যের পাশে দাঁড়ায় সে আল্লাহর কৃপাধন্য হয়ে যায়।

আল্লাহ তো কারো মুখাপেক্ষী নন। সর্ব প্রকার মুখাপেক্ষিতা থেকে তিনি চিরমুক্ত। তিনি ইচ্ছে করলে এইসব বিপদাপদে কিছুই হত না। কিন্তু দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে তিনি বানিয়েছেন সুখ-দুখঃ এ দুয়ের সমষ্টি। যাতে মানুষ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার করণীয় পালন করে এবং চিরস্থায়ী জীবনের নাজাত ও নাজাহ-মুক্তি ও সাফল্য অর্জন করে।

এখন দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কর্তব্য, বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসা। বিপদগ্রস্ত মানুষ অমুসলিম হলেও তার সহযোগিতা কাম্য ও ধর্মীয় বিধানে ছওয়াবের কাজ। এটা তার অনৈসলামিক কর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি নমনীয়তা নয়, এটা সৃষ্টির প্রতি দয়া ও বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এতে দ্বীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে অনমনীয়তা আর বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতির মাঝে কোনো বিরোধ নেই।
ইসলামের এই মানবিক শিক্ষার কারণেই আমাদের দেশের দ্বীনী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখা যায়, শত সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে দুর্গত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে এবং প্রচলিত প্রচার-প্রচারণাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা ও দুস্থ মানবতার পাশে দাঁড়াবার প্রেরণাকে সম্বল করে কাজ করতে।

এক্ষেত্রে তাদের চিন্তায় মুসলিম-অমুসলিমের পার্থক্য থাকে না, দুস্থ বিপদগ্রস্তের সেবা ও সহযোগিতাই লক্ষ্য থাকে। আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতেও দ্বীনী ব্যক্তিত্ব ও দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসবেন এবং আল্লাহর কাছে প্রভূত আজর ও ছাওয়াবের হকদার হবেন।

বন্যাদুর্গতের পাশে দাঁড়াবার এক বড় উপায় হচ্ছে, বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই বিষয়েও সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন আছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে এই উদ্যোগ নিতে পারেন। দেশে এমন অনেক বিত্তবান ব্যক্তি আছেন, যারা ইচ্ছে করলেই শত শত মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারেন। কাজেই সবাই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসলে লক্ষ লক্ষ দুর্গত মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হতে পারে। আল্লাহ তাআলা সকলকে নেক কাজের তাওফীক দান করুন- আমীন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

৯ আগস্ট, ২০২২

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ