Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য যাত্রাবাড়ী

পুলিশ নীরব : রমরমা মাদক ব্যবসা : ফুটপাথ গণপরিবহন ও পাইকারি মার্কেটে চাঁদাবাজি

| প্রকাশের সময় : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অপরাধ কর্মকান্ড বেড়েই চলেছে। প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে শত শত নকল ও ভেজাল কারখানা, ছিনতাইকারী, মলম পার্টির দৌরাত্ম্য কী নেই এখানে। আছে সড়ক-মহাসড়ক, ফুটপাথ দখল করে চাঁদাবাজি। সাথে গণপরিবহন ও পাইকারি মার্কেটের চাঁদাবাজি তো আছেই। সব মিলিয়ে যাত্রাবাড়ী এখন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সব ধরনের অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। রহস্যজনক কারণে পুলিশও নীরব। ভুক্তভোগীদের মতে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ নির্মূলে সরকার যখন জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে এখানকার রাজনৈতিক মদদপুষ্ট প্রভাবশালী মহল ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নানা উপায়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে। এ জন্য তারা মাদক ব্যবসায়ী, পেশাদার চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকায় পুরো এলাকাই অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলেন, যাত্রাবাড়ী থানার প্রতিটি এলাকায় মাদকের বিস্তার এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, ছেলেমেয়ে নিয়ে অভিভাবকরা সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন।   
যাত্রাবাড়ী থানা এলাকা ঘুরে জানা গেছে, এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে মাদক বিক্রি হয় না। থানার আশপাশের অলি-গলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা এমনকি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, বাংলা মদ ইত্যাদি। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে মাদক তুলে দিচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা উঠতি বয়সী তরুণদের দিয়ে তা পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্কুল-কলেজ পড়–য়ারা হাত বাড়ালেই পেয়ে যাচ্ছে মরণ নেশার মাদক। এতে করে তরুণ ও যুবসমাজ দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সায়েদাবাদ রেল গেট থেকে দয়াগঞ্জ বাজার পর্যন্ত রেললাইনের ওপর প্রতিদিনই ইয়াবা ও গাঁজার বাজার বসে। নাম প্রকাশ না করে একজন ক্রেতা জানায়, পুলিশকে ম্যানেজ করে মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে প্রকাশ্যে ব্যবসা করে। এ জন্য এখান থেকে মাদক কেনাতে ঝুঁকি অনেকটাই কম। ধরা খাওয়ার ভয় থাকে না বলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকসেবীরা এখানে আসে। তবে মাঝে মধ্যে থানা পুলিশ লোক দেখানো অভিযান চালায়। যাত্রাবাড়ী থানার খুব কাছেই শহীদ জিয়া শিশু পার্কে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি করে কাবিলা ও তার জামাতা। রাতে এখানে বসে ইয়াবা সেবনের আসর। রাতে পার্কের ভেতরে চলে প্রতারকদের ফিটিং বাণিজ্য ও পতিতা ব্যবসা। উত্তর যাত্রাবাড়ী সবুজ বিদ্যানিকেতনের গলিতে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা করে চোরা সবুজ। এলাকার বিভিন্ন গলিতে ইয়াবা ও ফেন্সিডিল সরবরাহ করে সবুজ। দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী পাকিস্তান মাঠে দিন-রাত ইয়াবা বিক্রি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই এখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছে। এদের নেপথ্যে রয়েছে সরকারি দলের প্রভাবশালী এক নেতা। যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীতে সুফিয়া প্লাজা গার্মেন্টস গলিতে ইয়াবা বিক্রি করে হান্নান। এছাড়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে শনিরআখড়া ও শেখদিতে মাদক বিক্রি করে লিটন ওরফে কুত্তা লিটন। তার সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে হানিফ ও আজম। এরা বিক্রি করে হেরোইন ও ইয়াবা। প্রতিদিন কমপক্ষে লাখ টাকা বিক্রি হয়। এ কাজে সরাসরি সহায়তা করে পুলিশের সোর্স কবির, আসিফ ও সোবহান। এ জন্য এরা প্রত্যেকে প্রতিদিন ৫শ’ টাকা করে পায়। সূত্র জানায়, এই তিন সোর্স পুলিশের গাড়িতে ঘোরে। রায়েরবাগের মাদকের স্পট চালায় রানা, রাসেল, সাদ্দাম, অন্তর ও আমিরুল। এখানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে মাসুম, জুয়েল ও লেচিং। এই স্পটের পাইকারি ডিলার ছাগলা বাবু। জিয়া সরণি গ্যাস রোডের বাসিন্দা মাদকের পাইকার ছাগলা বাবুর সাথে দুর্নীতিবাজ কতিপয় পুলিশ সদস্যের সখ্যতা আছে। এ কারণে বরাবরই সে থাকে পুলিশের নাগালের বাইরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রায়েরবাগের ডব্লিউজেড পাম্পে মাদকের স্পট চালায় বাবু। এখান থেকেও সোর্স কবির, আসিক, সোবহান নিয়মিত টাকা পায়। এই স্পটে প্রতিদিন দেড় লাখ টাকার মতো হেরোইন ও ইয়াবা বিক্রি হয়। এ ছাড়া ডেমরা সড়কে ভাঙ্গাপ্রেস নামক স্থানে নাসিরের স্পট নামে একটি মাদকের স্পট আছে। নাসিরের বাসা রায়েরবাগে হলেও ব্যবসা করে ভাঙ্গাপ্রেসে। তার সহযোগী হিসেবে আছে রাজু নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী। এখানকার সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে করিম, কিরণ, জালাল, হান্নান, রহিম, এরশাদ, আরমান, শুক্কুর ও আক্কাস। এদের সবার বাসা শেখদি এলাকায়। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। অথচ পুলিশ এদের খুঁজে পায় না। অন্যদিকে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মলম পার্টির দৌরাত্ম্য, সড়ক দখল করে চাঁদাবাজি চলছে।  
গণপরিবহনে চাঁদাবাজি
যাত্রাবাড়ী থানার সামনে থেকে ডেমরা রোডে চলাচল করে দুই শতাধিক টেম্পো। এসব টেম্পো থেকে বছরের পর বছর ধরে চাঁদাবাজি করে আসছে খালেক ওরফে কাউয়া খালেক। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে খালেক নিজেকে বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ দাবি করলেও বর্তমান সরকারের আমলে সে স্থানীয় এমপির খাস লোক বলে পরিচয় দেয়। স্থানীয়রা জানান, খালেকের ছেলে এখনও বিএনপি করলেও খালেক চাঁদাবাজির জন্য এমপির লোক সেজেছে। খালেকের অপকর্ম শুধু চাঁদাবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেমরা রুটে বেশ কিছু টেম্পো আছে যেগুলোর বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। কোনোটা আবার মাইক্রোবাস কেটে বানানো হয়েছে। থানার সামনে এভাবে প্রকাশ্যে চোরাই গাড়ি দিয়ে কিভাবে ব্যবসা করা সম্ভব তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। একই রুটের টেম্পো থেকে শ্রমিক কমিটির নামে চাঁদা তোলে বাচ্চু খন্দকার এবং তার লোকজন। বাচ্চু খন্দকার নিজেও এক সময় আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। স্থানীয়রা এই দু’জনের সম্পর্কে বলেন, বিএনপি আমলে খালেক ছিল বিএনপির সাবেক এমপি সালাহউদ্দিনের আর বাচ্চু ছিল মির্জা আব্বাসের খাস লোক। এরা দু’জনেই এখন হয়েছে এমপি মোল্লার খাস লোক। মালিকদের জিম্মি করে এরা দু’জন বছরের পর বছর চাঁদাবাজি করলেও তা পুলিশের চোখে পড়ে না। জানতে চাইলে খালেক বলেন, এখন চাঁদাবাজি বন্ধ। শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য ৫০ টাকা করে তোলা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, সেই ৫০ টাকার সিংহভাগই যায় খালেকের পকেটে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থানার সামনে থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত কিছু বাস অবৈধভাবে চলাচল করে। সেগুলো থেকে খোদ পুলিশই চাঁদাবাজি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও যাত্রাবাড়ী মৎস্য আড়ত সংলগ্ন ৫ শতাধিক পিকআপ ভ্যান ও মিনি ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি করে যুবলীগ নেতা সায়েম খন্দকার ও দেলোয়ার হোসেন দেলু।
রাস্তা দখল কর চাঁদাবাজি
যাত্রাবাড়ী এলাকার প্রধান সড়ক দখল করে দখলদাররা অবৈধ হাট বাজার বসিয়েছে। রাস্তার ওপর গ্যারেজ বানিয়ে তা থেকে ভাড়া তুলছে দখলদাররা। এ নিয়েও প্রশাসনের কোনো মাথা ব্যথা নেই। এ পদ্ধতিতেও কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দখলদাররা। স্থানীয়রা জানায়, যাত্রাবাড়ী থানার আশপাশেই ফ্লাইওভারের নিচে বাজার বসিয়েছে শরীফ ও জাকির। এরা দু’জনেই পুলিশকে ম্যানেজ করে রাস্তার ওপরের দোকান থেকে ভাড়ার নামে মোটা অংকের চাঁদা তুলছে। শহীদ জিয়া শিশুপার্ক সংলগ্ন রাস্তার ওপর বসানো দুই শতাধিক দোকান থেকেও লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাস্তা দখল করে যারা চাঁদাবাজি করছে তাদের মধ্যে রয়েছে সবুজ, জামাল, আজিম, মাসুম, রনি, সেলিম, কাবিলাসহ আরো ১৫-২০ জনের সিন্ডিকেট।
ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য
যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে প্রতিনিয়ত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় গেলে পুলিশ মামলা নিতে চায় না। বিভিন্নভাবে জেরা করে ভুক্তভোগীদেরই উল্টো হয়রানি করে। এতে করে ছিনতাইকারী চক্র পার পেয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, সায়েদাবাদ, কাজলা, কোনাপাড়া, শনির আখরা, কুতুবখালি, ধলপুর, সুতিখালপারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। অথচ পুলিশ ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে একটু ডিউটি দিলেই তা বন্ধ হতে পারত। জানা গেছে, এসব ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের মধ্যে রয়েছে- চোরা দেলু, কালু, রনি, রবিউল, সালাম, মানিক, বাবুল, সাব্বির, হাত কাটা স্বপন, কানা রাজু, বিলাই কবিরসহ অনেকেই।  অভিযোগ রয়েছে এসব ছিনতাইকারী নিয়ন্ত্রণ করে সোর্স নামধারী কয়েকজন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অপরাধী


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ