Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯, ১০ মুহাররম ১৪৪৪ হিজরী
শিরোনাম

নবী প্রশস্তির এক অমর কাব্য গ্রন্থ হাদায়েকে বখশিশ

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | প্রকাশের সময় : ২১ জুলাই, ২০২২, ১২:০৪ এএম

হাদায়েকে বখশিশ নবী প্রশস্তিতে লিখা আ’লা হযরত-এর অমর কাব্য সংকলন। তিনি রচনা করেন রসূলের প্রতি প্রেম ভালবাসার অপূর্ব নিদর্শন নাতিয়া কালাম।
“মোস্তফা জানে রহমত পেহ্ লাখো সালাম
শময়ে বযমে হেদায়ত পেহ্ লাখো সালাম।”
এমন শাশ্বত কাব্য পংক্তির কোন নজির নেই। শত সহ¯্রবার উচ্চারিত হয়েও এর আবেদন এতটুকু নিস্প্রভ হয়নি। রাসূলের সুমহান শান-মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন, আক্বিদাগত বিভ্রান্তি নিরসন ও ব্যাকুলতার স্বরূপ উম্মোচনে তাঁর লিখনী এক অব্যর্থ প্রতিষেধক। তাঁর রচিত কবিতার ছত্রে ছত্রে নবী প্রেমের যে অনন্য সূর অনুরণিত হয়েছে তা তাঁর অকৃত্রিম আনুগত্য ও মুহব্বতের অক্ষয় শ্রæত ধ্বনি।
পৃথিবী কবি ও কাব্য কম দেখে নি; কিন্তু ইমাম আহমদ রেযার অন্তরাত্মা ছিলো খোদা প্রদত্ত অসাধারণ প্রতিভা, আশ্চর্য প্রভা ও প্রজ্ঞায় আলোকিত। ইমাম বেরলভীর কাব্য মানসের উপর পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু গবেষক এম.ফিল. ও পি-এইচ.ডি. ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। বার্মিং হাম ইউনিভাসির্টি (যুক্তরাষ্ট্র) পাঞ্জাব ইউনির্ভাসিটি (পাকিস্তান) মুসলিম ইউনিভাসির্টি (ভারত) ময়শুর ইউনিভর্সিটি (ভারত)সহ বিশ্বের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা কর্ম হয়েছে এবং হচ্ছে। সম্প্রতি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক মাওলানা নাসির উদ্দিন ড. প্রফেসর আবদুর রশীদ-এর তত্ত¡াবধানে বাংলা ভাষায় আ’লা হযরতের কাব্য সাহিত্যের উপর পি-এইচ.ডি.ডিগ্রী অর্জন করেন।
বিশ্ববরণ্যে বহু খ্যাতিমান আলেমেদ্বীনগণ হাদায়েকে বখশিশ-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচনা করেন। আল্লামা মুফতি নসরুল্লাহ খান (করাচি) শায়খুল হাদীস আল্লামা ফয়েজ আহমদ ওয়েসী (ভাওয়ালপুর) আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ খান (লাহোর) আল্লামা গোলাম ইয়াসীন আমজাদী প্রমুখ। ইসলামী বিশ্বের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারক মিসর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক প্রফেসর ড. হাফেয মুহাম্মদ মাহফুয ইমাম আহমদ রেযা প্রণীত অমর কাব্যের ৩৫০ পৃষ্ঠা সম্বলিত এক বিরাট সংকলন প্রকাশ করেন যা “বাসাতিনুল গুফরান” নামে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
মিসর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আ’লা হযরত চর্চা বিশ্বের অন্যান্য বিদ্যাপীঠের মতো আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমন্ডলী ইমাম আহমদ রেযাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁরা শুধু তাঁকে জ্ঞান বিজ্ঞানের পুরোধা স্বীকার করতেন তাই নয়; বরং তাঁকে চতুর্দশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ হিসেবে জানতেন।৬
১৩৪০ হিজরি মুতাবিক ১৯২১ খ্রি. আ’লা হযরতের ইন্তেকালের পর হযরত শায়খ মুসা আশশামী আল আযহারী ইমাম আহমদ রেযা প্রণীত “আদ্দৌলাতুল মক্কীয়া” গ্রন্থে অভিমত ব্যক্ত করেন। “আমি আদ্দৌলাতুল মক্কীয়া” গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছি, এটাকে নিয়ামক হিসেবে এবং সত্যান্বেষী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসরীদের অন্তরের মহৌষধ হিসেবে পেয়েছি। গ্রন্থ প্রণেতা শায়খ আহমদ রেযা খান ইমামদের ইমাম এ উম্মতের মুজাদ্দিদ তথা সংস্কারক।৭ অনুরূপ আল-আযহার-এর অধ্যাপক শায়খ ইবরাহীম আবদুল মুতী আশ-শাফেয়ী স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করে বলেন যে, “আদ্দৌলাতুল মক্কীয়া” গ্রন্থটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি উঁচুমানের স্তম্ভ আল্লাহ তায়ালা এর জন্য ইমাম আহমদ রেযাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।৮
জামেয়া আল-আযহারের অধ্যাপক শায়খ আবদুর রহমান আল হানফী আল মিসরী ১৩২৯ হি. (১৯৯১ খ্রি.) স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করেন মদীনা, মনোয়ারার কতেক বিজ্ঞজন “আদ্দৌলাতুল মক্কীয়া” সম্পর্কে আমাকে অবহিত করলো। আমার জীবনের শপথ, গ্রন্থ প্রণতা এতে অতীব অর্থবহ নির্ভরযোগ্য প্রমাণাদি সন্নিবেশিত করেছেন। আ’লা হযরতের ইন্তেকালের অন্তত ৪২ বৎসর পর ১৯৬৩ খ্রি. আ’লা হযরত (র.)’র প্রপৌত্র তাঁর ইলমী উত্তরাধীকার তাজুশ শরীয়্যাহ আল্লামা আখতর রেযা আল আযহারী বিশ্বের প্রাচীনতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ জামেয়াতুল আযহারে আ’লা হযরতকে নতুনরূপে আবিষ্কার করেন। ইমাম বেরলভীর সুবিশাল দ্বীনি খিদমত ও বহুমাত্রিক অবদানের পরিচিত করান।৯
আল্লামা আখতার রেযা খান আল-আযহারে ইসলামী কানুন ও শরীয়া বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় পরীক্ষক মহোদয় বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিকট ইলমুল কলাম বা আকিদা বিষয়ক কতিপয় জটিল কঠিন প্রশ্ন করলেন। আ্ল্লামা আযহারী ছাড়া কেউ উক্ত প্রশ্নমালার যথার্থ উত্তর দিতে পারেনি। তাঁর বিশুদ্ধ যথার্থ উত্তর শ্রবনে পরীক্ষক মহোদয় প্রশ্ন করলেন, আপনি তো হাদীস ও উসুলে হাদীস বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন। ইলমুল কালাম তথা আকিদা বিষয়ক প্রশ্নাবলীর উত্তর দানে কীভাবে সক্ষম হলেন? তদুত্তরে বললেন, ‘আমি আমার বুযুর্গ পিতামহ ইমাম আহমদ রেযার প্রতিষ্ঠিত, জামেয়া রিজভীয়াহ মানযারুল ইসলাম বেরেলীতে কালাম শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছি।
তাজুশ শরীয়্যাহ আল-আযহারের শায়খুল হাদীস আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ সামাহী ও প্রফেসর আল্লামা আবদুল গফফার (রহ.) সহ অভিজ্ঞ তাফসীর ও হাদীস বিশারদ ও প্রাজ্ঞজনদের নিকট জ্ঞানার্জন করেন। ১৯৬৬ খ্রি. তিনি সর্বোচ্চ সমাপনী ডিগ্রীতে ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করায় তৎকালীন মিসরের প্রেসিডেন্ট।
কর্ণেল জামাল নাসের তাঁকে ফখরে আজহার এওয়ার্ড প্রদান করেন।১০
তাজুশ শরীয়্যাহ-এর সমসাময়িক ওলামা কেরামের মধ্যে সর্বপ্রথম প্রফেসর ড. শায়খ মহিউদ্দিন আলওয়ায়ী (আল আযহারের প্রফেসর) ইমাম আহমদ রেযার জীবন-কর্মের উপর আরবী ভাষায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন।
যা কায়রো-এর বহুল প্রচারিত “সওতুশ শারক” নামক পত্রিকায় ১৯৭০খ্রি. ফেব্রæয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।১১
জামেয়াতুল আযহারে আ’লা হযরত বিষয়ক লিখিত গ্রন্থাবলী
এক. “বাসতিনুল গুফরান” হাদায়েক বখশিশ অবলম্বনে আরবি ভাষায় ৩৫০ পৃষ্ঠা সম্বলিত কাব্যনুবাদ গ্রন্থ। লেখক আল-আযহারের প্রফেসর ড. হাযেম মুহাম্মদ মাহফুয। গ্রন্থটি ১৪১৮হি. (১৯৯৭ খ্রি.) বাসাতিনুল গুফরান নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৮ সনের ৬ জুন পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত আ’লা হযরত কন্ফারেন্সে লেখককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁকে রিসার্চ এওয়ার্ড সম্মানানা প্রদান করা হয়।
২.“আদ দারাসাতুর রেযভিয়া ফি মিসর আল-আরবিয়া” প্রফেসর ড. হাযেম আ’ল হযরতের জীবন-কর্মের উপর “আদদিরাসাতুর রেযভিয়াহ ফি মিসর আল-আরবিয়্যাহ” শীর্ষক এক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও রচনা করেন। যা ১৯৯৮ খ্রি. মে মাসে মিশরের কায়রো দারুস সিকাফাহ লিন-নশর ওয়াত তাওযীহ প্রকাশনা সংস্থা দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হয়।১২
৩. “আল ইমামুল আকবর আল মুজাদ্দিদ আহমদ রিযা খান ওয়াল আলামুল আরবি” গ্রন্থটির লেখক প্রফেসর ড. হাযেম মাহফুয মিসরী কর্তৃক গ্রন্থটি ১৯৯৮ সনে প্রকাশিত পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪০।
৪. “আহমদ রেযা খান আল বেরলভী আল হিন্দি শায়খুল মাশায়িখ তাসাউফ আল ইসলামি ওয়া আযমু শুয়ারাইল মাদীহ আন-নবভী” ড. হাযেম মাহফুজ কর্তৃক লিখিত ইমাম আহমদ রেযার সূফীতত্ত¡ ও প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে রচিত কাব্যের আরবী সংকলন। যা ১৯৯৯ খ্রি. কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়।
৫. “আল মানযুমাতুস সালামিয়া ফি মাদহি খায়রিল বারিয়্যা” রাসূলুল্লাহর শানে আ’লা হযরত বিরচিত বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সালামে রেযা খ্যাত ‘মুস্তফা জানে রহমাত পেহ্ লাখো সালাম’। ১৭১ টি পংক্তির আরবি কাব্যানুবাদ। আরবি ভাষার কাব্যানুবাদ করেন আল আযহারের খ্যাতিমান কবি প্রফেসর ড. হোসাইন মুজিব আল মিসরী।১৩ (চলবে)
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), মধ্য-হালিশহর, বন্দর, চট্টগ্রাম।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ