Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার

| প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এম এম খালেদ সাইফুল্লা : সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভেতর দিয়ে একটা দেশের নিজস্ব ইতিহাস, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ধরন উল্টাপাল্টা করে দেয়া হয়। অস্পষ্ট করে তোলা হয় তার আত্মপরিচয়কে। যার পরিণতিতে ওই দেশের মানুষ দীর্ঘ হীনমন্যতার জালে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একটা হীনমন্য দেশ বা জাতির নিয়তি হয় পরাধীনতা। আগের মতো স্বাধীনতা হরণ করার জন্য সব সময় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশ দখল করার নিয়মনীতি পুষতে অনেক পয়সাকড়ি লাগে। আবার সেই সামরিক আধিপত্য দীর্ঘদিন স্থায়ীও হয় না। এ কারণে আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে প্রয়োজন হয় সাংস্কৃতিক দীক্ষার মাধ্যমে কিছু হীনমন্যতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি, যারা আগ্রাসনকারীর কালচারকে লোভনীয় করে তোলে এবং উচ্চারণ করতে থাকে, ‘কথা বলো ওদের ভাষায়, নকল করো ওদের, অস্বীকার করো নিজের সত্তা এবং সৃজনশীলতাকে।’
মিডিয়ার বদৌলতে বর্তমান পৃথিবী মানুষের অনেক কাছে চলে এসেছে। ডিজিটালের এই যুগে তো মানুষের ঘরে ঘরে টেলিভিশন নামক যন্ত্রটি ঢুকে সংস্কৃতির নামে অধিকাংশ সময়েই অপসংস্কৃতির ডামাডোল বাজিয়ে চলেছে। যার প্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজে।
সম্প্রতি ভারতীয় সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে প্রভাবিত হয়ে নাটোরে আরো একটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সিংড়া উপজেলার সোহাগগাড়ি এলাকায়। নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুন্সী শাহাবুদ্দিন জানান, সোহাগগাড়ি এলাকার জনাব আলীর সঙ্গে জুলহাসের স্ত্রী রীতার প্রায় ৩ বছর ধরে পরকীয়া চলছিল। সম্প্রতি এ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরই জের ধরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জনাব আলীকে তার বাড়িতে ডেকে নেন রীতা। সেখানেই দেবর সুজন ও ভাগ্নে রতনকে সঙ্গে নিয়ে জনাব আলীকে হত্যা করেন রীতা। হত্যার পর লাশ চলনবিলের একটি ডোবার কচুরিপানার মধ্যে ফেলে দেন সুজন ও রতন।
রীতা অপেক্ষায় ছিলেন প্রতিশোধ নেয়ার। প্রায় এক সপ্তাহ আগে ভারতীয় টিভি চ্যানেলে ক্রাইম পেট্রোলের একটি পর্বে দুই বান্ধবী এক উত্ত্যক্তকারীকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে হত্যা করে বলে দেখানো হয়। এই পর্ব দেখে জনাব আলীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রীতা। এরপর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা নেন সুজন ও রতনের। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় টিভি চ্যানেলে ক্রাইম পেট্রোল দেখে প্রভাবিত হয়ে গত বছরের ২৫ অক্টোবর নাটোর শহরের আলাইপুরের একটি মাদরাসার ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। সে সময় র‌্যাব তিন হত্যাকারীকেই আটক করেছিল।
বর্তমান সভ্যতায় মুক্ত বাজার, মুক্ত আকাশ, মুক্ত মিডিয়া ও মুক্ত সংস্কৃতির নামে অনেক কর্মকা-ই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘মুক্ত’ শব্দটি শুনতে ভালই লাগে। কিন্তু মানব জাতির দীর্ঘদিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষ ভালমন্দের মিশেলে এমন এক প্রাণি, যাদের জন্য কিছু বিধি-বিধান ও নিয়ম-শৃঙ্খলা খুবই আবশ্যক। নইলে ‘মুক্ত’ শব্দটি হিতে বিপরীত হয়ে উঠতে পারে। প্রত্যেক সমাজেই কিছু সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় বিধি-বিধান রয়েছে। এগুলোর যথাযথ চর্চা হলে মানুষ উপকৃত হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মিডিয়া জগতের অনেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে পরিহার করে অর্থের লালসায় নানা ক্ষতিকর বিষয় মিডিয়া ও টিভি চ্যানেলে প্রচার করে যাচ্ছেন। ভাষার চাতুর্যে তারা তাদের অনুষ্ঠানের স্বপক্ষে নানা কথা বলে গেলেও আসলে তা মানুষ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। যেমনটি আমরা ক্রাইম পেট্রোলের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করছি।
বর্তমানে অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আজ তথাকথিত স্টারদের/ পারফর্মারদের অনেকেরই জীবনে পরকীয়া, লিভটুগেদারের প্রভাব ভাইরাসের মতো তাদের ভক্তদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ছে। ভাবতেই অবাক লাগে, আমাদের ছেলেমেয়েরা কোন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে?
বর্তমান সময়ে বিনোদনের নামে ২৪ ঘণ্টার টিভি চ্যানেলগুলোতে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে তা প্রকৃত অর্থে মানুষকে কতটা নির্মল বিনোদন দিতে পারছে তা এক বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। মানুষকে তো জীবন সংগ্রামে কাজ করে যেতে হয়। দুই-এক ঘণ্টা বিনোদনই মানুষের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলেও ২৪ ঘণ্টার টিভি চ্যানেল নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। এত দীর্ঘ সময়ের টিভি অনুষ্ঠানে মানহীন অনুষ্ঠানের আশঙ্কাই বেশি। তাছাড়া মুক্ত আকাশের নামে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আপত্তিকর অনুষ্ঠানসমূহ যেভাবে আমাদের আকাশে যথেচ্ছভাবে প্রবেশ করছে তার পরিণাম নিয়েও ভাবা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিশেষে বলছি, অপসংস্কৃতির প্রবেশধারকে তার রূপ পাল্টিয়ে নিজস্ব ও ধর্মীয় সংস্কৃতির আলোকে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের চলচ্চিত্র জগৎকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। দেশীয় ও নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের সন্তানদের উত্তম শিক্ষা দিতে হবে। তারা যাতে চরিত্রবান হয়ে সমাজে বেড়ে উঠে আমাদের সেই ব্যবস্থাই করতে হবে।
ষ লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, কেন্দ্রীয় কমিটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।