Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২১ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

‘সনাতনী’ ব্যানারে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে দফায় দফায় হামলা : গ্রেফতার ৪

| প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সাংবাদিকদের প্রতিবাদ সমাবেশ আজ     
চট্টগ্রাম ব্যুরো : ‘সনাতনী সমাজে’র ব্যানারে গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় বন্দরনগরীর প্রাণকেন্দ্র জামাল খান সড়কস্থ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এবং সাংবাদিকদের ওপর দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুরের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক, পথচারী, স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের সামনে দিয়েই ‘ঐক্যবদ্ধ সনাতন সমাজ’ নামক হিন্দু সম্প্রদায়ের সংগঠনটি অতর্কিতে প্রেসক্লাবে ঢুকে পড়েই এই হামলা পরিচালনা করে। এ সময়  লাঠিসোটা সমেত সংগঠনটির উগ্রবাদী ৪ জন যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ ও সাংবাদিকরা। ঘটনায় আহত হন ৪ সাংবাদিক ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ক্লাবে ঢুকেই এই প্রথম জঙ্গি স্টাইলে হামলার ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলো। সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রেসক্লাব পরিদর্শন করেছেন। এ হামলার প্রতিবাদে আজ (বুধবার) দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামের সর্বস্তরের সাংবাদিক-সংবাদকর্মীদের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকরা জানান, ‘ঐক্যবদ্ধ সনাতন সমাজ, বাংলাদেশ’ নামক একটি সংগঠনের মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। হিন্দুদের মঠ-মন্দিরে ও বাড়িঘরে হামলার প্রতিবাদে জামালখানে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করছিল সংগঠনটি। এ সময় ৪ জন সাংবাদিককে মারধর করে হামলাকারীরা। গতকাল বিকেলে প্রেসক্লাব ভবনের প্রধান ফটক এবং সামনের সড়ক অবরুদ্ধ করে মানববন্ধন করছিল সনাতনীরা। এ সময় সাংবাদিকরা প্রেসক্লাব ফটক ও সড়ক বন্ধ না করার অনুরোধ জানান। আর তখনই ক্ষিপ্ত হয়ে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা শুরু করে। এ সময় তারা সাংবাদিকের গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এছাড়া সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে নিজেরাই ছবি মুছে ফেলে।  
তখন খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হামলারত ৪ জনকে লাঠিসোঁটাসহ আটক করে। আটক ৪ যুবক হচ্ছে অজয় দত্ত (২০), নয়ন সরকার (২১), পিয়াল শর্মা (২০) ও অনুভব মজুমদার (২১)। হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে কোতয়ালি থানার এসআই বিকাশ চন্দ্র শীল মাথায় আঘাত পান।    
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ার দৈনিক ইনকিলাবকে গতরাতে জানান, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম ক্লাবে অনুপ্রবেশ করেই ‘ঐক্যবদ্ধ সনাতন সমাজ’র নামে চরম ন্যাক্কারজনক হামলা করা হলো। সাংবাদিক, জনসাধারণের চোখের সামনেই এ হামলার ঘটনাটি পরিস্কার। এহেন হামলার নিন্দার ভাষা নেই। আমরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির দাবি জানাই। তিনি বলেন, হামলাকারী যুবকরা রাস্তা থেকে প্রেসক্লাবের দোতলায় উঠে আসে। আমরা বারবার তাদের থামতে বললেও তারা আমাদের সঙ্গে চরম ঔদ্ধ্যত আচরণ করে। তারা সাংবাদিকদের নাম ধরে প্রেসক্লাব থেকে নিচে নামিয়ে তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য শোর-চিৎকার করতে থাকে। এ সময় তারা ৪ জন সাংবাদিককেও মারধর করে।
প্রেসক্লাব সভাপতি বলেন, সংখ্যালঘুদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আমরা প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষসহ সাংবাদিক সমাজ সবসময়ই সংবেদনশীল। কিন্তু উক্ত সংগঠনের কর্মীরা প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে যেভাবে হামলা করেছে তার নজির স্মরণকালের ইতিহাসে নেই। আমরা এই ঘৃণ্য হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
জানা গেছে, হিন্দুদের মঠ-মন্দিরে ও বাড়িঘরে হামলার প্রতিবাদে জামালখানে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করছিল সংগঠনটি। মানববন্ধনে জড়ো হওয়া লোকজন প্রেসক্লাবের মূল ফটক আটকে দিয়ে ও ঘিরে রেখে এবং সড়কের মাঝখানে দাঁড়ানোর কারণে যানবাহন চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেখানে অকথ্য ভাষায় সাংবাদিকদের গালিগালাজ করা হয়। সাংবাদিকদের গাড়িতে লাথি মেরে কয়েকজন যুবক জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে একুশে টিভির চট্টগ্রামের আবাসিক সম্পাদক রফিকুল বাহারের গাড়িটিতে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে। সাংবাদিক রফিকুল বাহার এসময় হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে অকারণে ক্ষিপ্ত যুবকদের শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
পরে পুলিশ গাড়িটি সরিয়ে নিলে হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এসব যুবক প্রেসক্লাবের প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করলে আলোকচিত্র সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাদের ওপর হামলা চালায়। সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবের দোতলায় উঠে গেলে হামলাকারী যুবকরা দৌঁড়ে এসে সেখানেও হামলা এবং ভাঙচুর চালায়।
পরে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চাওয়া হয়। সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসেনের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ এসে তাদের ধাওয়া দেয়। এসময় ৪ জনকে আটক করা হয়। মোস্তাইন হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ইতোমধ্যে চারজনকে আটক করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাকিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। হামলায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হবে। আটক চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত আছে সেটা বের করার চেষ্টা করছি। হামলায় কারও ইন্ধন আছে কিনা কিংবা তাদের মোটিভ কি ছিল সেটা আমরা খতিয়ে দেখব।
এদিকে হামলার ঘটনায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে), চট্টগ্রাম ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টিভি জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। হামলায় জড়িত সবাইকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ