Inqilab Logo

শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০৮ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

নাইম্যা পড়েন

অয়েজুল হক | প্রকাশের সময় : ২১ অক্টোবর, ২০২২, ১২:০১ এএম

ফরিদ সাহেব সরকারী হাইস্কুলের মাষ্টার।ছাত্রদের তিনি মানুষ বানানোর জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা করেন সব সময়।দেড় বছর পর স্কুল খোলায় তিনি যেন এক নতুন জীবন পেয়েছেন।প্রথম দিনে একটি ভাল ঘটনা বলে শুরু করেন, জাপানের এক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তিন সেতুর কাজ শেষ করেছে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবার ছয় মাস আগে।ফেরত দিয়েছে সাতশত আটত্রিশ কোটি টাকা!ভাবতে পারো!যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠান গুলো দফায় দফায় প্রকল্প ব্যায় বাড়ানোর ধান্দায় থাকে সেখানে জাপানি প্রতিষ্ঠান কী সততাটাই না দেখালো!এজন্যই, হিরোশিমা নাগাশিকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে ধ্বংস করে দেয়ার পরও আজ জাপান কোথায়? আমরা কোথায়!
একছাত্র বলে ওঠে, স্যার জাপান কোথায় তাই জানেন না! চীন তারপর খানিক সাগর তারপর উত্তর কোরিয়া তারপর খানিক সাগর তারপর হলো জাপান। ভালোই দূর আছে।
ফরিদ সাহেব উত্তেজিত হয়ে বলেন, থাম গাধা। আমি তাদের সততা, মেধা, সভ্য মানসিকতার কথা বলছি।
আরেক ছাত্র বলে ওঠে, স্যার ওরা ভালো তবে আমাদের মতো এতো ভালো না।
ফরিদ সাহেব রেগে একটা ধমক দেন, এই চুপ আর একটা কথাও বলবি না। এই গাধা মার্কা ছাত্রগুলোকে নিয়ে বড় অশান্তি।স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসেও শান্তি নেই।বছর পেরিয়ে যাওয়া এক টনের এসি তে আর কাজ হচ্ছে না।দুই টনের এসি চাই।ফরিদ সাহেব চুপ করে থাকেন।এক বছরে তার বউয়ের ওজনও প্রায় কোয়াটার মেট্রিকটন বেড়েছে!স্বাভাবিক ভাবেই এসির টন বাড়ানোর কথা বলতেই পারে হনুফা বেগম।ছেলে হারুন বলেছে, তার সব বন্ধুর বাইক আছে।তাকে বাইক কিনে না দিলে ছেলের অভিশাপে বাইকের নিচে পড়ে হাত হাত পা লুলা খুড়া হয়ে যাবেন। মেয়ে রেশমির কন্ডিশন হলো, আপাতত ছিয়াত্তর হাজার টাকার আপডেট ভার্সনের স্মার্টফোন কিনে দিলেই হবে।ফের আপডেট বের না হওয়া পর্যন্ত ফোন না কিনে দিলেও চলবে।সত্যিকারের বাবা হলে তিনি নাকি ফোন না কিনে দিয়ে পারবেন না।ফরিদ সাহেব ভাবেন সত্যিকারের বাবা হতে গেলে আর কী কী কিনে দিতে হয় রেশমির কাছ থেকে তার একটা লিষ্ট নেবেন।বাড়ি ফিরে এসব নিয়েই নিজের রুমে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকেন।মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা।বেতন পাওয়ার আগেই হাওয়া হয়ে যায়।কীভাবে চলবেন, চালাবেন? নাকি মরে যাবেন!
হানুফা বেগম আসেন।এই মহিলা ফরিদ সাহেব কে ঘুমাতে দেখলেই রেগে যায়।সঠিক কারনটা সাইত্রিশ বছর পেরিয়ে গেলেও জানা হয়নি। -বাড়ি আসলেই শুধু ঘুম আর ঘুম।মনে চায় ধরে খাট থেকে ফেলে দেই।
ফরিদ চট করে চোখ মেলে তাকান।গলা টিপে মেরে ফেলার চেয়ে খাট থেকে ফেলা দেয়া ভালো।শান্ত সুরে বলেন, দেখ আমার মাথায় অনেক চিন্তা।দায় দেনায় ক্ষত বিক্ষত।ঘরে বসে সারাদিন মোষের মতো শুয়ে না থেকে টুকটাক কিছু কাজ করলে তো পার।
-কী বললে আমি মোষ!মোষের মতো শুয়ে থাকি।নিজের দোষ আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছো!ওরে হারুন তোর বাবা কী বলে শুনে যা।
ছেলেটা বরাবরই তার মায়ের পক্ষ নেয়।তার এ মুহুর্তে না আসাই ভালো।ফরিদ সাহেব বিনয়ী কন্ঠে বলেন, দেখ উন্নত বিশ্বের মানুষ অবসর সময় কাজে লাগায়।এতেকরে সাবলম্বী হওয়া যায়।
ফরিদ সাহেবের কথায় শান্ত হন না হানুফা বেগম।চিৎকার করেই বলেন,তারা তো চাকরির ফাঁকে ফাঁকে ড্রেন পরিস্কারের কাজ পর্যন্ত করে।সুইপারের কাজ করে।তুমি কবে করেছ?
স্ত্রীর চিৎকারে অস্থির হয়ে বাইরের দিকে পা বাড়ান।যে দিক চোখ যায় হাটতে থাকেন।হাটার সাথে ভাবনারা জড়ো হয়, সমিতি, ব্যাংক লোন, বন্ধুদের কাছ থেকে নেয়া ধারদেনা তাকে অজগর সাপের মতো পেচিয়ে ধরেছে। তিনি নড়াচড়া করতে পারছেন না। ক্যা ক্যু করে দুঃখের কথা বলবেন সে সুযোগটাও নেই।কিস্তেতে ফ্রিজ মাস্তিতে এসি নগদ টাকায় ওয়াশিং ম্যাশিন, থ্রি ডি টেলিভিশন, ছেলের বাইক,মেয়ের দামি ব্রান্ডের ফোন।সবকিছুর দাম যেভাবে বড়ছে তাতে জীবন বাঁচানোই মুশকিল, এরপর ছেলে,মেয়ে, বউয়ের আব্দারে তিনি একদিন পাগল হয়ে যাবেন।
‘স্যার কেমন আছেন?’ শব্দে ফরিদ সাহেবের ধ্যান ভাঙ্গে।এলাকার ছোট হোটেল ব্যাবসায়ী মতি। একটা ভাংগা রিকশা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার এখন হোটেলে থাকার কথা।সন্ধ্যার পর লোকজনের অর্ডারে কর্মে ব্যাস্ত থাকবে, সে কিনা রিকশা সামনে করে দাঁড়িয়ে! বড় বড় পায়ে ফরিদ সাহেবের দিকে এগিয়ে আসে। কিছুটা অবাক হয়েই বলেন, কিরে তোর হোটেল কই!
মতি একগাল হাসি ছড়িয়ে বলে, স্যার হোটেল হোটেলের জায়গায় আছে।আমি নাই। পেঁয়াজ, রসুন, আদা...... যা দাম বাড়তাছে তাতে হোটেল চালানো মুশকিল।দেনায় পইড়া বেইচা ফালাইছি স্যার।
-রিকশা চালানোতে লাভ বেশি?আর যদি আপনাদের মতো বড় কোন স্যার মিলে যায় সে আশাতেই নামছি।
-হ্যাঁ,থাম।
-জি থামছি।স্যার আপনি ওঠেন বাড়ি দিয়ে আসি।
-আমার কাছে টাকা নেই।
মতি অবাক হয়, স্যার মানুষ, টাকা নাই!
-না।
-তাইলে আমার সাথে নাইম্যা পড়েন।
ফরিদ সাহেব মতির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নাইম্যা পড়েন

২১ অক্টোবর, ২০২২
আরও পড়ুন