Inqilab Logo

বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ০২ ভাদ্র ১৪২৯, ১৮ মুহাররম ১৪৪৪

বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্য বিপর্যয়

| প্রকাশের সময় : ২৪ জুন, ২০২২, ১২:০৮ এএম

বর্ষা আসে, সঙ্গে আসে বন্যা। বন্যা নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়ে। বর্তমানে সিলেটসহ দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় সেখানকার জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বন্যায় মানুষ ও পশুপাখি ভয়াবহ দুর্গতির আশঙ্কায় রয়েছে। আর সিলেটে প্রথম দফা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দ্বিতীয় দফার বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেট অঞ্চল। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হুহু করে বেড়েছে পানি। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের রোগবালাই দেখা যায়। এর মধ্যে পানি ও কীটপতঙ্গ বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবই বেশি। বন্যার সময় ময়লা-আবর্জনা, মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্র এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা একাকার হয়ে এসব উৎস থেকে জীবাণু বন্যার পানিতে মিশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে বন্যায় সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার বেড়ে যায়।

এর মধ্যেই ভয়াবহ বন্যায় সিলেট-সুনামগঞ্জে পানিবন্দি ৪০ লাখ মানুষঃ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকাই প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানি বাড়তে থাকায় এখনো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আর বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য হাহাকারও বাড়ছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রেক্ষাপটেও ছিল সত্তরের ঘূর্ণিঝড় ও ছেষট্টির বন্যার দুঃসহ স্মৃতি। ১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ঙ্করী বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে শুধু লোকই মারা যায় সরকারি হিসাবে ৫ লাখ। ওই বন্যায় উপকূলের ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। খাদ্যশস্য নষ্ট হয় ১২ লাখ ৯৮ হাজার টন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে বন্যায় বিপুল ক্ষতি হয়েছিল। এরপরও বাংলাদেশে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে বহুবার। বিশেষ করে ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮ এবং ২০১৭ সালে প্রায় গোটা বাংলাদেশজুড়ে বড় বন্যা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলায় বন্যা হয়েছে বহুবার।

বন্যার সময়ে যেসব রোগ হতে পারে সেগুলো হচ্ছে:
১. পেটের পীড়া: পেটের পীড়া নানা রকম হয়ে থাকে যেমন:
ক. ডায়রিয়া, কলেরা
খ. ডিসেন্ট্রি (আমাশয় ও রক্ত আমাশয়)
গ. টাইফয়েড
ঘ. ভাইরাল

২. বুকের প্রদাহ: কফ, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস প্রভৃতি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়।
৩. জ্বর: নানা রকম ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল জ্বর হয়ে থাকে।
৪. চর্মরোগ: যেমন- খোস পাঁচড়া, ছত্রাকঘটিত সংক্রমণ প্রভৃতি চর্মরোগ হয়ে থাকে।
৫. চোখের প্রদাহ: যেমন- কনজাংটিভাইটিস, আইরাইটিস ইত্যাদি
৬. সর্প দংশন : নানা রকম সর্প দংশনের ঘটনাও ঘটে থাকে।
৭. বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া: বন্যার সময় শিশুরা অনেক সময় সাঁতার না জানার দরুন পানিতে ডুবে মারা যায়।

বন্যার সময় যেসব কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে, চলুন জেনে নিই:
> অনিরাপদ খাদ্যদ্রব্য: বন্যার পানিতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, মানুষ ও গবাদিপশুর বর্জ্যপদার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। খাদ্যদ্রব্যের সাথে এ পানির সংমিশ্রণ খাবারকে অনিরাপদ এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর করে তোলে।

বন্যার সময় ইলেক্ট্রিসিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার ফলে স্টোরড খাবারও নষ্ট হয়ে যায়। যেকোনো খাবার যদি বন্যার পানির সংস্পর্শে আসে, তাহলে তা খাবার অযোগ্য হয়ে পড়ে।
> দূষিত খাবার পানি: বন্যার সময় নিরাপদ পানির উৎস সমূহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে, নিরাপদ এবং পানযোগ্য পানির মারাত্মক সংকট দেখা যায়। বন্যার পানির সাথে পানিবাহিত রোগেরও তখন আগমন ঘটে। ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতি সমস্যা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

> যথাযথ স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব: বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় টিউবওয়েল এবং টয়লেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বানের পানিতেই প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হয় অধিকাংশ মানুষকেই। আবার এই পানিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়। এভাবে স্যানিটেশন ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে।
> মশার প্রাদুর্ভাব: অবিরাম বর্ষণ এবং বন্যায় মশার বংশবৃদ্ধির হার বেড়ে যায় এবং মশাবাহিত রোগসমূহ যেমন- ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি ছড়িয়ে পরে।

> মোল্ড : বন্যাদূর্গত মানুষজন যাদের এলার্জি অথবা হাঁপানি আছে, তাদের জন্য মোল্ডের (জীবাণুর বিশেষ অবস্থা) সংস্পর্শ বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিভিন্ন ধরনের শ্বাসনালীর জটিলতা যেমন: গলা ব্যাথা, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়া, সর্দি ইত্যাদি হতে পারে। মোল্ড সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় শিশু, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী মহিলারা।

>মানসিক চাপ এবং অবসাদ: এবার চলুন জেনে নিই বন্যার সময় সবধরনের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে সুস্থ থাকার পদ্ধতি এবং আক্রান্ত হলে আমাদের করণীয় কী সম্পর্কে:

বন্যা শুধু শারীরিক ক্ষতিই করে না, বরং মানসিক চাপও তৈরী করে। প্রলয়ংকরী বন্যাতে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষজন ভীষণভাবে দীর্ঘকালীন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। বন্যা পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত বাসস্থান ঠিক করা, অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা ইত্যাদি বিষয়সমূহ মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বন্যা পরবর্তী সময়ে যেসকল মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, রাগ, হতাশা, অস্বাভাবিক নিদ্রালুতা, হাইপার এক্টিভিটি, ইনসোমনিয়া এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার চেষ্টাতেও রূপ নিতে পারে।

১. বন্যা মোকাবিলায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য ব্যবহার করা। আমরা ইতোপূর্বেই জেনেছি যে, প্রায় অধিকাংশ রোগই পানি ও খাদ্যবাহিত। তাই বিশুদ্ধ পানি ও টাটকা খাবারই এসব রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। পানিকে ছেঁকে কমপক্ষে আধাঘন্টা ফোটাতে হবে। তাছাড়া, ফিটকিরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়েও পানি বিশুদ্ধ করা যায়। প্লেট, গ্লাস, হাত ভালো করে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। বাসি, নষ্ট খাবার পরিহার করতে হবে।

২. বন্যার পানিতে বেশি হাঁটা-চলা, গোসল করা পরিহার করতে হবে। এতে করে জ্বর, বুকের প্রদাহ, চর্মরোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

৩. শিশুদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে। অসাবধানতার কারণে পানিতে যাতে পড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশুদের শুষ্ক পরিবেশে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অবস্থায় রাখতে হবে।
৪. ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। ডায়রিয়া বা বমি বেশি হলে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। অতিমাত্রায় পাতলা পায়খানা, বমি হলে, রক্ত গেলে, জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৫. বৃষ্টি, ঝড়, বন্যার কারণে ঠান্ডা লেগে অনেকসময় কফ-কাশি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর প্রভৃতি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ নিরাময়ের ঔষধ সেবনের পরও উপকার না পেলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
৬. বন্যার সময় চর্মরোগ দেখা দিলে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের সহযোগিতা নিতে হবে।
৭. সাপে কামড়ালে আক্রান্ত স্থানের উপরে মোটা কাপড় দিয়ে হালকা করে বেঁধে ক্ষতস্থান ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত স্থানের নড়াচড়া যাতে কম হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

বন্যা প্রতিরোধে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতাই পারে বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে।
পরিশেষে, মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী নানা ধরনের রোগব্যাধি দেখা দেয়। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। সাধারণত পরিষ্কার পানির অভাবে ডায়রিয়া-কলেরাসহ পানিবাহিত রোগ দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মাধ্যমে এসব পীড়া লাঘব করা যায়। এ সময় মানুষের জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম ও খাদ্য সরবরাহ জরুরি হয়ে পড়ে। আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে পরিস্থিতি মোকাবেলা সহজ হয়।


মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল: [email protected]
মোবা.০১৮২২৮৬৯৩৮৯



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্য বিপর্যয়
আরও পড়ুন