Inqilab Logo

মঙ্গলবার ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

মানবাধিকার আইনে সংবাদপত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সমাবেশের অধিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

পাশ্চাত্যের আইন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের উপর আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, তাদের মানবাধিকারের ইতিহাস বড় জোর ১২১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ইতিহাস এবং এ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, স্বত:স্ফূর্তভাবে তারা মানুষের অধিকারসমূহকে স্বীকার করেনি। এ স্বীকৃতি আদায়ের জন্য শত শত বছরব্যাপী রক্ত ঝরাতে হয়েছে। আর একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মানবাধিকারের সার্বজনীনতায় তারা বিশ্বাস করতেন না, আন্তরিক ছিলেন না। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত পাশ্চাত্যে মানবাধিকার সংক্রান্ত যে সকল দলিল আমরা পাই, সেগুলোর কোনটিই আন্তর্জাতিক তথা সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন ছিল না। বলা হয়ে থাকে, The charter of the United nations Organisation has internationalized the idea of human rights.’’ অর্থাৎ মানবাধিকারের ধারণাটির আন্তর্জাতিকরণ করেছে, জাতিসংঘ সনদ।’’ সকলেই এটি স্বীকার করেন যে, জাতিসংঘ যে, জাতিসংঘ সনদ (১৯৪৫)-এর আগে মানবাধিকারের ধারণাটি বিশ্বজনীন ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে সার্বজনীন, বিশ্বজনীন মানবাধিকারের ধারণা ইতোপূর্বে আসলেই কি কেউ দেননি, কোন আইন ব্যবস্থা তা কার্যকর করেনি এসব প্রশ্নের উপর আলোকপাত করার আগে আমরা আবার পাশ্চাত্যের মানবাধিকার আইনের উপর নজর দেব।
আজকের তথাকথিত সভ্যতার ধ্বজাধারী মানবাধিকারের স্বঘোষিত ধারক হিসেবে যারা আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আমরা দেখেছি যে, তারা মানবাধিকার সম্বন্ধে বুঝতে শিখেছে মাত্র সেদিন থেকে পাশ্চাত্য মানবাধিকারের বিকাশ পর্বে মানবাধিকারের রূপ কেমন ছিল এর উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন। ব্যক্তি মানুষের অধিকার (individual’s rights) এখনও স্বীকৃত হয়নি। ‘বিশেষ কারণে’ কিছু ব্যক্তি সমষ্টির অধিকার (rights of the groups of individuals) সম্বন্ধে পাশ্চাত্য সমাজের কন্ঠ উচ্চারিত হয়। অবশ্য তাদের এ মাথা ব্যথার কারণ ছিল ভিনদেশে তাদের নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু তারাই নিজেদের দেশে অপর সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের উপর অমানবিক নির্যাতন করত। নিম্নে এর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হল ঃ
ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে গোটা ইউরোপ ব্যাপী ধর্মীয় হানাহানি বিরাজ করে। এসব ধর্মযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ বিরাজমান দেশসমূহে নিজ ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য প্রভাবশালী দেশগুলো সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। জার্মানীতে রোম ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় সমঅধিকার প্রদানের জন্য ১৬৪৮ সালে Peace of Westphalia স্বাক্ষরিত হয় যার মাধ্যমে জার্মানীতে ৩০ বছরের ধর্মীয় হানাহানি শেষ হয়। এ শান্তিচুক্তি সম্পর্কে ড: এম, এরশাদুল বারী মন্তব্য করেন ঃ ‹›The real motive was rather to promote favoured religious creeds than to promote religious freedom for all›› অর্থাৎ উক্ত শান্তি চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সকলের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করা। কোন চুক্তির আওতায় কোন রাষ্ট্রের ভূখন্ডের অংশবিশেষ অপর রাষ্ট্রের নিকট হস্তান্তরিত হলে নতুন রাষ্ট্রে তারা যেন ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা হত। উদাহরণ ১৭১৩ সালের নেদারল্যান্ড চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স হাডসন উপসাগর এবং আকাভিয়া গ্রেট ব্রিটেনের নিকট হস্তান্তর করে। উক্ত চুক্তির ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, সে এলাকার ক্যাথলিকরা এক বছরের মধ্যে ইচ্ছে করলে ফ্রান্সে চলে আসতে পারবে। আর যারা থেকে যাবে তাদেরকে গ্রেট ব্রিটেনের আইন অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এরা সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করত না, কেবল স্বধর্মের কেউ অপর কোন রাষ্ট্রে বৈষম্যের শিকার হল কিনা তা নিয়ে চিৎকার করত। ডা. এম, এরশাদুল বারী এ প্রসঙ্গে খুব সুন্দর বলেছেন ঃ ‘‘All the attempts to secure religious freedom we-rem almost invariably, efforts by members of one religion or behalf of their co-coreligionists elsewhere Protestant powers generally tried to secure religious freedoms for Protestants in catholic countries; but not for Muslim, Buddhists or Jews’’ অর্থাৎ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাই ছিল মূলত একই ধর্মের অনুসারীদের হয়ে তাদের সহ অনুসারীদের প্রচেষ্টা। প্রোটেষ্ট্যান্টরা সাধারণত চেষ্টা করত ক্যাথলিক অধ্যুষিত দেশসমূহে প্রোটেসট্যান্টদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু মুসলমান বৌদ্ধ, ইহুদীদের ব্যাপারে এদের কোন মাথাব্যথা ছিল না।
পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রকৃতপক্ষে মানুষে মানুষে সমতা নীতিতে বিশ্বাস করে না। বর্তমানে মুখ তারা যত সুন্দর বুলি আওড়াক না কেন আসলে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা, তাদের প্রতিপক্ষ মানব সন্তানদেরকে নির্মূল করা, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা, এদের আজন্ম খায়েশ। পাশ্চাত্য পান্ডিত্যের পুরোধা প্লেটো এরস্টিটল দাসপ্রথাকে শুধু বৈধতা দান করেই ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু মানব সমাজে দাসপ্রথার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেছেন। হাজার হাজার বছরব্যাপী সে সমাজে দাসপ্রথা, দাস বাণিজ্য প্রচলিত ছিল। দাস বাণিজ্য (Slave treade) ছিল তাদের একটি লোভনীয়(!) পেশা। নিকট অতীতে ১৮০২ সালে প্রথমে ডেনমার্কে আমরা দাস প্রথা উচ্ছেদের প্রথম পদক্ষেপ লক্ষ্য করি। পরে দাস বাণিজ্যকে রহিত করণার্থে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮০৭ সালে একটি বিল পাস করে। এ আইনটি কেবল ব্রিটেনের জন্য ছিল। ১৮৩৩ সালে অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভূক্ত সকল অঞ্চলে অনুরূপ আইন প্রণয়ন করা হয়। নেপোলিয়ন ১৮১৪ সালে ফ্রান্সে দাস বাণিজ্য বন্ধকরণের জন্য আইন পাস করেন, যদিও এ আইনটি পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন