Inqilab Logo

রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৫ মুহাররম ১৪৪৪

৪৫ লাখ গ্রাহক প্রহর গুনছেন

ডেসটিনির টাকা ফেরতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ২৭ জুন, ২০২২, ১২:০১ এএম

ডেসটিনি ঠকবাজ এক প্রতিষ্ঠান। লাখো গ্রাহক ঠকানো এই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রয়েছে দেশের ২৩টি জেলায়। এসব সম্পদগুলোর মালিক প্রতারিত গ্রাহকরা। গত ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির ঠকবাজি ধরা পড়ার পর কেটে যায় আরো ৯ বছর। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ লাখ গ্রাহকের কেউই আজও কোনো টাকা ফেরত পাননি। এবার ডেসটিনির ৪৫ লাখ গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি বিষয়ক অধিশাখা থেকে গতকাল রোববার এ সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে সমবায় অধিদফতরের রেজিস্টারকে। সদস্য করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব, পুলিশের একজন উপ-মহাপরিদর্শক এবং একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে সদস্য রাখা হয়েছে। এ কমিটি গত ১২ মে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলমের আদালতে যে রায় ঘোষণা দিয়েছেন সেই রায়ের আলোকে কাজ করবেন বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে।

বিতর্কিত বহুস্তর বিপণন (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি/এমএলএম) পদ্ধতির ব্যবসায়ের নাম করে এক যুগ ধরে মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছিল ডেসটিনি। ২০১২ সালে ধরা পড়ে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ লাখ গ্রাহকের কেউই আজও কোনো টাকা ফেরত পাননি। অন্যদিকে অর্থপাচার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে করা মামলা।

গত ১২ মে বহুল আলোচিত এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনসহ ৪৬ জন আসামিকে অর্থ পাচারের মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলমের আদালত আলোচিত এই রায় ঘোষণা করেন। ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের ৪ হাজার ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পাচারের অভিযোগে মামলায় এই রায় দেওয়া হয়। রায় হলেও ডেসটিনি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা লাখ লাখ মানুষ কোনো টাকা ফেরত পায়নি।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষিত ও হতাশ বেকার তরুণ-তরুণী, স্বল্প-আয়ের সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও গৃহিণীরাই ডেসটিনির প্রধান শিকার। ডেসটিনির পক্ষ থেকে তাদের বোঝানো হতো, আসুন, বাংলালিংক দেশ-এর মতো আমরা ডেসটিনি দেশ গড়ি। ছয় হাজার টাকা দিয়ে শুরু করুন, পকেটে রাখুন আরো চার হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ নিন। বহু রোগের মহৌষধ কালিজিরার তৈরি নাইজেলা, বৃক্ষরোপণ, ডেসটিনির এমডির বক্তব্য-সংবলিত সিডি, মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভে বিনিয়োগ ইত্যাদিতে ছয় হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা রাখলে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে পরিবেশক বানানো হতো। ডেসটিনির ভাষায়, এতে ৫০০ পয়েন্ট ভ্যালু (পিভি) অর্জন করা যায়। আর এভাবে নেটওয়ার্কিং পদ্ধতিতে সপ্তাহে ১২ হাজার ৬০০ টাকা এবং মাসে ৫০ হাজার ৪০০ টাকা আয় করা সম্ভব। অতি মুনাফার ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের টাকা লুটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ডেসটিনি। এ প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে বহু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ হারে মুনাফার লোভ দেখিয়ে এমএলএম (বহু স্তরের বিপণন) ব্যবসা পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড এবং ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের বিভিন্ন প্যাকেজের শেয়ার দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন গ্রুপের পরিচালকরা। ওইসব অর্থ ৩২টি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন। এর পরে ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর-রশীদ, এমডি রফিকুল আমীন এবং গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি আলাদা মামলা করে দুদক।

ডেসটিনির অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির (ডিএমসিএসএল) সাড়ে আট লাখেরও বেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতারণা করেন। এ সময় ঋণ প্রদান, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, নতুন প্রতিষ্ঠান খোলার নামে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এক হাজার ৯০১ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। সেই অর্থ থেকেই আসামিরা লভ্যাংশ, সম্মানি ও বেতন-ভাতার নামে এক হাজার ৮৬১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সরিয়ে নেন। ২০০৬ সালের ২১ মার্চ থেকে ২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে গাছ বিক্রির নামে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের (ডিটিপিএল) জন্য ২ হাজার ৩৩৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এ অর্থ থেকে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার ২২৭ কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গ্রুপের ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন নামের কোম্পানিটি ৮১ লাখ গাছ লাগানোর কথা বলে মোট ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা গাছের বিপরীতে সংগ্রহ করলেও বাকি ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয় গাছ না লাগিয়েই। ২০০৬-০৯ সময়ে তারা এ ঘটনা ঘটায়। এ ছাড়া নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ চুক্তি অনুযায়ী ট্রি প্ল্যান্টেশনের কমিশন বাবদ ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা সরিয়ে নেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। আবার ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের (ডিএমসিএসএল) মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। অভিযুক্তরা মানুষের কাছ থেকে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন এবং সেখান থেকে লভ্যাংশ, সম্মানী ও বেতন-ভাতার নামে ১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা সরিয়ে নেন।

আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সাল থেকেই ডেসটিনির নামে থাকা বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব পুলিশের। অর্থাৎ- ডেসটিনির সম্পদের রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক পুলিশ। রায়ের পর এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে রাষ্ট্রীয় অনুকূলে। রাজধানীতে থাকা ডেসটিনির সম্পদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং রাজধানীর বাইরের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিরা কথিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের নামেও বিপুল সম্পদ কিনেছেন। এগুলোর মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, সিনেমাহল ছাড়াও রয়েছে পাটকল, হিমাগার, টেলিভিশন চ্যানেল ও ধানি জমি। তবে ডেসটিনির সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে ডিএমপির একটি কমিটি রয়েছে। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি-২০০০ লি. নামের কোম্পানির ক্রোককৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি সংক্রান্ত আহ্বায়ক কমিটি।
ঢাকাসহ দেশের ২২টি জেলায় ডেসটিনির সম্পদ রয়েছে। এ সম্পদ দুই ভাগে বিভক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে ও পরিচালকদের নামে। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন এবং ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মো. রফিকুল আমীন, ডেসটিনি ২০০০-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনসহ পরিচালকদের নামে এগুলো কেনা। রাজধানীর বাইরে মুন্সীগঞ্জ জেলায় রয়েছে সবচেয়ে বেশি সম্পদ। এদিকে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনেরই ২৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। পুরান ঢাকার ২৫ নম্বর কোর্ট হাউস স্ট্রিট ভবন ও ধানমন্ডিতে রফিকুল আমীনের স্ত্রী ফারাহ দীবার নামে। ঢাকার কল্যাণপুরের দারুস সালাম ও পুরানা পল্টন লাইনের স্থাপনাবিহীন বাড়ি এবং বাংলামোটরে নাসির ট্রেড সেন্টারের ১০ম তলায় রয়েছে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনের নামে সিদ্ধেশ্বরী, খিলগাঁও, গেন্ডারিয়া, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাটারায় প্লট-ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে রয়েছে ২৪টি রবার বাগান। খুলনায় সাত একর জমি, ছয় বিভাগীয় শহরে ডেসটিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার নির্মাণের জমি, কক্সবাজারে জমিসহ নির্মীয়মাণ হোটেল ও গাজীপুরে ডেসটিনি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ স্থাপনের জন্য জমি রয়েছে। বান্দরবানের লামা থানায় রয়েছে ডেসটিনির সবচেয়ে বেশি রবার বাগান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ডেসটিনি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ