Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

শান্তিচুক্তির ১৯ বছরে পাওয়া না পাওয়ার ক্ষতিয়ান

| প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মো. মনিরুজ্জামান মনির : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের পক্ষে সংসদের চীফ হুইফ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং পাহাড়ের দুই যুগ যাবত সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী সন্ত্রাসযুদ্ধে লিপ্ত তথাকথিত শান্তিবাহিনী বা জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান বাবু সন্তু লারমা ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। আজ থেকে ১৯ বছর আগে স্বাক্ষরিত ঐ চুক্তিকে সরকার ও তার অন্ধ সমর্থকরা মিডিয়ার কাছে অভিহিত করেন পার্বত্য শান্তিচুক্তি নামে। অন্যদিকে এই চুক্তির কারণে যারা সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন তারা একে বলেন- পার্বত্য কালোচুক্তি। এছাড়াও, সন্তু লারমা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বলে বেড়াচ্ছেন- তাদের সাথে নাকি হাসিনা সরকারের একটি মৌখিক সমঝোতাও হয়েছিল যা অলিখিত চুক্তি বলে খ্যাত। যদিও তৎকালীন চাকমা মন্ত্রী কল্পরঞ্জনসহ আরো অনেকেই সন্তু লারমার দাবিকৃত অলিখিত চুক্তির কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, চুক্তি সবসময়ই লিখিত হতে হবে, মৌখিক বা অলিখিত চুক্তি বলে আইনের দৃষ্টিতে কোনচুক্তি করা বা দাবি করা হাস্যকর উদ্ভট দাবি মাত্র। আসল কথা হলো- বিগত ১৯ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক ধরনের উপজাতীয় নেতা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, সাধারণ বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠী শান্তি চুক্তির বিন্দুমাত্র সুফল পান নাই। শান্তি চুক্তির ষোলআনা লাভের গুড় কতিপয় মতলববাজ উপজাতীয় পিঁপড়ার পেটে গিয়ে জমা হয়েছে।
শান্তিচুক্তি বা কালোচুক্তি বা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যে নামেই একে ডাকা হোক না কেন, এর সুফল ভোগ করে যাচ্ছে সন্তু লারমা ও তার দোসররা। পাহাড়ে-জঙ্গলে অমানবিক জীবন-যাপনরত হতদরিদ্র উপজাতীয় নারী-পুরুষের ভাগ্যেও জুটেনি এই চুক্তির কোন সুফল। অন্যদিকে পার্বত্যবাসী বাঙালিরা প্রথম থেকেই আতঙ্কিত ছিলেন চুক্তির কারণে নিজেদের অস্তিত্ব হারোনোর ভয়ে, যা বিগত ১৯ বছরে ধাপে ধাপে ভুক্তভোগী সচেতন বাঙালি নাগরিকেরা টের পেতে শুরু করেছেন। এর সর্বশেষ আলামত ফুটে উঠেছে গত আগস্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় এবং পরে জাতীয় সংসদে পাশকৃত বহুল বিতর্কিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধনী) ২০১৬ এর মাধ্যমে। বর্তমান বিতর্কিত বাঙালি বিদ্বেষী একতরফা উপজাতীয় নেতা বেষ্টিত পার্বত্য ভূমি কমিশন কার্যকর হলে বাঙালিরা তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত রাষ্ট্রদ্রোহী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে নিরস্ত্র করা এবং পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের ফল্গুধারা ছড়িয়ে দেয়া। এজন্যই, তড়িঘড়ি করে সরকার পক্ষ অনেকটা ছাড় দিয়েই সই করা হয়েছিল এই চুক্তি। যদিও তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি শান্তিচুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং একে প্রতিহত করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চও করা হয়েছিল। যা দেশে-বিদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা বহুল প্রচারে সাহায্য করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো- বিএনপি ক্ষমতায় এসেও পার্বত্য কালোচুক্তি বাতিল করেনি কিংবা দেশ বিরোধী বৈষম্যমূলক তথাকথিত শান্তিচুক্তির অসাংবিধানিক সাংঘর্ষিক কোন ধারা/উপধারাও সংশোধন করেনি।
পাহাড়ের তিনটি জেলায় তথা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শান্তিশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, উপজাতি বাঙালি জনগোষ্ঠির সহাবস্থান নির্বিঘœ করার পাশাপাশি তাদের জীবন মানোন্নয়ন ও সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী খুনী শান্তিবাহিনীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ও সন্তু লারমার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি পরবর্তী সময়ের সরকার শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের চরিত্র একই রকম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু গত ১৯ বছরে চুক্তির ১০০ ভাগ পূরণ না হওয়াতে সন্তু লারমারা দেশে-বিদেশে বহু অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও সরকার বলছে- শান্তিচুক্তির ১০০ ভাগ বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। সরকারের পক্ষ থেকেও চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সন্তুু লারমার পক্ষের অসহযোগিতার অভিযোগ আনা হচ্ছে। সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশিষ্ট উপজাতীয় নেতা দীপংকর তালুকদার বহুবার বলেছেন- পার্বত্যাঞ্চলে সন্ত্রাস, সশস্ত্র বন্দুকযুদ্ধ, চাঁদাবাজী, খুন, মুক্তিপণ আদায় ইত্যাদি যারা করছে তারা শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে। এদের জন্যই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এই অপশক্তির নামই হচ্ছে জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ। এরা নতুন নতুন আবদার করে দফায় দফায় সরকারের উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে দেশবিরোধী প্রচারণা চালায় এবং চুক্তির ১০০ ভাগ বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে নানারূপ প্রশ্ন তুলে।
বাস্তবতা হলো- শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে সরকার ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশি-বিদেশি এনজিও, ইউএনডিপি ইত্যাদি মিলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেছেন। এসবের শতকরা ৯০ ভাগই উপজাতি জনগোষ্ঠীর কল্যাণে, বাকী ১০ ভাগ মাত্র বাঙালিদের উন্নয়নে ব্যয় হলেও তা নিয়ে উপজাতীয় নেতাদের সমালোচনার কমতি নেই।
গত ১৫ জুলাই ১৯৯৮ বাংলাদেশ সরকার উপজাতীয়দের কল্যাণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন। এর ১০০ ভাগ সুবিধা ভোগ করছে উপজাতীয় নেতারা। নববিক্রম ত্রিপুরার মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ একাধিক ক্ষমতার অধিকারী। সরকার জনসংহতি সমিতি বা খুনি শান্তিবাহিনীর সাবেক কমান্ডার সন্তু লারমাকে চেয়ারম্যান করে অন্তবর্তীকালীন পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করে দিয়েছে। যা ১৯৯৯ সাল থেকে অধ্যাবদি ক্ষমতায় আছে। উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারী শান্তিবাহিনীর সকল সদস্যকেই ভালো ভালো পদে চাকরি দিয়ে সরকার পুনর্বাসন করেছে। তার মধ্যে ৭১৫ জন (১০ জন এসআই ও ৭০৫ জন অন্যান্য পদবির পুলিশ) সদস্যকে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি দেয়া হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে অস্ত্র ও গুলি পাচারের অভিযোগসহ রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কথা প্রচার মাধ্যমে চলে এসেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর শতশত ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাদের অর্থবল ও অস্ত্রবলসহ জনবল কমিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস ও বন্দুকযুদ্ধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল, কলেজ, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ইত্যাদিতে ভর্তির জন্য উপজাতি কোটায় পাহাড়ের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি ছাত্র-ছাত্রীরা ১০০ ভাগ ভর্তির সুযোগ করে নিচ্ছে।  এমন আরও অনেক ক্ষেত্রেই উপজাতীয়দের জন্য সরকার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর হাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেকগুলো বিষয় ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেসবের ওপর উপজাতীয়দের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশেরই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দেশের এক দশমাংশ ভূমি তথা ৫০৯৩ বর্গমাইল এলাকার মালিক আমরা সবাই। প্রথাগত ভূমি অধিকার কিংবা ব্রিটিশ হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল এক্ট-১৯০০ এর মূলা ঝুলিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। পাহাড়ের সকল সম্পদের মালিক বাংলাদেশ সরকার। কোন উপজাতীয় নেতা-নেত্রী পাহাড়ের ভূমি একক মালিক নয়। আমরা চাই পাহাড়ে শান্তির পায়ড়া পাখা মেলে বেড়াক। অথচ সন্তু বাবুরা পদে পদে শান্তি স্থাপনে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে তেল গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান, সেনা ক্যাম্পসহ বড় ধরনের কোন স্থাপনা তৈরি করা হলেই উপজাতীয় নেতারা বাধ সাধেন। কেন বাংলাদেশ সরকারকে উপজাতীয় নেতাদের সাথে পরামর্শ করে তিন পার্বত্য জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, সন্তু বাবুরা দয়া করে এর জবাব দিবেন কি? বাংলাদেশ সরকার বড় নাকি আপনাদের ক্ষমতা বড়? তাদেরকে ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছেড়ে বাংলাদেশের মূল¯্রােতে চলে আসার জন্য আবারও আমরা আবেদন জানাচ্ছি।
লেখক : সমঅধিকার আন্দোলনের একাংশের মহাসচিব



 

Show all comments
  • Kuddus ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২:২৮ এএম says : 0
    বর্তমান বিতর্কিত বাঙালি বিদ্বেষী একতরফা উপজাতীয় নেতা বেষ্টিত পার্বত্য ভূমি কমিশন কার্যকর হলে বাঙালিরা তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।