Inqilab Logo

রোববার ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০২ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী
শিরোনাম

গুম-খুনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার আবশ্যক

সরদার সিরাজ | প্রকাশের সময় : ২৫ আগস্ট, ২০২২, ১২:০৪ এএম

দেশে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পুনরায় টক অব দি কান্ট্রি হয়েছে। জোরালো দাবি উঠেছে, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দোষীদের বিচার করার। এ দাবি বিশ্বজনীনও হয়েছে। জাতি সংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারও এই দাবি জানিয়েছেন। দেশে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু হয় স্বাধীনতাত্তোর কাল থেকে। গুমের প্রথম শিকার হন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি। এর আগে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আ’লীগের নেতারা ভারতে কে কী করেছেন তার উপর সিনেমা বানাবেন। এই বক্তব্যের কয়েক দিন পর তিনি নিখোঁজ হন। যার সন্ধান মেলেনি আজও। সে সময়ে ভারতের নকশালদের নির্মূল করার জন্য নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। নাম দেওয়া হয় ক্রসফায়ার। তাই সেখানে ক্রসফায়ার নামে সিনেমা হয়। এর পর বাংলাদেশেও শুরু হয় অবাধে গুম ও ক্রসফায়ার, যার অধিকাংশের শিকার হয় জাসদ ও মাওবাদী নেতা-কর্মীরা। তাই তখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির দাবি উঠেছিল। পরবর্তীতেও গুম-খুন হয়েছে। বিএনপি সরকারের ২০০১-০৬ সময়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ অনেক মানুষ খুন হয়, যার বেশিরভাগই বিএনপির নেতা-কর্মী। সে সময়ে র‌্যাব গঠন করা হয়। তবে, সে সময়ে গুম-খুনের সংখ্যা ছিল কম। কিন্তু বর্তমানে সরকারের সময়ে পুনরায় গুম, খুন ও ক্রসফায়ার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। তন্মধ্যে কক্সবাজারের আ’লীগের নেতা একরাম হোসেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন, মেজর (অব.) সিনহা ইত্যাদির ঘটনা সর্বাধিক আলোচিত হয়। এছাড়া, থানা হেফাজতেও অনেক আটক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে ও হচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, ৫৭ জন ফেরত এসেছে। অন্যদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। অপরদিকে, গুম হওয়া কিছু লোক পরবর্তীতে ফিরে এসেছে। কিন্তু তাদের কেউই বিন্দুমাত্র মুখ খোলেনি। যেমন: প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান ও বিশিষ্ট লেখক ফরহাদ মজাহার। অন্যদিকে, কিছু খুনের বিষয় বিচারাধীন রয়েছে। তন্মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের বিষয়টি অন্যতম।

বর্তমান সরকারের সময়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা তাদের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছে বহুবার। তারা এও বলেছেন, হত্যা করা হয়ে থাকলে তাদের কবর কোথায় তা বলে দিন। কবর জিয়ারত করতে পারলে একটু শান্তি পাব। অপরদিকে, খুন ও ক্রসফায়ার বন্ধ করার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ব্যাপক সোচ্চার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের গুম-খুনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে বহুবার। পশ্চিমা দেশের রাজনীতিবিদগণও এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা করেছে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে গত ১৯ জুলাই। কিন্তু সরকার সব সময় গুম-খুনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। উপরন্তু বলেছে, নিখোঁজরা ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন কারণে আত্মগোপনে আছে। এই অবস্থায় জাতিসংঘ বিষয়টি যাচাই করে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে এ বিষয়ে সময় চেয়েছে সরকার। এদিকে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে র‌্যাব এবং তার বর্তমান ও প্রাক্তন ৭ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের শেষপ্রান্তে। এরপর থেকে দেশে ক্রসফায়ার ও গুম প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে, সম্প্রতি প্রায়ই যেখানে সেখানে অজ্ঞাত লোকের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। তারা কে, কে বা কারা তাদের খুন করেছে তার কোনো সদুত্তর মিলছে না।

এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে গত ১৪-১৭ আগস্ট। এ সময় মিশেল ও তার সঙ্গীরা কয়েকজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, মানবাধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গুম হওয়া পরিবারের সদস্য, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলেন। গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের সংগঠন মায়ের ডাকের পক্ষ থেকে মিশেলের কাছে ৬১৯ জন গুম হওয়া ব্যক্তির একটি তালিকা দিয়ে এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র ব্যক্তি, সুশীল ও জাতিসংঘের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, গুম, বাক স্বাধীনতা, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, নারী নির্যাতন নিয়ে অভিযোগ করেছেন মিশেলের কাছে। আ’লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ মিশেলকে বলেছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মানবাধিকার সংগঠন সাম্প্রতিক সময়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করছে, তাতে দেখা যায়, এই সংগঠনগুলো যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করছে, সেগুলো সরকারবিরোধী কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে নেওয়া। এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট ও একপেশে রিপোর্ট সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের কাছে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত দাবি করেছে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। একই সময়ে বিএনপির মহাসচিব এক বক্তৃতায় তাদের প্রায় ৬০০ নেতাকর্মী গুম হয়েছেন দাবি করে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধায়নে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মিশেলের কাছে।

মিশেল ব্যাচেলেট গত ১৭ আগস্ট এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশে গুম, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, এসব ব্যাপারে জাতিসংঘ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত চায়। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সহায়তা করতে প্রস্তুত। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা জরুরি। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের সময় সুনাম অর্জন করছে। এখানে তাদের বিরুদ্ধে কেন এমন অভিযোগ আসবে? তাই বাংলাদেশের সরকারের এমন একটা ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবাধিকার সমুন্নত রেখে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল বা সংশোধন, ওটিটি প্লাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রস্তাবিত আইনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সমস্যা ও আগামী বছর হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে স্টেকহোল্ডার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের সঙ্গে বসে, সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছি সরকারকে।

মিশেলের উল্লেখিত বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক মতামত ব্যক্ত হচ্ছে, আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বাংলাদেশে গুম ও হত্যার বিচার করার এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। ছাত্র অধিকার পরিষদ গুমের শিকার সব নাগরিককে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, সব রাজবন্দির মুক্তি ও জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ কমিটি করে গুমের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, বাংলাদেশে সংঘটিত গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধায়নে স্বাধীন তদন্ত এবং যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের উচিত ফিলিস্তিন, মিয়ানমারের দিকে নজর দেয়া এবং ভালো হতো যদি তাদের হাইকমিশনার এদেশে ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে অগ্নি সন্ত্রাসে হতাহতদের পরিবারের কথা শুনতেন। মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকে সম্মান করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব। জাতিসংঘে যেসব সিদ্ধান্ত এবং কার্যবিধি নির্ণয় হয়, তা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিক্রমেই হয়। সেটা মান্য না করা, কথা না রাখার শামিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলায় আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছি সরকারের কাছে। এটা আমরা মিশেলকেও জানিয়েছি। দেশের ২৭ বিশিষ্ট ব্যক্তি এক বিবৃতিতে অবৈধ আটক, গুম ও বন্দিশালা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

কিছুদিন আগে টিভির এক টক শো’তে গুম-খুনের ব্যাপারে প্রাক্তন এক আইজিপি বলেছেন, পুলিশ নিজ উদ্যোগে কিছু করে না। সরকারের হুকুম পালন করে মাত্র। সম্প্রতি বরগুনার ছাত্রলীগের বিবদমান দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় পুলিশ তাদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে। সে কারণে সংশ্লিষ্ট পুলিশদের বদলী ও বিষয়টি তদন্ত করানো হয়েছে। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ১৯ পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। উপরন্তু এই ঘটনাকে পুলিশের বাড়াবাড়ি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু এর কয়েকদিন আগে ভোলায় বিএনপির পণ্যমূল্য বৃদ্ধির শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহুজনকে গুলিবিদ্ধ করেছে। তাতে সাথে সাথে একজনের মৃত্যু, কয়েকদিন পর আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে। তবুও সংশ্লিষ্ট পুলিশের শাস্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জার্মান বেতারের একটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে: বরগুনায় পুলিশের বাড়াবাড়ি আর ভোলায় পুলিশের পেশাদারি?


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
[email protected]



 

Show all comments
  • jack ali ২৫ আগস্ট, ২০২২, ১২:০০ পিএম says : 0
    আমরা কি এই জন্যই দেশ স্বাধীন করেছিলাম ???????? 72-75 বিভীষিকাময় শাসন যেভাবে আমাদের পরে অত্যাচার করা হয়েছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এবং সেটাই আবার তারা সেভাবেই আমাদেরকে হত্যা করছে গুম করছে লুটপাট যা ইচ্ছে তাই করছে আমাদের জীবন টাকে দেশটাকে একদম ধংস করে দিয়েছে
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: গুম-খুনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার আবশ্যক
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ