Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

নওয়াব ফয়জুন্নেসা জীবন ও সাহিত্য

জোবায়ের আলী জুয়েল | প্রকাশের সময় : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২:০৩ এএম

নওয়ার ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলার পশ্চিমগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ শাসনাধীন উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান মহিলা নওয়াব ও নারী শিক্ষার রূপকার ও প্রজাবৎসল জমিদার। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী বাংলাদেশে তিনি একমাত্র মহিলা যিনি এই উপাধি পান। তাঁর পিতা আহমেদ আলী চৌধূরী (মৃত্যু ১৮৪৪ খ্রি.) ছিলেন একজন নামকরা জমিদার। মা’আফরুন্নেসা (মৃত্যু ১৮৮৫ খ্রি.)।

আহমেদ আলীর পূর্বপুরুষ দিল্লীর বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে সনদ লাভ করে হোমনাবাদ পরগণার জমিদান হন। ফয়জুন্নেসার বড় দুই ভাই ছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরী ও ইউসুফ আলী চৌধুরী। তাঁর ছোট বোন লতিফুন্নেসা চৌধুরানী ও আমিরুন্নেসা চৌধুরানী।
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুসলমান নারী জাগরণের পথিকৃৎ। বাংলাদেশের নারী সমাজ যখন অবহেলিত তখন তিনি ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে নিজগ্রামে কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলার লাকসামে মহিলাদের জন্য একটি বিদ্যালয় স্থাপন করে নিজেই তাদের শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োজিত হন। এটি উপমহাদেশের বেসরকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীনতম স্কুলগুলির অন্যতম। কালক্রমে এটি একটি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং এর নাম হয় নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজ।
জমিদার হওয়ার পর তাঁর সেবার হাত আরও প্রসারিত হয়। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে পর্দানশীন বিশেষত দরিদ্র মহিলাদের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। তিনি “ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল” নামে একটি চিকিৎসালয় ও স্থাপন করেন। এছাড়া শিক্ষা বিস্তারে তিনি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় স্থাপন করেন। দু:স্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নির্মাণে ও অন্যান্য জনহিতকর কাজে অর্থ দান করেন। মসজিদ নির্মাণেও তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ, দিঘী-পুস্করিণী খনন প্রভৃতি জনহিতকর কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এতে তাঁর নাগরিক ও প্রগতিশীল চেতনার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি যুগের প্রভাবে বাইরের পর্দা মেনে চললেও মনের পর্দা ভেঙ্গে ফেলেন। এক্ষেত্রে ও তিনি বেগম রোকেয়ার অগ্রবর্তিনী ছিলেন। তবে বেগম রোকেয়ার কাজের ও চিন্তার অধিক গভীরতা ও ব্যাপকতা ছিল।
ফয়জুন্নেসা বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। “ঢাকা প্রকাশ” ছাড়াও তিনি বান্ধব, মুসলমান বন্ধু, সুধাকর, ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি বাংলা পত্র-পত্রিকা তাঁর আর্থিক সহায়তা লাভ করে।
ফয়জুন্নেসার সৃজনশীল প্রতিভার দিকটি নিহিত আছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। তাঁর আত্নজীবনীমূলক উপন্যাস “রূপজালাল” গ্রন্থটি ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা গিরিশ চন্দ্র মুদ্রন যন্ত্র থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর চারখানি পুস্তক-পুস্তিকার সন্ধান পাওয়া যায়- “রূপজালাল (১৮৭৬ খ্রি.), তত্ত্ব ও জাতীয় সঙ্গীত (১৮৮৭ খ্রি.), সঙ্গীত সার ও সঙ্গীত লহরী”। তাঁর তত্ত্ব ও জাতীয় সঙ্গীত একটি সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ। এর প্রথম সংস্করণ ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ও মুদ্রক হরিমোহন বসাক, ঢাকা বাঙ্গলা প্রেস। তাঁর “রূপ জালাল” ব্যতীত অন্যান্য গ্রন্থের কপি পাওয়া যায় নাই।
“রূপজালাল” গদ্যে-পদ্যে রচিত রূপকধর্মী রচনা। গ্রন্থখানি ব্যতিক্রমধর্মী। সংস্কৃত গদ্য-পদ্য মিশ্রিত চম্পু কাব্যের নিদর্শন থাকলেও বাংলাতে তা’ বিরল। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ভাবধারায় দু’একখানি চম্পু কাব্য রচিত হলেও উনিশ শতকে এ ধরনের দ্বিতীয় গ্রন্থ রচিত হয়নি। দ্বিতীয়ত ফয়জুন্নেসার গদ্য-পদ্য উভয় অংশ বিশুদ্ধ বাংলায় রচিত। আরবী-ফারসী শব্দের মিশ্রন নেই বললে চলে। ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী গল্পের নায়ক জালাল ও নায়িকা রূপবানুর প্রণয় কাহিনীর মধ্যে কৌশলে স্বীয় জীবনের ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। ব্যতিক্রম একটি ক্ষেত্রে যে নিজের দাম্পত্য জীবন ব্যর্থতা ও বেদনায় পূর্ণ। “রূপজালালে”র প্রেম ও দাম্পত্য জীবন সুখ ও আনন্দেপূর্ণ। সৃষ্টির এখানেই স্বার্থকতা। ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতাকে সৃষ্টি কর্মে সফল হতে দেখেছেন। তিনি অন্তর্দাহ প্রকাশ করতে গিয়ে “রূপজালাল” উপন্যাস রচনায় মাঝে মাঝে কবিতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। “রূপজালাল” এ ফুটে উঠেছে ফয়জুন্নেসার কবি প্রতিভা।
এই গ্রন্থটি বেগম রোকেয়ার জন্মের অন্তত: চার বছর আগে প্রকাশিত হয়। সতীন বিদ্বেষের কারণেই ফয়জুন্নেসার বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়। রূপ বানুর সতীন হুরবানু তাদের পরিণতি কিরূপ ছিল ? গ্রন্থের শেষ কয়েকটি চরণে তা’ প্রকাশ পেয়েছে -
হুরবানু নিয়ে রাণী, রূপবানু মণে।
মিলন করিয়া দিল প্রবোদ বচনে ॥
দোহে সম রূপবতী সম বুদ্ধিমতী।
বিভূকৃত ভেবে দোহে জন্মিল সম্প্রীতি ॥
উভয় সপত্মী নানা গুণে গুণবতী।
আনন্দে বিহরে দোহে পতির সঙ্গতি ॥
দুই জন নিয়ে সম দৃষ্টিতে রাজন।
নিত্য সকৌতুকে কাল করয়ে যাপন ॥
সিংহাসনে বসি সদা হরিষ অন্তরে।
বিধি বিধানেতে ভূপ রাজ কার্য্য করে ॥
বিচার কৌশলে দূর হৈল অবিচার।
প্রজার জন্মিল ভক্তি সুখ্যাতি প্রচার ॥
রাজা ন্যায় বিচারক ও প্রজানুরঞ্জন হবেন - এটাও তাঁর কাম্য ছিল। স্বামী বিচ্ছেদের প্রায় নয় বছর পরে “রূপ জালাল” প্রকাশিত হয়। তিনি গ্রন্থখানি স্বামীর নামেই উৎসর্গ করেন। বাস্তবে দু:খ যন্ত্রণার পঙ্কে থেকে তিনি কল্পনায় প্রেমানন্দের পদ্মফুল ফুটিয়েছেন। “জাতীয় ভাষা অপরিহার্য্য” ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। এরূপ সাহসী উচ্চারণের জন্য তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী। এই ভাষার পথ ধরেই আমরা জাতীয়তা, স্বাধীকার ও স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়েছি।
ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী গান ও লিখেছেন। রূপজালাল কাব্যে গান আছে। “মূলতান” রাগিনীতে রূপবানুর গান ও অন্যত্র “মালঝাপ” রাগিনীতে কন্যার স্বীয় বৃত্তান্তের বিবরণ আছে। এছাড়া বার মাসি, সহেলা, বিরহ-বিলাপ, খেদোক্তি ইত্যাদি শিরোনামে যে সব পদ আছে সেগুলিও সঙ্গীত। সঙ্গীত সম্পর্কিত তাঁর স্বতন্ত্র গ্রন্থও আছে। এসব দৃষ্টান্ত থেকে প্রমানিত হয় ফয়জুন্নেসা সঙ্গীতানুরাগিনী ছিলেন। সঙ্গীতের সমর্থক ছিলেন তিনি। বনেদী মুসলিম পরিবারের একজন মহিলার জন্য এটিও একটি সাহসী পদক্ষেপ।
গ্রন্থের শুরুতে তিনি “রূপজালাল” গ্রন্থে স্বল্প পরিসরে গদ্যে স্বীয় বংশের বিবরণ ও পুস্তক লিখবার উদ্দেশ্য অধ্যায় রচনা করেন। এটি তথ্যপূর্ণ, আবেগ মিশ্রিত ও হৃদয়গ্রাহী। একে বাংলা আত্মজীবনী রচনার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
“রূপজালাল” এর গদ্য ও পদ্য থেকে উদ্ধৃত করার মতো অনেক অংশ আছে। “রূপজালাল” গ্রন্থে গদ্যের একটি অংশ-
“বিধাতা রমনীদিগের মন কি অদ্ভূত দ্রব্য দ্বারা সৃজন করিয়াছেন, যাহা স্বাভাবিক সরল ও নম্র। তাহাতে কিঞ্চিৎ মাত্র ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হইলেও লৌহ বা প্রস্তর বৎ কঠিন হইয়া উঠে। আমার এই বাক্য শ্রবণে মহিষী উত্তর করিল, হ্যা ভাল বলিয়াছেন, তাই ত বটে, কোথায় দেখিয়াছেন, রমনীগণ এক পুরুষকে পরিত্যাগ করিয়া, পুরুষান্তর আশ্রয় করে। বরং পুরুষেরা একটি রূপবতী যুবতী দেখিলেই পূর্বপ্রেম এবং ধর্ম বিসর্জন দিয়া তাদের প্রতি আসক্তি হয় এবং তাহাকে প্রণয়িনী করিবার জন্য নানা প্রকার চেষ্টা করে। প্রভূর ইচ্ছায় যদি কোনক্রমে ঐ কার্য সুসম্পন্ন করিতে না পারে, তবে পূর্ব প্রণয়িনীর নিকট আসিয়া সহস্র শপথ করিয়া বলে, তোমাকে বিনা আমি আর কাহাকেও জানিনা। অধিক কি অন্য বামার রূপলাবণ্য আমার চক্ষে গরল প্রায় জ্ঞান হয়। পুরুষদিগের অন্ত:করণের স্নেহ চিরস্থায়ী নহে।”
এই উপন্যাসের ভাষা চিত্র বহুল ও জীবনধর্মী। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর (১০ আশ্বিন, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ) নওয়ার ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী লোকান্তরিত হন। পশ্চিম গাঁয়ের নিজ বাড়ীতে নিজ কন্য আরশাদুন্নেসার পাশে তিনি চিরশয্যায় শায়িত আছেন।
মৃত্যুর ১০০ বছর পরে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে সমাজ সেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ একুশে পদক ও সম্মাননা পত্র (মরণোত্তর) প্রদান করেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নওয়াব ফয়জুন্নেসা জীবন ও সাহিত্য
আরও পড়ুন