Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

বন্ধ হোক নারী নির্যাতন

| প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ডা. মাও. লোকমান হেকিম : নারী-পুরুষের সমান অধিকার এ কথাটি আমরা সচরাচর কাগজ-কলমে লিখে থাকি বা মুখে অতি সহজে বলে থাকি। কিন্তু এ কথাটির বাস্তবতা কতটুকু। যদি আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকারই থেকে থাকে তাহলে কেন নারী জাতি নিয়ে আমাদের এ পুতুল খেলা। যে সমাজে নারীর জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রতিনিয়ত নারী হচ্ছে অপহরিত, ধর্ষিত, লাঞ্ছিত, অপমানিতÑ সে সমাজে কেমন করে আমরা বজ্রকণ্ঠে বলবো নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়েছে? যেসব নারী প্রতিনিয়ত এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে সেই নারীটি হতে পারে আপনারই মা-বোন কিংবা ঘনিষ্ঠ কেউ। নারী নির্যাতন আজ আমাদের সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।
ঘরে কিংবা বাইরে সব জায়গাতেই প্রতিনিয়ত বখাটেদের বেপরোয়া উৎপাতের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। ইদানীং এর মাত্রাটা আরো বহুগুণ বেড়েছে। তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করেই গুম, খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ করতেও পিছপা হচ্ছে না সমাজের মানুষ নামধারী কিছু নরপশু। অপরাধ প্রবণতা যেখানে মাত্রাহীন বেড়ে যায় সেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন কতটুকুইবা সম্ভব! তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে দিনদিন। এতে করে সমাজের সচেতন নাগরিকেরা শুধু উদ্বিগ্নই নন, রীতিমতো শঙ্কিত। আমাদের দেশে নারীরা আজ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। লজ্জায় এসব ঘটনা কেউ লুকিয়ে রাখছে আবার কেউ মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে করছে আত্মহত্যা। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতে হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। কেউবা তাদের পৈশাচিক হামলায় হারাচ্ছে প্রাণ।
বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রেও ঘটছে নানা নির্যাতন। স্বামীর নির্যাতনে নিরুপায় হয়ে করতে হচ্ছে সম্পর্কোচ্ছেদ। তবুও রেহাই নেই, প্রতিশোধ নিতেই ফের আক্রমণ। সামান্য কতগুলো টাকার লোভে প্রিয়তমা স্ত্রীকে হত্যা পর্যন্ত করতেও দ্বিধাবোধ করছে না আমাদের দেশের কিছু হিংস্র মানুষ। যৌতুকের ভয়াবহ রূপ আমাদের সমাজকে প্রবলভাবে গ্রাস করছে। যৌতুক সামাজিক ব্যাধি। আর এ ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত সমাজের পুরুষরা যে কত নারী নির্যাতনের জঘন্যতম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে, তার হিসাব নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মকে বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি থেকে বের করে না আনলে এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনাগুলো বারবার ঘটতেই থাকবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বখাটে ও দুর্বৃত্তদের উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ২৯টি প্রাণ ঝরে পড়েছে। এ ছাড়াও গত আগস্ট মাসে ২৬৫ নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১২২ জন গণধর্ষণের শিকার হয়। আর এ কারণে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে ছয় নারী। (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ আগস্ট ২০১৬)।
অতিসম্প্রতি ইউএনএফপিএর বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীর ওপর তার পুরুষ সঙ্গীর শারীরিক নির্যাতনের বেলায় বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশে শতকরা ১৪ ভাগ মাতৃমৃত্যু ঘটছে গর্ভকালীন নির্যাতনের কারণে। শতকরা ৬১ দশমিক পাঁচ শতাংশ পুরুষ এখনও মনে করেন স্ত্রীকে নির্যাতন করা বৈধ। এছাড়া দেশে নারীর প্রতি শতকরা ৮০ ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটে পরিবারের ভেতরে। নারী নির্যাতন পুরুষ শাসিত সমাজে একটা মারাত্মক ব্যাধি। সমাজ-সভ্যতা যত এগোচ্ছে সামনে, ততই যেন এই প্রবণতা বেড়ে চলেছে। নারী নির্যাতন এদেশে ছিল অতীতেও। অবশ্য তখন মানুষের মধ্যে এত সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। যোগাযোগ-তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নও ঘটেনি। নারী নির্যাতন যে একটা অপরাধ, সেটাও অনেকে জানতো না।
এখন সময় পাল্টেছে। শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়েছে মানুষ। সকল ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে অনেক সচেতনতা বেড়েছে মানুষের মধ্যে। কিন্তু নারী নির্যাতনের মতো একটি মারাত্মক এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। তাই আজ থেকে আমরা আশা করি যে, আর কোন নারী যেন এ নিষ্ঠুর সমাজের কবলে না পড়ে। সুতরাং আসুন, নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার মাধ্যমে নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করি।
ষ লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।