Inqilab Logo

শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৪ মুহাররম ১৪৪৪

ব্যবসায় সরকারি চাকরিজীবীরা

চিঠিতেই দায় সারছে দুদক রিয়েল এস্টেট : ক্লিনিক : মৎস্য খামার : রেন্ট এ কার : এমএলএম

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ৩ জুলাই, ২০২২, ১২:০০ এএম

ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন অনেক সরকারি চাকরিজীবী। চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীর নামে কখনওবা চাকরিজীবী স্ত্রী-স্বামীর নামে চালাচ্ছেন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। চাকরির তথ্য গোপন করে কেউ কেউ ব্যবসা খুলে বসেছেন নিজেই। এ সংক্রান্ত বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে পরিবারের সদস্য, স্বজনদের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে চুটিয়ে ব্যবসা করছেন অনেকে। আর এভাবে গত দেড় দশকে অনেক সরকারি চাকরিজীবী হয়ে উঠেছেন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক। অথচ এ বিষয়ে বহুল আলোচিত দু’য়েকটি ঘটনা ব্যতীত ব্যবস্থা নেয়ার নজির বিরল।

আদালত সূত্র জানায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান ছিলেন ডা: সাবরিনা শারমিন হুসাইন ওরফে সাবরিনা চৌধুরী। সরকারি চাকরিজীবী হয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্তার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ‘জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’। তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান থেকে করোনা টেস্টেও ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়ার মামলা পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা এখন বিচারাধীন। ডা: সাবরিনা ছিলেন ২০২০ সালের আলোচিত চরিত্র। পক্ষান্তরে এমন অনেক ‘সাবরিনাই রয়েছেন যারা এখনও আলোচনায় আসেননি। সরকারি চাকরির পাশাপাশি চুটিয়ে ব্যবসা করছেন তারা। ঢাকা সিএমএম আদালত সূত্র জানায়, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) নিরীক্ষা ও হিসাব কর্মকর্তা দক্ষতা ও শৃঙ্খলা-২ শাখায় চাকরি করছেন পারভীন আক্তার। একাধারে তিনি সরকারি চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ী। ‘ব্রাদার্স বিল্ডার্স অ্যান্ড টেকনোলজি লি: ‘নামক ডেভলপার কোম্পানির চেয়ারম্যান তিনি। স্বামী মো: রূহুল আমীন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (নং-১৭) চলতিবছ ২৭ জানুয়ারি একটি সি.আর. মামলার (নং-১৫৮/২০২১) প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পারভীন আক্তার মামলাটির ১ নম্বর আসামি। তার স্বামী মো: রূহুল আমীন মামলাটির ২ নম্বর আসামি। দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬/৫০৬ ধারায় দাখিলকৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পারভীন আক্তারের প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স বিল্ডার্স অ্যান্ড টেকনোলজি লি:-এর কাছ থেকে মামলাটির বাদী ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৪২ টাকা পাওনা। ১ এবং ২ নম্বর আসামির কাছ থেকে ভবিষ্যতে এই টাকা দাবি করলে বাদীকে খুন করে লাশ গুম করা হবেÑ মর্মে হুমকি দেন।
পিবিআইর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সিজিএর এই কর্মকর্তার অর্থ আত্মসাতসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও কিভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেনÑ জানতে চাইলে সিজিএ কর্মকর্তা পারভীন আক্তার মামলা বিচারাধীন থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ব্রাদার্স বিল্ডার্স অ্যান্ড টেকনোলজি লি:’ নামক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। ওই প্রতিষ্ঠানের কোথাও আমার কোনো স্বাক্ষর নেই। কেউ হয়তো জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমার নাম ব্যবহার করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত কন্ট্রোলার জেনারেল অব অডিট (প্রশাসন) আজিজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান ছিলেন ড. এম. মোশাররফ হোসেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি তার ছিল একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, লাভস অ্যান্ড লাইভস অর্গানিক লিমিটেড (এলএলওএল), গুলশান ভ্যালি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (জিভিএআইএল), এলএলওএল এমপ্লয়ীজ কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড, এলএলওএল এমপ্লয়ীজ গ্র্যাচুইটি ফান্ড, জিভিএআইএল এমপ্লয়ীজ কন্ট্রিবিউটরি ফান্ড, জিভিএআইএল এমপ্লয়ীজ গ্র্যাচুইটি ফান্ড, কাশফুল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (কেডিএল), এমপ্লয়ীজ কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড, কেডিএল এমপ্লয়ীজ গ্র্যাচুইটি ফান্ড, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানি ও কোয়ান্টাম প্লাস ফাউন্ডেশন। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এম. মোশাররফ হোসেন এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়ার ছিল সরাসরি সংশ্লিষ্টতা। সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে তার ব্যবসা পরিচালনার তথ্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে উদ্ঘাটিত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অন্তত এ অভিযোগে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। তার আগেই তিনি সসম্মানে চাকরি থেকে বিদায় নেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এম. মোশাররফ হোসেন এবং তার স্ত্রীর সন্দেহজনক লেনদেন, ঘুষ দাবি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। তবে মামলা রুজুর আগেই আইডিআরএর চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন তিনি। দুদক তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও এখন অবধি দায়ের করেনি কোনো মামলা।

শুধু সাবরিনা চৌধুরী, পারভীন আক্তার কিংবা এম. মোশাররফ হোসেনই নন। এমন হাজার হাজার সরকারি চাকরিজীবীর রয়েছে ছোট-বড় অনেক ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারি কর্মচারীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, চেয়ারম্যান এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। চাকরিজীবী-ব্যবসায়ীদের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। সরকারি পদে থেকে তারা প্রাইভেট লি: কোম্পানির অংশীদার হচ্ছেন। কখনও বিধি-বিধানের মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছেন। কখনও বা আইন-কানুনের তোয়াক্কাই করছেন না।

এদের মধ্যে যেমন উচ্চ মূলধনের ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি ক্রয়-বিক্রয়, রিয়েল এস্টেট, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার ব্যবসা রয়েছে। এমএলএম, তেমনটি আছে রেন্ট এ কার, ডেইরি ও পোলট্রি ফার্ম, মৎস্য খামারের ব্যবসা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন অনেক পদস্থ কর্মকর্তা। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে থেকে তারা বাগিয়ে নিচ্ছেন বড় বড় ব্যাংক ঋণ এবং সরকারি দপ্তরে সাপ্লাইয়ের কাজ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ এসব চাকরিজীবী ব্যবসায়ীদের নিয়ে অনেকটাই বিরক্ত।

সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে অবহিত করে গতবছর ২৯ মার্চ চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই চিঠিতে ১৯৭৮ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা উল্লেখ করে সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সচেতন হতে বলা হয়। চিঠিতে তখন বলা হয়, চাকরিজীবীরা আয়কর রিটার্নে তাদের সম্পদ ও তার উৎস সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখ করলেও সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেননি। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী এ অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। দুদক মনে করে, এমন বেআইনি চর্চা দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিৎ।

সরকারি কর্মচারি আচরণ বিধিমালার ১৭ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের অনুমোদন ছাড়া, সরকারি কাজ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসায় জড়িত হতে পারবেন না। অন্য কোনো চাকরি বা কাজ গ্রহণ করতে পারবেন না। পরিবারের সদস্য অর্থাৎ স্ত্রী-সন্তানও ব্যবসা করতে পারবেন না।

আচরণ বিধিমালার ১৭ (১) নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, এই আইনের অন্য বিধান অনুসারে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যবসায় জড়াতে পারবেন না। অথবা দায়িত্বের বাইরে অন্য কোনো কাজ কিংবা চাকরি নিতে পারবেন না। ১৭ (৩) নম্বর বিধিতে বলা হয়, সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া একজন সরকারি কর্মচারী তার এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় নিজের পরিবারের কোনো সদস্যকে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়ে অনুমতি দিতে পারবেন না।

বিধিমালার একাধিক বিধিতে বিষয়টি স্পষ্ট থাকলেও বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থাটি নিজে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নেয়ইনি, মন্ত্রণালয়কেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেনি। এ চিঠির ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলোকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিলেও গত একবছরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি নাÑ দুদক তা জানাতে পারেনি। সংস্থাটির সচিব মো: মাহবুব হোসেন বলেন, এ বিষয়টি আমার জানা নেই।

সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সচিব আলী ইমাম মজমুদার বলেন, যারা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। সুশাসন প্রশ্নে বিষয়টি মেনে নেয়ার মতো নয়।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা আইন ভঙ্গ করছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুদককেও উদ্যোগী হতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুদক


আরও
আরও পড়ুন