Inqilab Logo

শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০৮ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

রাজধানীর ওপর থেকে চাপ কমাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১ অক্টোবর, ২০২২, ১২:০২ এএম

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরের তালিকায় ঢাকা শীর্ষে। গত জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্টা’ বিশ্বব্যাপী শহরের জনঘনত্বের ওপর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা শীর্ষ স্থানে রয়েছে এবং এর প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ৩০ হাজার ৯৩ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ বসবাস করে। তবে নগরবিদরা মনে করছেন, ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৫ হাজার লোক বসবাস করে এবং জনসংখ্যা আড়াই কোটি। এসব প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান উল্লেখ না করেও যে কেউ বলে দিতে পারবে, ঢাকা লোকসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ হয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষ ধারণ করার সামর্থ্য এই নগরীর নেই। তারপরও প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় আসছে। এক হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। এতে এর জনসংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৩৯ শতাংশ, ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৩.৫ এবং ২০২২ সালে ৩.৫৬ শতাংশ।

সবদিক বিবেচনায় বহু আগেই ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর জরিপে এ তথ্য বারবার উঠে এসেছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণসহ সার্বিক পরিবেশ দূষণের দিক থেকে এ শহর বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। নগরবিদরা ঢাকাকে ন্যূনতম বসবাস উপযোগী করার বহু পরামর্শ ও তাকিদ দিলেও তাতে নগর কর্তৃপক্ষ বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো টনক নড়েনি। দিন দিন পরিস্থিতি অবনতির দিকে ধাবিত হওয়া রোধ করার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। ঢাকা যে জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত তার মূল কারণ হচ্ছে, পুরো দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সকল ধরনের সেবার কাজ এখানে কেন্দ্রিভূত থাকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মানুষও উল্লেখিত সুবিধা পাওয়ার জন্য ঢাকা চলে আসছে। এছাড়া নদীভাঙন, জলবায়ুর পরিবর্তন, ঝড়-ঝঞ্ঝা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারানো মানুষের ¯্রােতও ঢাকামুখী। প্রত্যেকেই মনে করে, কোনো রকমে ঢাকা গিয়ে পৌঁছতে পারলে আর চিন্তা নেই। কিছু একটা হবে। থাকার জন্য বস্তি নিদেনপক্ষে ফুটপাত পাওয়া যাবে এবং কোনো একটা কাজ জোগাড় করে নেয়া যাবে। এই যে ঢাকামুখী মানুষের ¯্রােত, তাতেই ঢাকার জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, অর্থনীতির ৩৬ ভাগের বেশি ঢাকাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এখানেই রয়েছে, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, শিল্পকারখানা, প্রধান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান ও মানুষের প্রয়োজনীয় সকল সেবা-সুযোগ পাওয়ার ব্যবস্থা। এসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য দেশের আনাচ-কানাচ থেকে মানুষ ঢাকায় ছুটে আসছে। এই ছুটে আসার ফলে ঢাকায় বিদ্যমান যেসব ন্যূনতম সেবা রয়েছে সেগুলোর ওপর প্রচÐ চাপ পড়ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি থেকে শুরু করে সবধরনের সেবা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এতে ঢাকায় বসবাসরতদের প্রাপ্য সুবিধা কমে যাচ্ছে। যতটুকু পাওয়ার কথা তা পাচ্ছে না। যানজটবৃদ্ধিসহ বসবাসের পরিবেশ ক্রমাগত অবনত হয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টনা ময়লা-আবর্জনা উৎপাদিত হয় এবং মাথাপিছু আবর্জনা উৎপাদিত হয় আধা কেজি। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবর্জনা উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যার চাপ ও অসুস্থ পরিবেশের জন্য পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হওয়া পর্যায়ে থাকা ঢাকাকে বাঁচাতে সবার আগে প্রয়োজন এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা।

কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে যেসব সুবিধার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় ছুটে আসে তা ঠেকাতে এবং বসবাস উপযোগী করে তুলতে হলে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। অন্তত ঢাকার আশপাশের যেসব জেলা রয়েছে সেগুলোতে যদি ঢাকার সেবা ও সুবিধা সম্প্রসারিত করা যায়, তাহলে ঢাকাকে অনেকটাই ভারমুক্ত করা সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর এমনকি টাঙ্গাইল-ময়মনসিং জেলায় ঢাকার সুবিধা স্থানান্তর করা গেলে ঢাকার ওপর থেকে চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। ঢাকার অপরিকল্পিত বিস্তৃতি ঠেকানো যাবে। গার্মেন্ট শিল্পসহ যেসব শিল্পকারখানা ঢাকায় রয়েছে, সেগুলো এসব জেলায় স্থানান্তর করা যেতে পারে। রাজধানীতে নতুন করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা বন্ধ করতে পারলে ঢাকা কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হবে। এক সময় ঢাকার আশপাশে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এটি করতে পারলে ঢাকার চেহারা বদলে যাবে। রাজউক যে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ প্রণয়ন করেছে, তা দ্রæত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। এতে অপরিকল্পিতভাবে ঢাকার সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং ঢাকামুখী জনসংখ্যার চাপ কমবে। ঢাকায় বিদ্যমান নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক কর্মকাÐ বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে। এ কাজগুলো রাজধানী কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সরকারকে করতে হবে। ঢাকাকে ভারমুক্ত ও বাসযোগ্য করতে আর কোনো শৈথিল্য এবং হেলাফেলা করা যাবে না।



 

Show all comments
  • Md Sanzid Ahsan ১ অক্টোবর, ২০২২, ৮:৫৪ এএম says : 0
    যানজট আর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা রাজধানী ঢাকার। প্রশাসন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি চিকিৎসারও মূল কেন্দ্র এই মহানগরীতে।, আগামী ২০ বছরে জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে পারবে না এই শহর। তাই এখনই রাজধানী বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Md Sanzid Ahsan ১ অক্টোবর, ২০২২, ৮:৫১ এএম says : 0
    শুধু রাজধানী তে সুযোগ সুবিধা বেশি করলে তো এইরকমই হবে
    Total Reply(0) Reply
  • কাজল হায়দার ১ অক্টোবর, ২০২২, ৮:৫৫ এএম says : 0
    ঢাকার ওপর চাপ কমাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না এলে এক সময় রাজধানী বাসযোগ্যতা হারাবে বলে আশঙ্কা
    Total Reply(0) Reply
  • তানবীর হাসান তনু ১ অক্টোবর, ২০২২, ৮:৫৪ এএম says : 0
    দেশে সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হয় ময়মনসিংহে। তবে এর গবেষণা ইনস্টিটিউটটি ১৯৫১ সাল থেকে রাজধানী ঢাকায়। আর এর পাশেই রয়েছে সেচ ভবন।চায়ের রাজ্য বলা হয় সিলেটকে। কিন্তু চা ভবন অবস্থিত ঢাকার মতিঝিলে। পান্থপথে রয়েছে পানি ভবন। আর সেখানেই আছে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড। বন ভবন বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকায় কী কাজ, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
    Total Reply(0) Reply
  • সাদিয়া সুলতানা ছন্দা ১ অক্টোবর, ২০২২, ৮:৫৫ এএম says : 0
    অদূর ভবিষ্যতে ঢাকায় মানুষের চাপ আরও বাড়বে। তখন পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। তাই এর আগেই বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন