Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬, ১৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যেই ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সম্ভব

মোহাম্মদ আবু নোমান | প্রকাশের সময় : ২৯ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ফিলিস্তিনের জনগণের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার লড়াইকে আজ পাশ্চাত্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘ, বেদনাদায়ক এবং কঠিন সংগ্রাম বলে গণ্য করা যায়। এই লড়াই একান্তই ফিলিস্তিনিদের নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তনের, নিজেদের ভূখ- নিজেদের অধিকারে নেয়ার এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের রাষ্ট্রসভায় শরিক হওয়ার লড়াই। গাজাসহ পুরো ফিলিস্তিন এখনো অবরুদ্ধ, অসহায় ও নিরুপায়। সেখানকার যুবক এবং যারা কাজ করতে সক্ষম তাদের দু’মুঠো খাদ্য যোগাড়ের মতো কোনো কাজ নেই, আর যারা কাজ করে তাদের পারিশ্রমিক নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইল ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনের উপর তার আগ্রাসন এবং নীপিড়ন-নির্যাতন চালিয়ে আসছে। তার এ আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের যারাই প্রতিবাদ জানিয়েছে তাদেরকে হত্যা কিংবা কারাগারে বন্দি করা হয়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় ফিলিস্তিনের প্রতি বিশ্ববাসীর বিশেষ করে মুসলমানদের কর্তব্য আর্থিক ও সামরিক সাহায্য, সমর্থনসহ ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোর, মা-বোনদের প্রতি সমর্থন, সমবেদনা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।
আল-আকসা ও জেরুজালেমে আগ্রাসন চালিয়ে ইসরাইল সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের জন্য আন্দোলন ও জিহাদ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রাখেনি। ফিলিস্তিনিরা পাথরের টুকরো, রক্ত, দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের শক্তি দিয়ে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া দীর্ঘমেয়াদি অসহনীয় নির্যাতন মোকাবিলা করছে। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আরব বিশ্ব এ অবৈধ অবরোধের অবসান ঘটাতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ সুযোগে গাজায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের মোকাবেলায় অসমর্থ হয়ে ইসরাইল নিরীহ বেসামরিক ফিলিস্তিনি মা-বোন ও শিশুদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের ভূখ- ফিরিয়ে দিতে বিশ্ব সম্প্রদায় ইসরাইলের ওপর বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করে এলেও ইসরাইল এতে কর্ণপাত করেনি। ফলশ্রুতিতে ফিলিস্তিনিরাও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জুলুম, অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপায়ে প্রতিবাদ-অব্যাহত রেখেছে।
ইসরাইলের আধিপত্যবাদ, অবৈধ বসতি নির্মাণ ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস ও গণহত্যা যুক্তরাষ্ট্রের নজরে পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্র আজ পর্যন্ত ইহুদি রাষ্ট্রটির অবৈধ কর্মকা-ের প্রতিবাদ করেনি। বরং গাজা অবরোধের সমর্থন দিয়েছে। গাজায় উপর্যুপরি বিমান হামলা বন্ধের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, গাজার গণহত্যার প্রতিবাদ জানায়নি অথচ তারাই হামাসকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে গাজাবাসীকে শান্তির কথা বলছে। হামাসের নির্বাচিত সরকারের বৈধ কর্মকা- পরিচালনায় বাধা প্রদান করে আসছে। তেলের রাজনীতির আলোকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল রাষ্ট্র কায়েম এবং ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের দেশত্যাগ করা ও ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করার ব্যাপারটা এখন একেবারেই পরিষ্কার। স্বার্থান্বেষী ও ষড়যন্ত্রকারীরা এতে লাভবান হয়েছে। লাভবান হয়েছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র।
ইতোপূর্বে ২০১৪ সালকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের সহিত সংহতি বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল জাতিসংঘ। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ অবশ্য জাতিসংঘের গৃহীত সিদ্ধান্তটিকে ‘থিয়েটার’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং একে ‘মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের’ বিরুদ্ধে অর্থহীন অবস্থান হিসেবে গণ্য করে। মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্র তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইসরাইলকে তোয়াজ করে চলছে। অথচ এসব অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন মোকাবেলায় সারা বিশ্বে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতি আহ্বানই ইসলামের নীতি। ইসলাম ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে গুরুত্ব দিলেও আজ মুসলিম বিশ্ব ঐক্য, সংহতি ও দৃঢ়তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কোনো দেশ ইহুদি খ্রিস্টানদের হাতে নিপীড়িত হলেও অনেক মুসলমানই প্রতিবাদ করে না। যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলিদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও নিশ্চুপ রয়েছে প্রভাবশালী কোনো কোনো মুসলিম দেশ।
কোনো সমাজ বা গোত্রে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ছাড়া ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কারো পক্ষে হারানো সম্ভব নয়। ইসলাম ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই।’ দেশের ব্যবধান ডিঙিয়ে, জাতির ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের সকল মুসলিমরা একই জাতি একই জাতির পরিচয়। কোনো মুসলমানের এক অঙ্গ ব্যথিত হলে সকল মুসলমানেরই অঙ্গ ব্যথিত হবে। হুজুর (সা.) বলেন, ‘মুসলিম জাতি এক ব্যক্তির ন্যায়। এক দেহের কোনো অঙ্গ ব্যথিত হলে সারা শরীর বা অঙ্গই সে ব্যথা উপলব্ধি করতে পারে। তেমনি এক চোখে ব্যথা হলে সারা শরীরেই সে ব্যথার একটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এমনিভাবে মাথায় ব্যথা হলে সারা দেহেই সে ব্যথার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে যায়।’
হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ হাদিসটির মাধ্যমে মুসলিম জাতির ঐক্য সংহতির প্রতি আহ্বান করেন। সেইসঙ্গে কোনো মুসলমান ব্যথিত হলে সারা বিশ্বের মুসলমানের ব্যথা অনুভব করার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এভাবেই ইসলাম মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতি আহ্বান জানায়। ইসরাইলের হাত থেকে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি ও মসজিদে আকসার সম্মান রক্ষা শুধুমাত্র নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদেরই দায়িত্ব নয়, এ দায়িত্ব গোটা মুসলিম বিশ্বের।
ফিলিস্তিন পৃথিবীর এমন এক জনপদÑ যেখানকার শিশুরাও চমরভাবে নির্যাতিত, বিপর্যস্ত। সেখানকার শিশুরা নির্বিচার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তাদের খাবার নেই, পোশাক নেই, ওষুধ নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তাদের কারো পিতা নেই, কারো মা নেই; কারো ভাই কিংবা বোন নেই। তারা সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তো পাচ্ছেই না বরং প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। তাদের কেউ কেউ বড় হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। তার আগেই গুলি তাদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বর্তমান দুনিয়ায় তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই। অথচ তাদের এ অবস্থার জন্য তারা মোটেই দায়ী নয়। দায়ীÑ আমেরিকা, ব্রিটেনসহ বিশ্বের কিছু মোড়ল দেশ। যারা ফিলিস্তিনকে দখল করতে ইসরাইলকে সাহায্য করেছে এবং এখনো ইসরাইলের সকল অপকর্মের প্রতি সমর্থন দিয়ে চলছে। বিক্ষোভকারী তরুণ ও শিশুদের ওপর অচেতন করা গ্যাস, স্টান গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও ভারি গোলাবারুদ ব্যবহার করছে ইসরাইলি সন্ত্রাসীরা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের হত্যার উদ্দেশ্যে সরাসরি গুলি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরেও ইসরাইলি সেনারা হত্যা, নির্যাতন, অবরোধ, জেল-জুলুম ইত্যাদির মাধ্যমেও ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন দমাতে পারেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদেরকে কোনো খাদ্য বা পানি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ এবং আটকে রাখা হয়। আটক শিশুদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার পাশাপাশি মৌখিকভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এছাড়া, যাদেরকে মুক্তি দেয়া হয় এদের অনেককেই আবার ইসরাইলি বাহিনী গৃহবন্দি করে রাখে।
একথা ঠিক যে, আরবের নতুন প্রজন্ম গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদার বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ। তাদের আর বেশিকাল অধিকার বঞ্চিত রাখা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা অর্জন ও সঙ্কট নিরসনে ইসরাইলকে অবশ্যই তার বর্তমান অবস্থান বদলাতে হবে। তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। তাদের সামরিক নয় সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে। আরব বিশ্বের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির প্রভাব ইসরাইলের ওপর পড়বে না, এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইলকে লাগাম টেনে ধরার সময় এসেছে। আরব বিশ্বের চলমান বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের দখলকৃত ভূমি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে হবে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে পৌঁছতে হলে ইসরাইলকে অধিকৃত আরব ভূখ-ে সমস্ত অবৈধ কর্মকা- বন্ধ করতে হবে। সুতরাং সময় এসেছে ইসরাইলকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নতুন করে প্রতিবেশীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমতার ভিত্তিতে অবস্থানের পন্থা খুঁজে বের করা। ইসরাইলকে তাই তার অস্তিত্বের স্বার্থেই প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সাথে উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে।
ইসরাইলের বাড়াবাড়ি রকমের শক্তি প্রয়োগ এবং ব্যাপকহারে ফিলিস্তিনি নিহত হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটন, লন্ডন ও প্যারিস বলে দেয়, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। শুনতে উদ্ভট শোনাবে যে, ইসরাইলি নেতারা বিশ্বব্যাপী ইসরাইলকে নিঃসঙ্গ করছে বলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত করেছে। স্বীকার করতেই হবে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী সরকার ও জনগণের সাথে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করতে সফল হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শান্তি বিষয়ে ফিলিস্তিনি ধারণার অনেক কাছাকাছি হচ্ছে এবং ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ও পণ্য বর্জনের আন্তর্জাতিক প্রচার কাজÑ বিশ্বব্যাপী নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বসাধারণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সারা জাগিয়েছে।
ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের সংগ্রাম বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজ যেখানে হাজির হয়েছে তা আমাদের আশা পূর্ণ করবার মতো নয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের লড়াই-সংগ্রাম ইতিহাসকে নতুন করে ভাববার যে দিগন্ত উন্মোচন করেছে ফিলিস্তিনিদের অভিনন্দন জানাবার পাশাপাশি অসাধারণ সাফল্যকেও অভিনন্দন। নিরস্ত্র মানুষ কীভাবে ভয়াবহ ট্যাংক ও মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়ায় তার নজির সৃষ্টি করে ফিলিস্তিনি জনগণ আজ দেশে দেশে জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
abunoman72@ymail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন